নিম্নচাপের প্রভাবে গত ২৪ ঘন্টায় টানা বৃষ্টি, ঝড়োবাতাস ও জোয়ারের পানিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে জনজীবনে ব্যাপক দুর্ভোগ নেমে আসে। সাগর ও নদীতে অস্বাভাবিক জোয়ারের চাপে কক্সবাজার, কুমিল্লা, ভোলা, বাগেরহাটসহ দেশের কয়েকটি জেলায় বাঁধ ভেঙে প্রায় অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়। তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি। মনপুরায় বিধ্বস্ত ঘরসহ ৩ জন মেঘনায় ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। শরণখোলায় বালু ও মাটির বস্তা দিয়ে এলাকাবাসী বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছেন।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সকল রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। অনেক জেলায় স্কুল-কলেজে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। টানা বর্ষণে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ কর্মহীন হয়ে চরম বিপাকে পড়েন। ভোগান্তি পোহাতে হয় অফিসগামী লোকজনকে । চট্টগ্রামে বৃষ্টি বাতাস দুর্যোগে বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। গোপালগঞ্জে শনিবার সকাল পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ ২৭১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মৌসুমী নিম্নচাপটি ক্রমে পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উপকূলের থেমে থেমে ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বইছে। নিম্নচাপের প্রভাবে সাগরে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বেড়ে গেছে। নিম্নচাপটি স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়ে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে নদীবন্দর এলাকায় ২ নম্বর সতর্ক সংকেত ও সমুদ্রবন্দর এলাকায় ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বলবত্ রয়েছে।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাত কাটিয়ে না উঠার আগেই আবার মৌসুমী নিম্নচাপের প্রভাবে পুরো জেলাজুড়ে ঝড়োহাওয়া বইছে। শুক্রবার ভোর থেকে থেমে থেমে বর্ষণ ও দমকা হাওয়া উড়িয়ে নিচ্ছে শহর-গ্রামের ঝুপড়ি ঘর। সাগরে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নতুন করে ভাঙনের কবলে পড়েছে পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালীসহ উপকূলের বেড়িবাঁধের বেশ কয়েকটি অংশ। আর পুরোনো ভাঙন দিয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে উপকূলের গ্রামের পর গ্রাম। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপকূলের লাখো মানুষ।
সদর উপজেলার পোকখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিক আহমদ ও গোমাতলী উপনিবেশ সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোসলেম উদ্দিন জানান, নিম্নচাপের প্রভাবে সাগরে জোয়ারের পানি বাড়ায় শুক্রবার রাতে ও শনিবার দিনের জোয়ারে গোমাতলীর ৬ নম্বর ও ৮ নম্বর স্লুইচ গেইট এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে বৃহত্তর গোমাতলীর ৮ গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে রাস্তাঘাট। এছাড়া পেকুয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে সাগরের পানিতে প্লাবিত হয়েছে রাজাখালী ইউনিয়নের বকশিয়া ঘোনা ও নতুন ঘোনা গ্রাম। এতে ওই এলাকার চিংড়ি ঘের ও কাচা বসতঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় বেড়িবাঁধ উপচে সাগরের পানি ঢুকে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কুতুবদিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল বশর চৌধুরী জানান, জোয়ারের পানি বাড়ায় বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে নিচু এলাকায় পানি ঢুকেছে।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, চৌদ্দগ্রাম উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়নে শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে টানা বৃষ্টি ও প্রবল স্রোতের কারণে কাঁকড়ি নদীর ঘাসিগ্রাম পয়েন্টে বাঁধের প্রায় ৪০ ফুট এলাকাজুড়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এতে ঘাসিগ্রাম, পরানপুর, দাতামা, বালিমুড়িসহ ২০ গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা আসবাবপত্র ও মালামাল নিয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দেন। এতে পুকুর ও খামারের মাছ, জমির ফসলসহ শাক-সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, মেঘনায় জোয়ারের পানির চাপে উপজেলার হাজির হাট ইউনিয়নের চৌধুরী বাজারে নতুন বেড়িবাঁধ ভেঙে পুর্ব সোনারচর গ্রাম, নাইবের হাট পশ্চিম সোনারচর, পুর্বকুলাগাজীর তালুকসহ ৬ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসময় ১টি ঘরসহ ৩ জন ভেসে গেছেন। তিনজনই নিখোঁজ রয়েছেন। এরা হলেন, ইলিয়াস, রুহুল আমিন ও রাহাত। এদের সবার বাড়ি চৌধুরী বাজারের পূর্বপাশে ফকিরের দোন এলাকায়। নিখোঁজ তিন ব্যক্তিকে খুঁজতে তিনটি ট্রলার মেঘনায় গেছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সোহাগ হাওলাদার ।
উপজেলায় জোয়ারের পানিতে ৫ হাজার একর আমনের ক্ষেত প্লাবিত হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের ৪২ স্কুলের মডেল টেস্ট পরীক্ষাসহ ১৬ হাইস্কুল-মাদ্রাসার সমাপনী পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। নদীপথে লঞ্চ-সিট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন মনপুরাবাসী।
হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, প্রবল বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া ও অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে উপজেলায় কাঁচা ঘরবাড়ি ও ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ সময় ঘর চাপা পড়ে চরইশ্বর ইউনিয়নে হেলাল উদ্দিন (১৫) ও সাহাব উদ্দিন (১৭) নামে দুই কিশোর গুরুতর আহত হয়। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা। নদী উত্তাল থাকায় গতকাল তৃতীয় দিনের মতো হাতিয়ার নলচিরা-চেয়ারম্যানঘাট ও তমরুদ্দী লঞ্চঘাট থেকে ঢাকার সদরঘাট রুটে চলাচলকারী সি-ট্রাক ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল।
শরণখোলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মাণাধীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধের ৩টি পয়েন্টে ভেঙে এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। আরো ৩টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বালু ও মাটির বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছেন এলাকাবাসী।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, থেমে থেমে বৃষ্টি এবং সেই সাথে অস্থায়ী ঝড়ো ও দমকা হাওয়ায় সাগর উত্তাল ছিল। ফলে গতকাল শনিবারও দ্বিতীয় দিনের মতো চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য লাইটারিং কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে লাইটার জাহাজগুলো সদরঘাট বাংলা বাজার জেটি ঘাটের অদূরে অবস্থান করে। লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাদাত হোসেন ইত্তেফাককে জানান, এরকম দুর্যোগে কোনো লাইটার জাহাজ বহির্নোঙরে যায়নি। তবে লাইটার জেটি ঘাটে সীমিতভাবে পণ্য নামানো হয়েছে।
পিরোজপুর অফিস জানায়, অবিরাম বর্ষণ এবং অমাবস্যার প্রভাবে জোয়ারের পানিতে জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নাজিরপুর, কাউখালী, ইন্দুরকানী উপজেলার ৭০ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলী জমি, মাছের ঘের, পানের বরজ, কলা ও সবজি বাগান। বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। সকাল থেকে পিরোজপুরে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে করে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সকল রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। তবে দুপুরের পর ঢাকার উদ্দেশ্য ছেড়ে গেলে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ নেছারাবাদে দু’টি লঞ্চ আটকে দেয় ।
বরিশাল অফিস জানায়, রেকর্ড বৃষ্টিপাত ও জোয়ারের পানিতে এখানকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ফসলী জমিসহ নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সদর উপজেলাসহ বাবুগঞ্জ, উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, বাকেরগঞ্জ, হিজলা, মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জের আমন ধানের বীজতলার ক্ষতির কথা জানিয়েছেন কৃষকরা। বিভিন্ন পুকুর পানিতে তলিয়ে মাছ বের হয়ে যাচ্ছে। নেটের মশারী দিয়ে মাছ রক্ষার চেষ্টা করছেন চাষিরা। বরিশাল নৌ-বন্দর থেকে সকল ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়েন।
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলায় ২৭১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত বলে নিশ্চিত করেছে গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিস। শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় এ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এতে জেলার টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া এলাকায় কয়েকশ’ মাছের ঘের ভেসে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পৌর এলাকার বাড়ি-ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে।
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-বরিশাল রুটের দ্রুতগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ গ্রীন লাইন-২ মেঘনা মোহনা অতিক্রম করার সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। ঝড়ো বাতাসে লঞ্চটির সামনের অংশের গ্লাস ও প্রধান গেটের লক ভেঙে ভিতরে পানি প্রবেশ করতে শুরু করলে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পরে এটিকে চাঁদপুর ঘাটে ভেড়ানো হয়। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। শনিবার সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে চাঁদপুর ত্রিমোহনা অংশে এ ঘটনা ঘটে। এতে অল্পের জন্যে রক্ষা পেয়েছেন ৫ শতাধিক যাত্রী।
ইত্তেফাক/নূহু