কুমিল্লা ইপিজেডে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মালিকানাধীন শতভাগ রপ্তানিমুখী একটি সুতার মিল আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ‘আরএন স্পিনিং মিলস লিমিটেড’ নামে ওই কারখানায় গত সোমবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দশটি ইউনিট আট ঘণ্টা চেষ্টা করে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ছয়টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ততক্ষণে এক লাখ ৮২ হাজার বর্গফুট (প্রায় ১২ বিঘা) জমির ওপর নির্মিত মিলের সম্পূর্ণ উত্পাদন শাখা ভস্মীভূত হয়ে যায়।
আগুনে কেউ হতাহত হয়নি। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক সংকেত শুনে মিল থেকে বেরিয়ে যায় শ্রমিকরা। এ ঘটনা তদন্তে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন ও বেপজার প্রধান কার্যালয় থেকে পৃথক দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কা কাজ করছে শ্রমিকদের মধ্যে। কিভাবে সংসার চলবে, কবেনাগাদ চাকরি পাবেন—এসব চিন্তায় তারা দিশেহারা। তবে শ্রমিকদের দাবির প্রেক্ষিতে ওই মিলের ১২৯৬ জন শ্রমিকের মার্চ মাসের বকেয়া এক কোটি ৮০ লাখ টাকা বেতন আজ বুধবার পরিশোধ করার ঘোষণা দিয়েছে মিল কর্তৃপক্ষ।
কারখানার শ্রমিক দিদার, আজাদ, বাপ্পী, জাহাঙ্গীর ও জীবন জানান, মিলের এক্রিলিক শাখায় আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা মিলের কটন শাখাসহ অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। বেজে ওঠে মিলের সতর্ক সংকেত। আতঙ্কিত শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দ্রুত বের হয়ে যায় মিল থেকে। ওই কারখানায় দিনে-রাতে তিনটি শিফটে শ্রমিকরা কাজ করেন।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে প্রথমে ইপিজেড ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে। আগুনের তীব্রতা ভয়াবহ আকার ধারণ করলে জেলার বুড়িচং, সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম ও কুমিল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে আরো সাতটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।
দুটি তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাহিদ হোসেন সিদ্দিককে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের এবং বেপজার প্রধান কার্যালয় থেকে মহাব্যবস্থাপক (রক্ষণাবেক্ষণ) মো. জিল্লুর রহমানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের পৃথক একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দুটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হঠাত্ বেকার হওয়া ১৩শ শ্রমিক দিশেহারা
ইপিজেড সূত্রে জানা যায়, হঠাত্ প্রিয় কর্মস্থল আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা বাকরুদ্ধ ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সোমবার বিকালে কাজ শেষে যেসব শ্রমিক বাসায় চলে গিয়েছিলেন তারা খবর পেয়ে রাতেই কারখানায় আসতে চাইলেও ইপিজেডের প্রধান ফটকে নিরাপত্তার কারণে তাদের আটকে দেওয়া হয়। মিলের প্রজেক্ট ম্যানেজার সাজেদ আবদুল্লাহ কোয়েল জানান, ‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাত্ক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।’ তিনি আরো জানান, ‘এতো ক্ষয়ক্ষতির পরও বুধবার শ্রমিকদের মার্চ মাসের ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বেতন পরিশোধ করা হবে।’
কুমিল্লা ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মো. হাফিজুর রহমান জানান, ‘প্রোডাকশন ফ্লোরে আগুনের সূত্রপাত হয়, কারখানার কাঁচামাল কটন তুলা হওয়ার কারণে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আরো জানান, এ শিল্প কারখানাটি ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট মাসে উত্পাদনে আসে। এ পর্যন্ত এখানে ৩১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, রপ্তানি করা হয়েছে এক হাজার ৯৭৯ কোটি টাকার সুতা।’