ডানে-বামে জাতীয় চার নেতা, মাঝে বঙ্গবন্ধু! মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চমুখ। নভেম্বর মাস এলেই এ দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় ১৯৭৫ সালের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কথা। পৃথিবীর ইতিহাসে আরেক কলঙ্কিত অধ্যায় '৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস'। শোকাতুর করে তোলে বাঙালি জাতিকে। সেই শোকাতুর মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে এই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও '৭৫-এর কলঙ্কময় অধ্যায়। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সোনালি রঙের পিতলে তৈরি বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার ম্যুরাল 'বঙ্গবন্ধু চত্বর' দর্শনীয়স্থানে পরিণত হয়েছে।
এ চত্বরে এলেই দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দিবে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী পাঁচ নেতার অবদান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ওই বছরের ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রকোষ্ঠে জাতীয় চার নেতা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, মন্ত্রীসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
তরুণ-তরুণীদের ফেসবুক, টুইটার আর ইন্টারনেটসহ ভার্চুয়াল জগতে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে তোলা ছবি ছড়িয়ে যাচ্ছে বিশ্বময়। চমকপ্রদ এ চত্বরের পরিকল্পনা ও অর্থায়নের পুরো কৃতিত্বই প্রয়াত সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বীরমুক্তিযোদ্ধা ডা. ক্যাপ্টেন (অব.) মজিবুর রহমান ফকিরের। চত্বরের এক কোনায় রয়েছে বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবার। তাদের নামের সঙ্গে দেয়া হচ্ছে পরিচিতি। শিল্পী এম.এ মাসুদের পরিকল্পনায় পাথরে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ। বাদ যায়নি স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগে অবদান রাখা নেতৃবৃন্দও। বিকেল ঘনিয়ে এলেই বাড়তে থাকে উপস্থিতি। সৌখিনের কাছে হার মানছে রাজনৈতিক মতাদর্শও।
IMG0
বঙ্গবন্ধু চত্বরে চিত্রশিল্পী মৃণাল হক সোনালি রঙে তৈরি করেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। দুই পাশে রয়েছেন জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতি। বঙ্গবন্ধুর বাম পাশে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী, ডানপাশে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও অর্থমন্ত্রী এম কামরুজ্জামান। একপাশে রয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পুরো পরিবারের একটি গ্রুপ চিত্রায়ন করেন মৃৎশিল্পী মোহনগঞ্জের সুকেশ কুমার। পাথর কেটে কেটে তৈরি করা হয়েছে অপরূপ দৃষ্টির এ ছবিটি।
অন্যপাশে চিত্রশিল্পী এম.এ মাসুদ পাথরে ফুটিয়ে তুলেছেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, রুহুল আমিন, মুন্সী আব্দুর রব, সিপাহী হামিদুর রহমান, মোস্তফা কামাল, নুর মোহাম্মদ। পামবীথি সড়কের প্রতিটি গাছের গোড়ায় চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের অমর সৃষ্টি চিত্রকর্ম। ৬৯'র গণঅভ্যুত্থান, ৫২'র ভাষা আন্দোলন, ৭১'র মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যপটে অংকিত ছবি। রয়েছেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ বিশিষ্টজনের প্রতিকৃতি। চিত্রশিল্পী আফজাল হোসেন বাহাদুর পাথর কেটে চত্বরটিকে আলপনা খুদাই করেছেন।
নয়নাভিরাম সৌখিন কারুকার্যের ভিতরে একপলক বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে দেখতে তারুণ্যের ঢল নামছে গৌরীপুরে। অপরূপ সৌন্দর্যে পুরোধা প্রয়াত সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. ক্যাপ্টেন (অব.) মজিবুর রহমান ফকির পর্যটকদের বসার জন্য তৈরি করে ছিলেন স্টেইনলেস স্টিলের বেঞ্চ। যেখানে এক সাথে প্রায় ৫শ' পর্যটক প্রকৃতির হাওয়া, দু'পাশের জলের কলতান আর পামবীথির রূপ নিতে পারবেন। কিন্তু রাজনৈতিক বৈরিতায় এসব উপকরণ আজ থানায় আটকে রয়েছে। খুলে নেয়া হয়েছে ফ্যানসহ নিরাপত্তায় থাকা সিসি ক্যামেরাও। এ স্বপ্নের পুরোধা ক্যাপ্টেন (অব.) মজিবুর রহমান ফকিরের ইচ্ছা ছিলো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এই মুর্যালের উদ্বোধন করবেন। যা জীবনদশায় পূরণ হয়নি। তবে এসেছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী মো. নাসিম। তিনি বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় ৪ নেতার ভাস্কর্যে পুষ্পমাল্যও অর্পণ করেন।
ইত্তেফাক/জামান