রটনার যুগে দু'টি শাকিল-ঘটনা

 
কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকর হলো। সারা বাংলাদেশের মতো বুয়েটের প্রগতিশীল ছাত্রনেতারাও প্রাণোচ্ছ্বলে ভাসল।
 
খোলস থেকে বেরিয়ে আসলো বুয়েটের জাহাঙ্গীর আলম নামের এক 'শিক্ষক'! যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষগুলোকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য শুরু করল।
 
প্রতিবাদে ফুঁসে উঠলো শুভ্র-কনকের নেতৃত্বে বুয়েট ছাত্রলীগ। ঘটলো কিছু ইতিবাচক (কারো কারো কাছে নেতিবাচক!) ঘটনা। সেই 'কারো কারো কাছে নেতিবাচক ঘটনা'র উপর ভর করে বুয়েট প্রশাসন বুয়েট ছাত্রলীগ এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শুভ্র-কনককে করলো আজীবন বহিষ্কার!
 
অন্যায়ভাবে বুয়েট প্রশাসন বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে আজীবন বহিষ্কার করবে, তা কি বুয়েট ছাত্রলীগসহ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা জেনেও হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে? সেদিন আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকি নাই।
IMG0
তৎক্ষণাৎ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এর তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সোহাগ-নাজমুলের নেতৃত্বে এক জরুরি সভার আয়োজন করা হলো। সভায় সিদ্ধান্ত হলো, আগামীকাল থেকে বুয়েটের শহীদ মিনারে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এর অবস্থান কর্মসূচি পালিত হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত শুভ্র-কনকের উপর জোর করে আরোপিত সিদ্ধান্ত রোহিত না হয়, ততক্ষণ আমাদের অবস্থান কর্মসূচি চলবে।
 
সামগ্রিক বিষয়টি আমাদের প্রিয় শাকিল ভাইয়ের সাথে শেয়ার করলাম। শাকিল ভাইয়ের তৎক্ষণাৎ আদেশ, শুভ্র-কনককে এখনই আমার বাসায় নিয়ে এসো। আমি যেতে পারলাম না। শুভ্র-কনককে শাকিল ভাইয়ের বাসায় পাঠালাম।
 
শুভ্র-কনককে শাকিল ভাই নির্দেশনাসহ যা করণীয় সব নির্দেশনা দিলেন। শাকিল ভাইয়ের বাসা থেকে বের হয়ে শুভ্র-কনক আমাকে বিস্তারিত জানালো। আমি বললাম, ভাই যেভাবে বলেছে, ওইভাবেই সবকিছু করতে হবে।
 
পরদিন থেকে সোহাগ-নাজমুলের নেতৃত্বে বুয়েট শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শুভ্র-কনকের অবৈধ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি। কর্মসূচি চলছে। কখনও আবৃত্তি, কখনও শিল্পী Pritom Ahmed ভাইয়ের প্রতিবাদী গান, কখনও আমার বন্ধু Pulak Adhikary পুলক (ওরা গান গাইতে এসেছিল ছাত্রলীগকে ভালবেসে, অর্থের বিনিময়ে নয়), কখনও আমার বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিশ্রুতিশীল কণ্ঠশিল্পীরা। 
কখনও আমাদের ছাত্রলীগের আমিনুলের গান।
 
দুইদিনের অবস্থান কর্মসূচি চলেছে। বুয়েট প্রশাসন নিরব! তবুও চলছে আমাদের আন্দোলন। আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনে দুপুর গড়িয়ে বিকাল। অবস্থান কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কি আমরা জানি না। তবুও সোহাগ-নাজমুলের নেতৃত্বে চলছে আমাদের কর্মসূচি।
 
হঠাৎ শাকিল ভাই আমাকে ফোন করলেন। সঞ্চালনার স্থান ছেড়ে একটু দূরে গিয়ে ভাইয়ের ফোন ধরলাম। ভাই ফোনটি ধরেই বললেন, জয়দেব, আন্দোলনের কি অবস্থা? আমি বললাম, ভাই ভালোই চলছে, কি হবে জানিনা। ভাই বললেন, 'কি হবে মানে? যা তোরা করছিস, ভালই করছিস। এখন আসল খবর শোন, মন দিয়ে,। আমি বললাম, কি ভাই?
 
ভাই বললেন, হাইকোর্ট রায় দিয়েছে, বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক শুভ্র-কনকের ক্লাস-পরীক্ষা দিতে আর কোন বাঁধা নেই। আমি বললাম, কি বলেন ভাই? শাকিল ভাই শুধু বললেন, 'আমার নামটা ঘোষণা না দিয়ে বাকি যা যা বললাম, তুই মাইকে ঘোষণা দিবি'।
 
আমি আনন্দে হতচকিত! 
 
আমি মঞ্চে এসেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের সাথে সবকিছু শেয়ার করলাম। আমাদের সাধারণ সম্পাদক বললেন, দাদা, শাকিল ভাই যা যা বলেছেন, আপনি তা পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘোষণা দেন।
 
ততক্ষণে ছাত্রলীগ এর তৎকালীন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মুখে বিজয়ের ছাপ স্পষ্ট!
 
আগেই বলে রাখি, উপর্যুক্ত সত্য ঘটনা, যা শাকিল ভাই আমাকে বলেছে; সেখানে শাকিল ভাইয়ের নাম প্রকাশ না করার শর্ত আমি শাকিল ভাইকে দিয়েছিলাম।
আমি মাইক্রোফোন হাতে নিয়েই হাজার হাজার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সামনে শাকিল ভাইয়ের দেয়া মহাগুরুত্বপূর্ণ তথ্য-'শুভ্র-কনকের ক্লাস-পরীক্ষা দিতে আর কোন বাধা নেই' ঘোষণা করলাম।
 
আমার সেই ঘোষণার সাথে সাথে হাজার হাজার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সে কি উল্লাস! সে কি আনন্দ! সে কি উচ্ছ্বাস! আমি জানি, হাজার হাজার ছাত্রলীগ নেতাকর্মী তা অন্তরে আজও ধারণ করে রেখেছে।
 
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভাই ও বোনেরা; আমি জানি, তোমরা সে সত্য ইতিহাস ভুলে যাও নি, বুয়েট ছাত্রলীগ সে ইতিহাস সেে ইতিহাস ভুলে যাও নি?
 
(২) বর্তমান ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবু আর আমি অফিসে বসে 'মাতৃভূমি'তে যাদের লেখা যাবে, তাদের লেখা সংগ্রহ করছি। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মাতৃভূমি প্রকাশনাটি প্রতিবছর প্রকাশ করে; যে প্রকাশনাটি আমাদের নেত্রী নিজেই প্রতিবছর মোড়ক উন্মোচন করেন।
সাইফ আমাকে বললো, দাদা, শাকিল ভাইকে একটা ফোন দেন। শাকিল ভাইকে ফোন করলাম।... ভাইকে বললাম, ভাই, মাতভূমি'র জন্য বঙ্গবন্ধু অথবা বঙ্গমাতা নিয়ে আপনার একটা কবিতা চাই। শাকিল ভাই বললো, জয়দেব, বঙ্গবন্ধু বা বঙ্গমাতা নিয়ে তো আমার কোন পূর্ণাঙ্গ কবিতা নাই রে...! অনেক কবিতায় বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা আছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কবিতা তো নাই! শাকিল ভাইয়ের কথা আমার পাশে বসে সাইফও শুনছে। সাইফ আমার কানে কানে বলছে, দাদা, নতুন করে লিখে দিতে বলেন। আমি ভাইকে বললাম, ভাই, ওরা তো চায়, আপনি দু'একদিন সময় নিয়ে বঙ্গবন্ধু অথবা বঙ্গমাতা উপর একটা কবিতা লেখেন মাতৃভূমির জন্য।
IMG1
সম্ভবত, ওইদিন রাতেই শাকিল ভাই আমার ফেসবুক ইনবক্সে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতা পাঠালেন। আমি সাথে সাথেই সাইফকে কবিতাটা পাঠিয়ে দিলাম।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শাকিল ভাইয়ের কবিতা; 'কিইবা লেখার থাকে', যেটি এবারের মাতৃভূমিতে ছাপা হয়েছে।
 
"কিইবা লেখার থাকে যখন সবনদী, পলিমাটি, পাহাড়ের গ্রাম দশ অক্ষরে লেখে ফেলে আপনার পিতৃদত্ত নাম? 
 
কতোটা কেটে যায় শ্রাবণের ধারাপাত, বর্ষার রাত? তার কিছুই আর মনে ধরেনা, ধানমন্ডির লেকের পারে জলপাই খুনি, এখনো চিনি।
 
বাংলাদেশ নামক সহজিয়া শব্দ লিখতে গিয়ে প্রায়শই ভুল করে লেখে ফেলি আপনার নাম, মিষ্টি প্রমাদ ভাসায় অবিরাম।
 
কতো বেশি ভালোবাসা ছিল বইয়ের সেলফে, তর্জনীতে, উদ্যত ইশারায় প্রশ্ন করে ফেলার আগেই আপনি সর্বনাম, বিশ্বাসঘাতকতার নরোম হরিণ-শিকার, সাহেরা খাতুনের খোকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।"
 
পরপরই ভাই আমাকে ফোন দিলেন, 'জয়দেব, কবিতাটা পড়েছিস?' জ্বি ভাই। অনেক ভাল হয়েছে। তবে বঙ্গমাতাকে নিয়েও লেখেন। ভাই বললেন, 'বঙ্গমাতাকে নিয়ে লেখা!!! ও নেত্রী আর রেহানা আপা ছাড়া অন্যরা কেউ ভাল পারবে না।' ভাই লেখেন না। ভাই বললো, 'আচ্ছা দেখি'।
 
পরদিন ভোর ছয়টার দিকে ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুক খুলতেই শাকিল ভাইয়ের ওয়ালে দেখি বঙ্গমাতাকে নিয়ে শিরোণামহীন কি এক অসাধারণ কবিতা! লাইক বাটনে ক্লিক করতেই ভাইয়ের ফোন। পড়েছিস? নাকি, না পড়েই লাইক দিলি? ভাই, আমি আপনার লেখা না পড়ে লাইক দি না। আচ্ছা, আমি পড়ছি, তুই শোন। জ্বি ভাই। ভাই, আবৃত্তি শুরু করলেন, বঙ্গমাতাকে নিয়ে সদ্য লেখা একমাত্র কবিতা : 'পূণ্যে পূর্ণ হে মুগ্ধ জননী'...
 
"পুণ্যে পূর্ণ হে মুগ্ধ জননী
-----------------------
সুনিপুণ দক্ষতায় সংসার চলতো নিদানের কালে, রাত্রি আর দিনে। পানের বাটায় খেলা করতো আগরতলার মামলা, শৈশবের দেনমোহর।
 
এইসব প্রাত্যাহিক জীবন, কারাগারে নিত্য তাঁর আসা-যাওয়া, ধারালিপি, চালচিত্র আপনার রাত্রি আর দিন, হাত জুড়ে খেলা করে আপনার হাসিনা, লেকের জলে লম্ববান কামাল।
 
খুব বেশি অভিমান ছিলো ছোট্ট মেয়েটির? রেহানা যার বংশদত্ত নাম? দুরন্ত জামাল পালাই পালাই, রাসেলের সাইকেলে হতে পারে দুর্ঘটন, এই ভেবে উদ্বিগ্ন আপনি ছিলেন সতত সজাগ?
 
জানতে ইচ্ছে করে কেনোইবা বেরিয়ে এলেন বত্রিশের সিঁড়িতে, পনেরোর রাতে? কতোটা ভালোবাসায় জুড়ে রাখতেন আমাদের গোপন ডাইরি, আপনার শেখ মুজিব?"
 
আবৃত্তি করতে করতে ভাইয়ের গলা ভিজে যাচ্ছে, আধো আধো কান্না, পরবর্তীতে ভাইয়ের হাউমাউ করে কান্না। আবৃত্তি থেমে যাচ্ছে, কান্নার বন্যায়। আবার কান্নাকে ছাপিয়ে শুরু হচ্ছে আবৃত্তি। ভাইয়ের আবৃত্তি শুনে আমিও কাঁদছি। মাঝখানে শুধু মোবাইল যন্ত্রটা। ওপারে ভাই কাঁদছে, এপারে আমি। কিছুক্ষণ ভাই-আমি দু'জনে চুপ। আবার কান্না।
 
কাঁদতে কাঁদতে ভাই ফোনের লাইনটা কেটে দিলেন, অথবা কেটে গেল! আমি আর পালটা কল দিলাম না।
 
কিছুক্ষণ পর আবারও ভাইয়ের ফোন। জয়দেব, কবিতাটা এই মুহূর্তে আপাকে শোনালে কেমন হয়? আমি বললাম, ভাই, এতো সকালে আপাকে ফোন দেয়া কি ঠিক হবে? উনি বললেন, আপা তো খুব ভোরে ওঠেন, ফজরের নামাজ পড়েন। এখন ফ্রি আছে বোধহয়। আচ্ছা তুই রাখ, দেখি আপাকে পাই কিনা।
 
১০-১৫ মিনিট বাদে আবারও ভাইয়ের ফোন। ভাই কাঁদছে।........ 'আপাকে কবিতাটা আবৃত্তি করে শুনিয়েছি, সক্কাল বেলায় আপার মনটা খারাপ করে দিলাম রে জয়দেব।'
ভাই, আপা আপনার কবিতার আবৃত্তি শুনে কিছু বলেছেন?
ভাই বললেন, 'কবিতাটা শোনার পর আপা দু'মিনিট শুধু চুপ ছিলেন, দীর্ঘঃশ্বাস ফেলবার আওয়াজ শুনেছি।
 
(গত ৮ আগস্ট বঙ্গমাতার জন্মদিনে 'পুণ্যে পূর্ণ হে মুগ্ধ জননী' কবিতাটি দৈনিক সমকাল পত্রিকায় ছাপা হয়।)
 
প্রিয় শাকিল ভাই, আপনার ছাত্রলীগ আপনাকে কিছু দিতে পারুক আর নাই পারুক; অন্তত দুটি কবিতা আপনার কাছ  থেকে জোর করে আদায় করে নিয়েছে : বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতাকে নিয়ে অসাধারণ দু'টি কবিতা।
 
ভাই, আপনার সাথে কত হাজার স্মৃতি...!!! হে বিধাতা, লেখার শক্তি দাও...
 
শাকিল ভাই হারানো-দিনে  এটাই আমার নিবেদন। ভাল থাকবেন ভাই। ক্ষমা করবেন- সত্য প্রকাশের জন্য । ক্ষমা চাই।
 
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
 
লেখক: সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।