আমাদের দেশটি ছোট এবং আয়তনের তুলনায় জনঘনত্ব বিশ্বে সর্বাধিক। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের স্বাভাবিক প্রয়োজনেই নির্মাণ হইতেছে নিত্যনূতন ভবন। তবে সেইগুলি অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ হইতেছে অপরিকল্পিতভাবে ও দুর্বল তদারকির ভিতর দিয়া। ফলে বাড়িতেছে অগ্নিদুর্ঘটনার সংখ্যা। সামপ্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। গতকাল সোমবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত হইয়াছে, রাজধানীর কাওরান বাজার কিচেন মার্কেটের ভয়াবহ চিত্র। এই মার্কেটের ভবনের দেওয়াল ও ছাদের কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসিয়া পড়িতেছে। অনেক বিম ফাটিয়া গিয়াছে। লোহার পাইপের সাহায্যে কোনোভাবে তাহা ঠেস দিয়া রাখা হইয়াছে। প্রতিবত্সরই কাওরান বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং ক্ষয়ক্ষতিও হয়। এই মার্কেটটি এতোটাই ঘিঞ্জি যে, আগুন লাগিলে ফায়ার সার্ভিসও ঠিকমতো কাজ করিতে পারিবে না। অথচ প্রতিদিন হাজার হাজার ক্রেতা সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করিতে আসেন। ইহার ভিতরে এমনভাবে দোকান সাজানো যে, সরু গলি দিয়া হাঁটিতে গেলেও একজনের সহিত আরেকজনের ধাক্কা লাগিয়া যায়। আর দশটি মার্কেটের মতো এই মার্কেটেরও নাই কোনো অগ্নি নিরাপত্তার ব্যবস্থা। এখানে উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালে কাওরান বাজার কিচেন মার্কেটটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে ঘোষণা করে তত্কালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন। ইহার পর গত ২০ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির করপোরেশন সভায় কিচেন মার্কেটটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হইলেও ইহার মধ্যে এখনো ঝুঁকি লইয়া ব্যবসা পরিচালনা করা হইতেছে।
এমন একটি মার্কেট এখনো চালু রহিয়াছে কীসের অপেক্ষায়? সে কি কোনো বড় দুর্ঘটনা বা মর্মান্তিক জীবনহানির অপেক্ষায়? অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, ঢাকা শহরে বসবাস করিতে হইতেছে অগ্নিগর্ভের ভিতরে। ইহার মাটির নিচে গ্যাস, বিদ্যুত্ ও টেলিফোনের লাইন; ওপরেও বিদ্যুতের লাইন, বিভিন্ন তারের লাইন। এইসব লাইনে যদি কোনো সময় আগুন লাগিয়া গ্যাসপাইপের সহিত সংযুক্ত হইয়া যায়, তাহা হইলে পুরা শহরটিই অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হইতে পারে। তখন কোন ভবনটি বাদ দিয়া কোনটির আগুন নিভাইবে ফায়ার সার্ভিস? রাজধানী ঢাকার অব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমপ্রতি রাজউক কর্তৃপক্ষ বলিয়াছে যে, এতদিন কী হইয়াছে না হইয়াছে সেই অতীতে তাহারা ফিরিয়া যাইবে না—এখন হইতে নাকি রাজধানীবাসী দেখিতে পাইবে রাজউক কী করিতেছে! রাজউক কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করিয়া বলিতেছে যে, তাহাদের এখন পিছু হটিবার কোনো সুযোগ নাই। বেশ তারিফযোগ্য উক্তি বটে। বিধি অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা হইয়াছে কি না, যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রহিয়াছে কি না, তাহার জন্য অভিযান চালাইবার কথাও বলা হইতেছে। কিন্তু অনেকের মতে, ইহা হইল অগ্নিদুর্ঘটনার পর পর দৃশ্যমান নানা তত্পরতার কিছু অংশ। কিছুদিন যাইতে না যাইতেই সেই পুরাতন অভ্যাসগত শৈথিল্যের পুনরাবৃত্তি জাঁকাইয়া বসে। ফলে অগ্নিঝুঁকির সম্ভাবনা কোনোভাবেই হ্রাস করা যাইতেছে না। একইসঙ্গে অতীত অভিজ্ঞতা ও অব্যাহত দুর্ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষও পুরোপুরি আশ্বস্ত হইতে পারিতেছে না। এইভাবে চলিতে পারে না।