দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে ১ টাকায় চা !

 
বর্তমান সময়ে দ্রব্য মূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি তাতে এক কাপ চা ৪ থেকে ৫ টাকা। আর একটি পান কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ টাকা করে বিক্রি হয়। সেখানে প্রতিকাপ চা ১ টাকা এবং পানও ১ টাকায় পাওয়া যাবে এমনটা ভাবাই যায় না। আপনি ভাবতে না পারলেও এই সত্যকে অবশ্যই বিশ্বাস করতেই হবে। প্রয়োজনে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন, নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার ফাগুয়াড়দিয়াড় ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের 'এক টাকার মোড়'-এ। চায়ের দোকানটিতে সকালে আর বিকেলে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। প্রথমে ৫শ' টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও এখন প্রায় পাঁচ লাখ টাকার পুঁজি তৈরি হয়েছে চা বিক্রেতা রজব ব্যাপারীর।
 
উপজেলার নওপাড়া গ্রামে ঈদগাহ সংলগ্ন এই মোড়টির নাম এক সময় নওপাড়া ঈদগাহ মোড় হিসেবে সকলের জানা থাকলেও এখন ওই মোড়টি সকলের কাছে 'এক টাকার মোড়' হিসেবে পরিচিত। শুধু নিজ এলাকার মানুষ নয় সেখানে নাটোর সদর সহ আশপাশের উপজেলা থেকেও চা খেতে আসেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। নওপাড়া গ্রামের সোবাহান ব্যাপারীর ছেলে চা বিক্রেতা রজবের বর্তমান বয়স তার প্রায় ৩৯ বছর। শিক্ষাদীক্ষা বলতে উপজেলার ঠ্যঙ্গামারা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে উঠে কয়েকদিন গিয়েছিলেন।
 
মুদি-দোকানদার বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় তিনি সেই ব্যবসার হাল ধরে ছিলেন। তখন থেকে তার ব্যবসার দিকেই ঝোঁক চলে আসে। ১৯৯১ সালে প্রথমে তিনি মাত্র পাঁচশ' টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। প্রায় দু'যুগ ধরে এই চায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসা করে রজবের পুঁজি এখন প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। প্রথম দু'বছর পঞ্চাশ পয়সা করে এককাপ চা ও একটি পান বিক্রি করেছেন। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি এক টাকা করে চা ও পান বিক্রি  করে আসছেন। তার দোকানে প্রতিদিন প্রায় ১৫শ' কাপ চা ও ১২/১৩শ' পান বিক্রি হয়। অতি সামান্য লাভ করেই তিনি এখন নিজেকে স্বাবলম্বী মনে করেন।
 
IMG0
 
২০১৪ সালে লালন একই গ্রামের সুবর্ণা আক্তার শিমাকে বিয়ে করে। শিমা তখন নাটোর নবাব সিরাজ উদ-দৌলা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তাদের আড়াই বছরের আল-লাম নামে একমাত্র ছেলে সন্তান রয়েছে। স্ত্রী শিমা বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। লালন তার স্ত্রীকে আরো উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান। লালনের স্ত্রী সুবর্ণা আক্তার শিমা বলেন, 'আমার বাবার বাড়ি একই গ্রামে আমি আমার স্বামীর উদ্যোগকে শ্রদ্ধা জানাই। সংসার জীবনে আমি খুবই সুখি। তিনি আমার পড়ালেখার বিষয়ে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন।'
 
এক টাকার মোড়ের চা বিক্রেতা রজব ব্যাপারী বলেন, 'শুধুমাত্র টাকা রোজগার করাই আমার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। আমি মানুষের খেদমতে উদ্দেশ্য এক টাকা করে চা ও পান বিক্রি করি। আমার ২৪ বছরের ব্যবসায় প্রথম দু'বছর পঞ্চাশ পয়সা করে বিক্রি করি তার পর থেকে এখন পর্যন্ত এক টাকা করে বিক্রি করি, এটা আর বাড়বে না।' সরকারি বেসরকারি কোন আর্থিক সহযোগিতার চাহিদা নেই তার। তবে সর্বস্তরের জনসাধারণের সুবিধার জন্য এক টাকার মোড়ে দুটি সোলার লাইট দেয়ার বিবেচনা করার প্রত্যাশা করেছেন কর্তাব্যক্তিদের কাছে।
 
এক টাকার মোড়ের জমির মালিক মনিরুল ইসলাম দাবী করেন, 'আমাদের এখানে মানুষের বসার জন্য প্রথমে রজবকে একটি চায়ের দোকান বসানোর সুযোগ দেই। বর্তমানে ছোট-বড় পাঁচটি দোকান রয়েছে। আমি কোন দোকান থেকে ভাড়া নেই না।' ৫ নম্বর ফাগুয়াড় দিয়াড় ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বর খলিলুর রহমান বলেন, 'এক টাকার মোড় আমার ওয়ার্ড এলাকা সেখানে সকালে এবং বিকালে অনেক লোকজন আসে এবং দীর্ঘদিন যাবত রজব ১টাকা করে চা পান বিক্রি করে।'
 
এব্যাপারে বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসিরিন বানু বলেন, 'এ যুগে এক টাকায় কিছু পাওয়াটা দূরহ। রজব নিজেকে স্বাবলম্বী করেছে এবং স্ত্রীকে পড়ালেখা করাচ্ছে এটা খুবই গর্ভের ব্যাপার। একজন ভাল মনের মানুষ বলেই তিনি এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে তিনি সর্বসাধারণের জন্য সোলার লাইট প্রত্যাশা করেছেন তা অবশ্যই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে।' এমন উদ্যোগী মানুষের পাশে সবসময় থাকবেন বলে জানান তিনি।
 
ইত্তেফাক/জামান