আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ মতানৈক্য বিএনপিতে

বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের নেতাকর্মীরা সাংগঠনিকভাবে ঐক্যবদ্ধ। অন্যদিকে মতানৈক্য দেখা যাচ্ছে বিএনপিতে। আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বরিশাল সিটি নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে রাজনৈতিক উত্তেজনা।

আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতারা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহকে নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু এর বাইরেও প্রয়াত সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরনের স্ত্রী সদর আসনের সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ, কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম, যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন মেয়র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনী লড়াই করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ প্রত্যেক ওয়ার্ডে গত দুই মাস সদস্য সংগ্রহ অভিযান চালান। প্রত্যেকটি কর্মসূচিতে তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে জানান দেন। এছাড়া ৩০টি ওয়ার্ডের স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রমে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সাদিক আব্দুল্লাহর পক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালান।

বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল জানান, মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণার পর মেয়র পদে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সাদিক আব্দুল্লাহ দিন-রাত সাংগঠনিক কার্যক্রমে ভূমিকা রেখে দলকে শক্তিশালী করছেন। এর পাশাপাশি মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখে চলছেন।

নগরীর একাধিক ওয়ার্ডের সভাপতি-সম্পাদকরা জানান, শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুতে দল কঠিন সংকটের মধ্যে পড়েছিল। আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ মহানগর আওয়ামী লীগের পদ-পদবীতে না থাকলেও তখন সকলকে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বর্তমানে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে থেকে সকল কোন্দল নিরসন করে সকলকে নিয়ে কাজ করছেন।

প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন মেয়র থাকাকালীন নগরীর উন্নয়নে যে ভূমিকা রেখেছিলেন গত সাড়ে ৪ বছরে বিএনপি’র মেয়র কামাল তা পারেননি। বিসিসি’র আয়ের চেয়ে ব্যয় কয়েকগুণ বেশি থাকায় কামালের পুরো সময়টা জুড়ে ছিল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়ে জটিলতা।

সদর আসনের সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ বলেন, তার স্বামীর অসমাপ্ত কাজ একমাত্র তিনিই সমাপ্ত করতে পারবেন। কেননা বরিশাল সিটি করপোরেশনকে নিয়ে হিরনের যে পরিকল্পনা সেটা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। ওই পরিকল্পনা তাকে ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মহানগর যুবলীগ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য মাহমুদুল হক খান মামুন জানান, আমি বিগত নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলাম। ছাত্র রাজনীতি থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪০ বছর দলের জন্য শ্রম দিয়েছি। বিরোধী দলে থাকাকালীন দলকে সংঘটিত করতে কাউকে তখন পাওয়া যায়নি। মামুন বলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি সত্, যোগ্য, শিক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দিবেন এ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে।

সর্বশক্তি নিয়ে আওয়ামী লীগ যখন সিটি নির্বাচনের জন্য প্রস্তত তখন বিএনপিতে নেই কোনো নির্বাচনী আমেজ। বিএনপি দলীয় বর্তমান সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল পূর্বে জেলা ও মহানগর বিএনপি’র সভাপতির পদে থাকলেও বর্তমানে দলে তার কোনো পদ-পদবী নেই। নানান প্রতিকূলতা পেরিয়ে গত চার বছর সারাদেশে কেবল আহসান হাবিব কামালই সিটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন সুকৌশলে। এ নিয়ে খোদ বিএনপি নেতা-কর্মীদের মাঝেই আহসান হাবিব কামালকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। তবে পৌরসভার প্রশাসক, চেয়ারম্যান ও সিটি মেয়রের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দলের পাশে থাকা এ নেতা বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী হলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বর্তমান সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, আমি বিগত সময়ে দলের প্রার্থী ছিলাম। দলের হয়ে কাজ করেছি। এখনো দলের সাথে আছি। আশা করি বিএনপির হাইকমান্ড আমাকে প্রার্থী হিসাবে বিবেচনা করবে।

সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ার বর্তমানে বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব পদে রয়েছেন। সিটি নির্বাচনে বিএনপি’র একক নিয়ন্ত্রণ কর্তা মজিবর রহমান সরোয়ারের দিকেই তাকিয়ে আছেন প্রথম সারির নেতা-কর্মীরা। কেননা কোন্দল কাটিয়ে মজিবর রহমান সরোয়ারের নেতৃত্বে এখানকার নেতারা ঐক্যবদ্ধ। দলের হাইকমান্ড সরোয়ারের সিদ্ধান্ত ছাড়া সিটি নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণ করবেন না বলে মনে করছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। এমনকি দলের স্বার্থে শেষ পর্যন্ত মজিবর রহমান সরোয়ারই প্রার্থী হবে এমনটাই জানান সরোয়ারের ঘনিষ্টজনরা।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও মহানগর সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার জানান দলের স্বার্থে তিনি যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত রয়েছেন। তবে সরকার যেভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে ভোট ডাকাতি করছে তাতে করে বরিশাল সিটির নির্বাচন নিয়ে তার সংশয় রয়েছে। তিনি বলেন অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বরাবরের ন্যায় এবারো বিএনপি প্রার্থীরই বিজয় হবে।

সরোয়ার-কামালের পাশাপাশি জেলা বিএনপি’র সভাপতি এবায়দুল হক চাঁনও প্রার্থী হতে আগ্রহী। কেননা দলের এ ত্যাগী নেতা একাধিকবার মেয়র পদে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বহিষ্কার হয়েছেন। সর্বশেষ নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তা প্রত্যাহারে তাকে জেলা বিএনপি’র সভাপতির পদে ফিরিয়ে আনা হয়। চাঁন জানান, বিগত নির্বাচনগুলোতে আমি দলের মনোনয়ন না পেলেও প্রধান নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব পালন করেছি। দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। তার মতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলের শীর্ষ মহল তাকেই মনোনয়ন দিবেন।

প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপা ও ইসলামী আন্দোলন

এদিকে জাতীয় পার্টি (জাপা) থেকে একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। মহানগর জাপা’র সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্শেদ চুন্নু জানান, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মহানগর সভাপতি টানা ৪ বার নির্বাচিত কাউন্সিলর একেএম মরতুজা আবেদীনই যোগ্য প্রার্থী। এছাড়াও কেন্দ্রীয় জাপা’র ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা জাপা’র আহ্বায়ক অধ্যাপক মহসিন উল ইসলাম হাবুল ও সদর উপজেলা জাপা’র আহ্বায়ক বশির আহমেদ ঝুনুও প্রার্থী হচ্ছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশর মহানগর কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল্লাহ নাসেরকে সম্প্রতি ৪টি সাংগঠনিক শাখার কমিটিতে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু