শিক্ষককে অপসারণ করার দাবিতে ২৪ ঘণ্টা আল্টিমেটাম শেষ হওয়া তাণ্ডব চালিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ছাত্রলীগের একাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কার্যালয়, প্রশাসনিক ভবনসহ বেশ কিছু গাড়ি ভাংচুর করে তারা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের হোসপাইপ কেটে দেয় এবং প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে এক ঘণ্টা অবরোধ করে। মঙ্গলবার দুপুর ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত দফায় দফায় এসব ঘটনা ঘটে। এসময় এক সংবাদকর্মীকে মারধর করা হয়। তাণ্ডবকারীরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপু ও চট্টগ্রাম সিটি মেয়র, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজম নাছির উদ্দীনের অনুসারী।
জানা যায়, রবিবার দুপুর সাড়ে বারটার দিকে চবি ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন রিসার্চের সহযোগী অধ্যাপক ও বর্ধিত হোল্ডিং ট্যাক্সের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত সংগঠন করদাতা সুরক্ষা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আমির উদ্দিনকে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ১০-১২জন নেতাকর্মীরা মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। এছাড়া ওই শিক্ষককের অপসারণ দাবিতে স্বারকলিপি ও ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বেঁধে দেয়।
সেই আল্টিমেটামের বিষয় জানতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে মিছিল নিয়ে আসে। এসময় চবি ছাত্রলীগের সভাপতিসহ কয়েকজন নেতাকর্মী উপাচার্য কার্যালয়ে যান। উপাচার্য কার্যালয় থেকে বের হয়ে নেতাকর্মীদের নির্দেশে উপার্চায কার্যালয়সহ প্রাশাসনিক ভবনের বেশকিছু জানালা, গাড়ি ভাংচুর ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে। ভাংচুরের পরে মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরোপয়েন্টে অবস্থান নেয় এবং শাটল ট্রেনের হোসপাইপ কেটে দেয়। জিরোপয়েন্টে অবস্থান নেওয়ার সময় প্রধান ফটকে এক ঘণ্টা তালা ঝুলিয়ে রাখে তারা। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে চরম ভোগান্তিতে পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকতা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে তারা মূল ফটকের তালা খুলে দেয়। এসব বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া বাংলাভিশনের চবি প্রতিনিধিকে মারধর করে ছাত্রলীগের কয়েকজনকর্মী।
এদিকে হোসপাইপ কাটায় নগরীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার দেড়টার ট্রেন দেড়ঘণ্টা দেড়ি করে তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছেড়ে যায়।
ভাংচুর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে অবরোধ করার বিষয়ে প্রক্টর মোহাম্মদ আলী আজগর চৌধুরী বলেন, মিছিলের ১০মিনিট আগে ছাত্রলীগের একাংশ আমাদের কাছে অনুমতি নেয়। পরে মিছিল নিয়ে তারা উপাচার্য কার্যালয়ে গিয়ে উপাচার্যের সাথে কথা বলার পরে ভবন থেকে বের হওয়ার সময় প্রশাসনিক ভবনের বেশ কিছু জানালা ও গাড়ি ভাংচুর করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালাসহ শাটল ট্রেনের হোসপাইপ কেটে দেয়। তবে এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষকের অভিযোগ ও ছাত্রলীগের স্বারকলিপির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, শিক্ষকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ছাত্রলীগের স্বারকলিপির ভিত্তিতে তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদেরকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। এ রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে শিক্ষককে হুমকি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ভাংচুরের অপরাজনীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল এবং সমাবেশ করেছে প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতাকর্মীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক এইচ এম ফজলে রাব্বি সুজন ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিনের অনুসারী। সমাবেশে ফজলে রাব্বি সুজন বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিকের মতামত প্রকাশের অধিকার আছে। নাগরিক দায়িত্ব হিসাবে আমির উদ্দিন স্যার শহরের গৃহকর নিয়ে আন্দোলন করেছেন। যার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন যোগসূত্র নেই। কিন্তু ছাত্রলীগ নামধারী কিছু কর্মী তাদের নেতার নির্দেশে আমির স্যারের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। আমরা সেই নামধারী ছাত্রলীগকর্মী ও প্রশাসনিক ভবনে যারা হামলা চালিয়েছে তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শাস্তির আওতায় আনতে প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। নাহলে আমরা অনিদির্ষ্টকালের জন্য কর্মসূচি পালন করবো। এছাড়াও হুমকির ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতি কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তার জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতি প্রতি তীব্র নিন্দা প্রকাশ করছি।
উল্লেখ্য, রবিবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের গৃহকর প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন রিসার্চের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ আমির হোসেনকে মাথায় পিস্তল ধরে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সোমবার উপাচার্য বরাবর ওই শিক্ষকের অপসারণের দাবিতে স্বারকলিপি ও ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ স্থগিত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপু ও চট্টগ্রাম সিটি মেয়র, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজম নাছির উদ্দীনের অনুসারীরা।
ইত্তেফাক/আরকেজি