বজ্রপাতের পূর্বাভাস পৌঁছে না প্রান্তিক মানুষের কাছে

সারাদেশে বজ্রপাতে হতাহতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গতবছর দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো সিলেট আবহাওয়া অফিসেও স্থাপন করা হয় বজ্রপাত পূর্বাভাস যন্ত্র ‘থান্ডারস্টর্ম ডিটেকট সেন্সর’। এই যন্ত্র প্রতিদিনই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। আবহাওয়া অফিস থেকে এই পূর্বাভাস জেলার সরকারি অফিসগুলোতে ই-মেইলে পাঠানো হয়। কিন্তু এই পূর্বাভাস মাঠপর্যায়ে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে না। তাই প্রতিনিয়ত বজ্রপাতে মৃত্যুহার বাড়ছে।

এদিকে ঝড়বৃষ্টির মৌসুম শুরু হতে না হতেই এবছরও ঘনঘন বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে সিলেটের হাওরাঞ্চলে। গত সোমবার ও মঙ্গলবার দুদিনেই সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরে বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দেখা গেছে বজ্রপাতে ক্ষেতখামারে কাজ করা কৃষকই বেশি মারা পড়ছেন। এ অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা যাচ্ছেন সারাবছরের খোরাকি স্বপ্নের বোরো ধান কেটে আনতে। 

সরকারি হিসাবে ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত সিলেট ও সুনামগঞ্জে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে আরো বেশি। গতবছর নাসার এক প্রতিবেদনে জানা যায় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, বৃষ্টির মৌসুমে কৃষকদের মাঠে যেতেই হয়। এজন্য হাওরে কিছু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রয়োজন। কৃষকরা বজ্র বৃষ্টির সময় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পারেন। এছাড়া হাওরে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ডও স্থাপন করা দরকার। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, বজ্রপাত আশঙ্কাজনকহারে বাড়লেও এ ব্যাপারে কৃষকদের আগাম সতর্কবার্তা  পৌঁছে দিতে তত্পরতা কম। সিলেট আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ২০১৬ সালের পর থেকে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চল বজ্রপাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। বৈশাখে হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান তুলতে কৃষকদের মাঠে যেতেই হয়। কিন্তু এসময় প্রাণহানির আশঙ্কা  বেশি—এই কথা উল্লেখ করে সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ১২ ঘণ্টা আগে আমরা বজ্রপাতের পূর্বাভাস পেয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পাঠাই। আর সেই বার্তাটি হাওরাঞ্চলে পৌঁছালে অন্তত ওই সময় হাওরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন কৃষকরা।

সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বেশি ১০৫টি হাওর আছে সিলেট জেলায়। আর সুনামগঞ্জ জেলায় হাওর আছে ৯৫টি।  আয়তনের দিক দিয়ে হাওর এলাকা বেশি সুনামগঞ্জে। বজ্রপাতে বেশি প্রাণহানিও ঘটে এই জেলায়। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ বলেন, বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গতবছর হাওর এলাকায় তালবীজ রোপণ ও বিতরণ করা হয়। তিনি বলেন, এটা অনেক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এখানে পানি থাকে বেশি সময়। এতে বীজ নষ্ট হয়ে যায়। চারা গজায়নি।  তিনি বলেন, এখন হাওরের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় হিজল গাছ রোপণের উদ্যোগ নিচ্ছি। এর পাশপাশি শিগগিরই আরো আড়াই হাজার তালগাছের চারা হাওর এলাকার স্কুলগুলোতে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি।

বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাওর এলাকায় গত দুই বছর লক্ষাধিক তালবীজ রোপণ করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ তালবীজ থেকেই চারা গজায়নি। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ৫ নম্বর সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এহসান চৌধুরী বলেন, ২০১৭ সালে আমাদের কিছু তালবীজ দেওয়া হয় উপজেলা প্রশাসন থেকে। আমরা রোপণ করেছি কিন্তু গাছ হয়নি। বীজই নষ্ট হয়ে গেছে।