করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) রয়েছে, কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দেন না, এমন টিআইএনধারীদের জরিমানার আওতায় আনতে চায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রাজস্ব ভবনে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, টিআইএনধারী রয়েছে ৪০ লাখ, অথচ রিটার্ন জমা দেন ১৮ লাখ। আগামী বাজেটে রিটার্ন জমা দেওয়াকে বাধ্যবাধকতায় আনতে ব্যবস্থা থাকবে। এক্ষেত্রে কিছু জরিমানা আরো আরোপ করা যায় কিনা, সেটি বিবেচনা করব। এছাড়া বাজেটে আয়কর বিষয়ে কিছু সংস্কার করা হবে বলেও জানান তিনি।
আগামী জুনে বাজেট ঘোষণাকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে পরামর্শমূলক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর। এরই অংশ হিসেবে গতকাল অর্থনীতিবিদদের একাধিক সংস্থা বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও প্রাইস ওয়াটারহাউজ কুপার্সের (পিডব্লিওসি) সঙ্গে আলোচনায় বসে এনবিআর। একই দিন বিকালে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বারের (এফআইসিসিআই বা ফিকি) সঙ্গেও আলাচনায় বসে এনবিআর।
দেশে টিআইএনধারী ব্যাপকহারে বাড়লেও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রিটার্ন জমাদানকারী বাড়ছে না। এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে এনবিআরে। বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশের ৭৫ ধারায় কারা আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট করে বলা আছে। তারা রিটার্ন জমা না দিলে সুদ ও জরিমানার বিধানও রয়েছে। তবে ওই শ্রেণির বাইরে টিআইএনধারীরা রিটার্ন জমা না দিলে কোনো ধরনের শাস্তি বা জরিমানার কথা বলা নেই।
সব টিআইএনধারীকে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতায় আনতে বিদ্যমান ডিজিটাল ব্যবস্থার সুযোগ কাজে লাগানোর প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। আলোচনায় অংশ নিয়ে সিপিডির সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, রিটার্ন জমা দেওয়া টিআইএনধারীদের খুঁজে বের করার সুযোগ এনবিআরের হাতে রয়েছে। মোবাইল ফোনে কল দিয়ে, এসএমএ, ই-মেইল কিংবা ডিজিটাল ব্যবস্থায় এটি করা সম্ভব। তাদের উপর সামাজিক ও নৈতিক চাপ তৈরি করা যায়।
অবশ্য এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, অনেকেই গাড়ি, ফ্ল্যাট ক্রয় কিংবা অন্য কোনো কাজের জন্য বাধ্য হয়ে টিআইএন নেন। রিটার্ন জমা না দেওয়াদের তালিকায় এ গ্রুপটিই বেশি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত কালো টাকার বিস্তারের ইস্যুটি তোলেন। তিনি বলেন, গত দুই বছরে দেশে কালো টাকার পরিমাণ সাত লাখ কোটি টাকা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অনেককে সুযোগ দেওয়ার পরও কতটুকু অর্থনীতির মূল স্রোতে এসেছে তা দেখতে হবে। এই ধরনের সুযোগ আর দেওয়া ঠিক হবে কি না— তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। কালো টাকা অর্থনীতির মূল স্রোতে আনার উদ্যোগে সফল না হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। আগামীতে অর্থপাচার ঠেকাতে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
জুলাই থেকে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া ভ্যাট আইনে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা এখনো পরিষ্কার নয় উল্লেখ করে বাজেটের আগেই এর একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা দেওয়ার প্রস্তাব দেয় সিপিডি। শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে আইনি সংস্কার করতে গিয়ে ভুল হলে তাতে এনবিআরের ঘাড়ে দায় চাপাবে বলেও মনে করেন তৌফিকুল ইসলাম খান।
ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের আগে
৬ মাস সময় চায় ফিকি
জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে পরিস্কার ধারণা না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফিকি। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সফটওয়্যারসহ নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য সময় দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ফিকি সভাপতি শেহজাদ মুনিম। তিনি বলেন, আইনটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে বাজারে গুজব রয়েছে। পরিকল্পনা দরকার। এ সময় তিনি বলেন, বাজেটে যেসব পরিবর্তন আনা হয়, এর কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তার বিশ্লেষণ করে তা প্রকাশ করা দরকার। ফিকির পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে করহার অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের চাইতে বেশি। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কর পরিকল্পনা থাকা দরকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ সময় বাংলাদেশে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধিসহ এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।