রাজধানীর বাড্ডায় বিপিএলের ক্রিকেট খেলা নিয়ে জুয়ায় বাধা দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে। নিহত শিক্ষার্থী হলেন নাসিম আহমেদ এনায়েত উদ্দিন (২৩)। তিনি বেসরকারি মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তার বাবার নাম আলী আহমেদ ফয়জুদ্দিন। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়ায়। ঢাকার মধ্যবড্ডার পোস্ট অফিসের গলিতে ৯৭২, ভূইয়া গার্ডেন নামে বাড়ির দ্বিতীয় তলায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। মাত্র ৯ মাস আগে বিয়ে হয়েছিল নাসিমের।
সোমবার সকাল ৯ টার দিকে তার বাড়ির সামনে ২ জন যুবক উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হলে, চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
বাড্ডা থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, নাসিমদের বাড়ির পাশে বোর্ড ঘরে (ক্যারাম বোর্ড খেলার স্থান) বিপিএলেল চার ছক্কা নিয়ে বাজি ধরার জের ধরেই নাসিমকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হত্যাকারীদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের ধরতে অভিযান চলছে। নাসিমের বুকে, গলায় ও কোমরে ছুরিকাঘাত করা হয়।
নিহত নাসিমের ছোট ভাই ইম্পেরিয়াল কলেজের দ্বাদস শ্রেণির ছাত্র নাবিল আহম্মেদ বলেন, এলাকায় বিপিএল খেলাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উন্মাদনা রয়েছে। রয়েছে ক্যারাম বোর্ড খেলা আর রমরমা জুয়ার আসর। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাদের বাসার পেছনের একটি জায়গায় ক্যারাম খেলতে তার ভাই নাসিম। রবিবার সন্ধ্যায় সেখানে ক্যারাম খেলতে গিয়ে দেখতে পায় মোটা অঙ্কের জুয়া চলছে সেখানে। সেটিতে বাধা দিতে গেলে জুয়ার আসরে থাকা রমজান আলী, আসিফ, শহীদুল, রশিদ, মিলন ও রফিক নামে তার উপর চড়াও হয়। বাক-বিতণ্ডার এক পর্যায়ে বিষয়টি হাতাহাতির পর্যায়ে গড়ায়। পরে বিষয়টি মিমাংসা করতে গেলে তার বাবাকেও মারধর করে ওই জুয়ারিরা। এরপর রাতে এলাকার মুরব্বিদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, সোমবার বিকালে বিষয়টি নিয়ে মহল্লায় বৈঠক বসবে। কিন্তু তা আর হলো কই। ‘সকালেই ওরা আমার ভাইকে মেরে ফেলল’ বলেই কান্নাকাটি করতে থাকে নাবিল।
সোমবার সকালে পূর্ব বাড্ডায় নাসিমের বাসায় গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের ভীড়। নাসিমের স্ত্রী শামীমা জাহান অন্তী আহাজারি করছেন। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন মা পারভীন আক্তার। তিনি বলেন, ‘জুয়া খেলায় বাধা দেওয়ায় আমার ছেলে খুন হবে ভাবতে পারিনি। ছেলে আমার জুয়া খেলে না। ক্যারাম খেলতে গিয়েই জুয়ারিদের রোষানলে পড়েছে। প্রথমে শুনেছিলাম হাতাহাতিও হয়েছে। সেটা যে খুন পর্যন্ত গড়াবে আমি ভাবতেও পারিনি।’ তিনি বলেন, ‘ আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই’।
যেভাবে ঘটনা: প্রত্যক্ষদর্শী লিমন বলেন, সকাল ১০টার দিকে সে পোস্ট অফিস গলি দিয়ে বের হয়ে কাজে যাচ্ছিল। তখনই সে দূর থেকে নাসিমকে ছুরি মারার দৃশ্য দেখতে পায়। লিমন বলেন, ‘ আমি দেখতে পাই, একজন নাসিমকে হুমানে (সমানে) ছুরি মারতাছে। তাই দেইখ্যা আমি ওরে ধরার জন্য দৌড় দিয়ে, কইতে থাকি ধর ধর, কিন্তু কেউ ওরে ধরল না।’
পোস্ট অফিস গলির নাসিমদের বাসার পেছনেই পাশাপাশি দুটি টিনের ঘর। সেখানে নিয়মিত ক্যারাম খেলা হয়। পাশেই মাছের বাজার। গত রবিবার বিপিএল খেলার সময় দুটি টিনশেড ঘরের ক্যারাম খেলার সময় মাদক সেবন করা হয়। অনেকটা ক্লাবের মত এই টিনশেড ঘরে ক্যারাম খেলার সময় বিপিএলের চার ছক্কা নিয়ে বাজি ধরার প্রতিযোগিতা চলে। এই নিয়ে তাদের মধ্যে নানান মত বিরোধেরও সৃষ্টি হয়। তারা সিলেট ও কুমিল্লার খেলার সময় কেউ সিলেটের খেলোয়ারদের পক্ষে আবার কেউ কুমিল্লার খেলোয়ারদের পক্ষে বাজি ধরে। এ সময় ওই টিনশেড ঘরে নাসিমও ছিল। অন্যদের সঙ্গে এই নিয়ে বাজি ধরার এক পর্যায়ে রমজান, রশিদ ও মিলনসহ আরো কয়েকজনের মধ্যে প্রথমে ঝগড়া এরপর হাতাহাতি হয়। ঘটনাটি এক পর্যায়ে এলাকার মুরব্বিদের কানে যায়। নাসিমের বাবা বিষয়টি মিমাংসা করার চেষ্টা করে। কিন্তু রমজান ও রশিদের লোকজন নাসিমের বাবাকেও মারধর করে। বিষয়টি আস্তে আস্তে অনেক জটিল হয়ে ওঠে।
ঘটনাস্থলে পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা: এদিকে ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগ পুলিশের উপ-কমিশনার মোস্তাক আহমেদ, বাড্ডা জোনের সহকারি কমিশনার আশরাফ আলী ও বাড্ডা থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী। পরবর্তীতে র্যাব, পিবিআই, ডিবি পুলিশও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ও নিহতের স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে সার্বিক বিষয়ে খোঁজ খবর নেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী বাড্ডা জোনের সহকারী কমিশনার আশরাফ আলী বলেন, ‘ঘটনা সম্পর্কে আমরা জেনেছি। ক্রিকেট খেলার সময় বাজি ধরাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের জের ধরেই নাসিম নামের ওই ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনায় এক বা একাধিক দুর্বৃত্ত জড়িত থাকতে পারে। জড়িতদের গ্রেফতার করার পর জানা যাবে প্রকৃতপক্ষে কারা কেন নাসিমকে হত্যা করেছে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। জড়িতদের ধরতে চেষ্টা চলছে।’
ইত্তেফাক/এমআই