চাকরির বাজারে ভালো করছে প্রতিবন্ধীরাও

শারীরিক প্রতিবন্ধীরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে সমানতালেই কাজ করতে পারছে। ক্ষেত্রবিশেষে তারা অন্যদের চাইতেও ভালো করছে। ফলে ধীরে ধীরে এ ধরনের কর্মীদের প্রতি প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের প্রতিবন্ধীদের অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে আলাদাভাবে কর্মোদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। 
 
রাজধানীর কাওরানবাজারে বিজিএমইএ ভবনে শনিবার এ ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে যোগ্যতা মূল্যায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত চাকরি মেলায় (জব ফেয়ার) সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে তারা এসব কথা বলেন। 
 
এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) আওতাধীন বাংলাদেশ বিজনেস এ্যান্ড ডিজঅ্যাবিলিটি নেটওয়ার্ক (বিবিডিএন) এ মেলার আয়োজন করে। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন ও সংস্থা এ উদ্যোগে সহযোগিতা করছে। 
 
কুড়িগ্রামের চিলমারি থেকে প্রায় ১৯ ঘন্টা সড়কপথ ভ্রমণ করে মেলায় চাকরির খোঁজে এসেছেন আংশিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মনিন্দ্রনাথ সরকার। সমাজবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা চল্লিাশোর্ধ মনিন্দ্রনাথ এর আগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন প্রকল্পে চাকরি করলেও এখন বেকার। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও মাকে নিয়ে তার সংসার চালাতে এখন চাকরি দরকার। মেলায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে নিজের বায়োডাটা দিয়েছেন। তবে তখনো কোথাও চাকরির নিশ্চয়তা মেলেনি। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ঢাকায় থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। আজই (শনিবার) আবার কুড়িগ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা দিতে হবে।
 
রংপুরের বদরগঞ্জের রতন চন্দ্র সরকার নামে এক তরুণ এসেছেন সাভারের সিআরপি থেকে। জন্মগতভাবে দুই পা খোঁড়া রতন গত ছয় মাস ধরে সিআরপিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এর আগে টিউশনি করে বৃদ্ধা মাকে সংসাারের খরচ যোগাতে সহযোগিতা করেছেন। মেলায় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, উর্মি গ্রুপ ও চট্টগ্রাম গ্রামার স্কুলে (ঢাকায়) বায়োডাটা জমা দিয়েছেন। আশা করছেন, যে কোন এক জায়গায় চাকরি হয়ে যাবে। তুলি এলিজাবেথ কস্তা নামে শারীরিক প্রতিবন্ধী এক তরুণীও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বায়োডাটা জমা দিয়েছেন। কম্পিউটারের কাজ জানা তুলি বলেন, অনেক আশা নিয়ে এসেছি। একটি চাকরি দরকার।
  
মেলায় চাকরির সুযোগ নিয়ে উপস্থিত হওয়া ভিনটেজ ডেনিম নামে একটি তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী গ্রুপের দুটি কারখানায় প্রায় একশ’ শারিরীক প্রতিবন্ধী শ্রমিক কাজ করেন। মেলা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা তিনটি  বায়োডাটা সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিক ছোট-খাট ইন্টারভিউ নিয়ে দুইজনের চাকরি নিশ্চিত করেছে। স্টলে উপস্থিত প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির নিজেও শারিরীক প্রতিবন্ধী। তিনি বলেন, শুরুতে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগসহ কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই দ্রুত কাজ বুঝতে পারে। তাদের উৎপাদনশীলতাও ভালো। তাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে খুব একটা ঝামেলায় পড়তে হয়না। 
 
মেলায় এসে তাৎক্ষণিক এসকেই ক্লদিং নামে একটি গার্মেন্টস কারখানায় মানবসম্পদ বিভাগে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি পেয়েছেন স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা মোজাম্মেল হক মিয়া। বেতন খুব বেশি না হলেও তাতেই সন্তুষ্ট মোজাম্মেল হক। 
 
জব ফেয়ারে সাভারের সিআরপি থেকেই এসেছেন ৮০ জন। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও তাদের নিজস্ব উদ্যোগে চাকরিপ্রার্থীদের এনেছেন। সিআরপি থেকে আসা অর্ধেকেরই শনিবার চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। সিআরপি এসব প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী রমেশ চন্দ্র মালাকার ইত্তেফাককে বলেন, ২০০৬ সাল থেকেই তাদের এ কার্যক্রম চলছে। গত ১১ বছরে চাকরিদাতাদের মধ্যে প্রতিবন্ধী কর্মীদের বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তারা ঘন ঘন চাকরি ছাড়েনা। কাজেও দ্রুত দক্ষতা অর্জন করে। এখন গার্মেন্টসে এসব প্রতিবন্ধীদের চাহিদা বাড়ছে। কেউ কেউ পুরো একটি ফ্লোরই প্রতিবন্ধীদের দিয়ে চালাতে চান। চাহিদার অর্ধেকও সিআরপি সরবরাহ করতে পারেনা।
 
মেলা আয়োজনকারী সূত্র জানিয়েছে, শনিবার প্রায় সাড়ে তিনশ’ প্রতিবন্ধীর বায়াডাটা তারা পেয়েছেন। এর মধ্যে ৮০ জন তাৎক্ষণিক চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রায় তিনশ’জনের চাকরি হবে।
 
প্রতিবন্ধীদের জব ফেয়ায়েরের উদ্বোধন উপলক্ষ্যে শনিবার সকালে বিজিএমইএ ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী আবুল কালাম আজাদও বললেন, প্রতিবন্ধীদের মূল স্রোতের বাইরে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। 
 
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, শ্রম সচিব আফরোজা খান, গণস্বাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক তপন কুমার দাস, এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি কামরান টি রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 
 
ইত্তেফাক/এমআই