মঙ্গল গ্রহের সন্ধানে

শেওলামাখা পাথরে হোঁচট খেয়ে, জুতা জিন্স পানিতে চুবিয়ে, অবশেষে আমরা ‘কায়াক’ জাতীয় ফাইবার গ্লাসের ছোট্ট নাওখানা জলে ভাসাতে সমর্থ হই। আমাদের মেয়ে কাজরি প্লাস্টিকের পিচকারি দিয়ে পুঞ্জ পুঞ্জ জল সূর্যালোকে ছিটিয়ে তাতে রঙধনুর প্রতিফলন হয় কি-না তার নিরীক্ষণে ব্যস্ত হয়। তার জননী হলেণ দক্ষ হাতে বৈঠা চালায়। আমি হাল ধরে বসে নাও-এ ডাঁই করে রাখা তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ, শুকনা খাবার, সস্তা দুরবিন ইত্যাদি সমস্ত কিছু ঠিকমতো তোলা হয়েছে কি-না তার তদারক করি। টালি লেকের এ দিকটা দৃশ্যত একটি সুপরিসর নদীর মতো, বোধ করি উজানে কোথাও জল-বিদ্যুতের বাধ পড়েছে—তাই একদম সুনসান নিস্তরঙ্গ। মাঝে মধ্যে একটি দুটি জলে আধডোবা রক বাঁচিয়ে, শেওলাদাম, কচুরিপানা ও শ্বেতশাপলার পাশ কাটিয়ে আমাদের নৌকা চালাতে হয়। আমি ঈষত্ ভুলভাল বৈঠা চালিয়ে হাল ধরার সঠিক কায়দাটুকু মশকো করি। নাও-এর সামনা দিয়ে এলোপাতাড়ি সাঁতার কেটে, অবশেষে কচুরিপানার ওপর দিয়ে নিচু হয়ে উড়ে প্রায় অর্ধডজন ‘ম্যালার্ড’ নামের সবুজ গ্রীবা সুদৃশ্য হাঁস। আমি হাল ধরে থেকে তরঙ্গহীন জলে দীর্ঘ তরু বনানীর প্রতিফলন দেখি। জলমগ্ন প্রতিফলনের দৃশ্যমালায় আমাদের নাওখানা শরিক হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা এসে পড়ি টালি লেকের সহস্রাধিক একরজোড়া সুপরিসর জলধির একেবারে খাসমহলে। এ সরোবরে আছে অনেকগুলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জনবসতিহীন দ্বীপমালা।

আজ দু হাজার তিন সালের আগস্ট মাসের সাতাশ তারিখ। আজ ষাট হাজার বছর পর মঙ্গল গ্রহের পৃথিবীর অরবিটের খুব কাছাকাছি চলে আসার কথা আছে। তাই আমরা এখানে এসেছি বিদ্যুত্হীন একটি নির্জন দ্বীপ থেকে লোহিত বর্ণের এ গ্রহটিকে এক নজর দেখার প্রত্যাশায়। মঙ্গলগ্রহ পর্যবেক্ষণের জন্য টালি-লেকের দ্বীপগুলো নির্বাচন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি শৌখিন আকাশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা। কথা আছে আমরা কোপারনিকাস নামক মিনিয়েচার আইল্যান্ডে তাঁবু খাটিয়ে সন্ধ্যা অব্দি অপেক্ষা করব। রাতে সংস্থাটি পেল্লায় টেলিস্কোপ দিয়ে গ্রহ দেখার বন্দোবস্ত করবে।

কিন্তু চোখের সামনে ভেসে থাকা ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপগুলোর কোনটি যে কোপারনিকাস আর কোনটি যে গ্যালিলিও—তা বুঝব কীভাবে? খানিক ভাবিত হয়ে আমরা ধবল একটি সারসের ডানার রেখা অনুসরণ করে নাও চালাই। কাজরি পিচকারি দিয়ে জল ছুড়ে বোধকরি পাখিটির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। হলেণ হালকা দুরবিন দিয়ে খুঁটিয়ে দ্বীপগুলো দেখতে থাকে। সে অবশেষে একটি দ্বীপের সংলগ্ন জলে আধডোবা রকে বসে থাকা একটি মেয়েকে স্পট করে। আমরা জনমানুষের সন্ধান পেয়ে বেজায় খুশি হয়ে সেদিক পানে নাও চালাই। রকের কাছাকাছি আসতেই দেখি—বিকিনির মতো স্বল্পবসন পরা সোনালি চুলের অল্পবয়সী মেয়েটি আমাদের দিকে চেয়ে চেয়ে হাত নাড়ছে। কিশোরীটির ব্রেইড করা চুলের অগ্রভাগ থেকে ঝুলছে শনি, মঙ্গল, বৃহস্পতি ইত্যাদি গ্রহমালার ধাতুতে তৈরি মিনিয়েচার মডেল। কাজরি তার দিকে তাকিয়ে আলটপকা বলে বসে, ‘আর ইউ অ্যা মারমেইড অর হোয়াট? তুমি কি মত্স্যকন্যা?’ তার প্রশ্নে মেয়েটি কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসে, হাসির গমকে তার কাঁচুলিতে গাঁথা রুপার তারকাগুলো দ্যুতি ছড়ায়। সে জবাবে বলে, ‘আমি স্পেইস মেইড, টালি-লেকের স্পেইসে আমি আজ ট্রাফিক সামলাচ্ছি, তোমরা কোন দ্বীপে যাবে?’ মেয়েটির গলার লকেটে ‘অ্যামেচার অ্যাসট্রোনমিক্যাল ক্লাবের’ প্রতীক ঝুলতে দেখে—সে যে ভলানটিয়ার হিসাবে কাজ করছে তা বুঝতে পারি। সে উঠে দাঁড়িয়ে রকের প্রান্তে এসে হাতের ইশারায় আমাদের একটি ছোট্ট দ্বীপ দেখিয়ে দেয়।

কোপরনিকাস নামক আমাদের এ দ্বীপটি আয়তনে অর্ধ একরের মতো। এতে জনমানুষ নেই বটে, তবে গাছে গাছে ঝুলছে একাধিক ছোট-বড় পাখির বাসা। খটখটে শুকনা পাথুরে ভূ-ভাগে অবলীলায় গজিয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ ফার্ন। বেশ ক’টি ‘জ্যাক রাবিট’ জাতীয় বাদামি লোমের খরগোশ লাফিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। হলেণ দ্বীপে নেমেই দক্ষ হাতে খাটিয়ে ফেলে একাধিক তাঁবু্। কাজরি খেলাধুলার জন্য স্বতন্ত্র শিশুতোষ তাঁবু, তার পাশে সামনাদি রাখার জন্য আরেকটি সাপ্লাই ট্যান্ট। প্যারাফিনের চুলাটি আনতে ভুলে গেছি বলে আমার ওপর দ্বায়িত্ব পড়ে কাঠ কুড়ানোর। কাজরি একটি ফুট দশেকের মতো উঁচু অর্ধবৃত্তাকার ধূসর রকে চড়ে বসে তাতে রঙিন খড়ি দিয়ে আঁকছে গাছপালা, ভূগোলক, মানুষ, পাখি ও কুমিরের চিত্র। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় সে বুঝি চিত্রাদি এঁকে গ্রহান্তরের আগুন্তুকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বেলা পড়ে এলে পর—আমরা দ্বীপের প্রান্তে এসে জলে পা ডুবিয়ে একটি পাথরের ওপর বসি। সারা হ্রদ ও তার পাড়ের বর্ণাঢ্য পত্রালিতে ভরপুর বনানী ভরে উঠছে দিগচক্রবালে হেলে পড়া সূর্যের ক্রিমসন আভায়। আমাদের সামনে সাঁকোর মতো বাঁকা হয়ে ওড়ে কালচে ধূসর সাদায় মেশানো ‘কানাডিয়ান গিজ’ নামক বৃহত্ সব হাঁসের সারি। তাদের উড্ডয়নে সারা সরোবর থেকে থেকে ভরে ওঠে ‘কোয়াক কররর কঙ’ ধ্বনিতে। হলেণ কাগজের প্লেটে প্লেটে পরিবেশন করে পোড়া ভুট্টা, আলু, ভেজিটেবল বার্গার ও এক মুঠো করে কিসমিস। খেতে খেতে আমরা খেয়াল করি একটি পালতোলা নাও আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। নাওটির পালে জ্বলন্ত পুচ্ছ ধূমকেতু ও তীব্র নীল এক নীহারিকার ছবি আঁকা। এর মাস্তুলের শীর্ষে উড়ছে ‘অ্যাসট্রোনমিক্যাল ক্লাব’-এর প্রতীক আঁকা ঝাণ্ডা। নাওখানা কাছে এলে এর হাল ধরে বসে থাকা সোনালি চুলের কিশোরীকে দেখতে পেয়ে আমরা হাত নাড়ি। নাও-এর বাদবাকি দাঁড়িরা সকলে মঙ্গল গ্রহের কাল্পনিক সব সবুজ মানুষের পোশাকে সেজে খুব জাঁক করে ঢিমে তালে বৈঠা ফেলছে। একপর্যায়ে খুব কায়দা করে তারা নৌকাটির গতি শ্লথ করে। হালে বসা মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের বলে, ‘এই যে উল্টা দিকের গাছপালাহীন ছোট্ট পাথুরে দ্বীপটি দেখছো, ওখানে রাত দশটা নাগাদ চলে আসো, গ্র্যান্ড টেলিস্কোপটি ওখান থেকে আকাশে তাক্ করা হবে।’ এ পর্যন্ত বলে তারা নায়ের গতি পাল্টিয়ে অন্যদিকে ভেসে যায়।

বিকাল আরো গাঢ় হয়ে এলে পর জল তোলপাড় করে সূর্যাস্তের দিকে উড়ে যায় দুটি শুভ্রডানা বিশালকায় সোয়ান। একটু পরপরই লেকের জল ছুঁয়ে একটি ‘সিপ্লেইন’কে উড়তে দেখা যায়। জল-বিমানটি অবশেষে বৃক্ষহীন কচ্ছপের খোলের মতো ভেসে থাকা এক চিলতে দ্বীপের পাশে এসে ল্যান্ড করে। এখান থেকে খালি চোখে দেখা যায়-তিন জন লোক ধরাধরি করে সিপ্লেইন থেকে নামাচ্ছে পেল্লায় একটি টেলিস্কোপ। এদের মধ্যে একজন যে ‘অ্যাসট্রোনমিক্যাল ক্লাব’-এর প্রেসিডেন্ট ডক্টর টমাস ফ্লিটি তা হলেণ চিনতে পারে। ডক্টর ফ্লিটি হলেণের পূর্বপরিচিত। সে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এ জ্যোতির্বিজ্ঞানী সেখানে অ্যাস্ট্রা-ফিজিক্সজাতীয় কিছু একটা পড়াতেন। কিছুদিন আগে চেইন স্মোকার এ বৈজ্ঞানিকের গলায় ক্যানসার হলে অস্ত্রোপচার করা হয়। ডক্টর ফ্লিটি আরোগ্য লাভ করলেও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেননি। তবে তার জ্যোর্তিবিজ্ঞানজনিত পূর্বপেশায় আগের মতোই মেতে আছেন।

যেহেতু ডক্টর ফ্লিটি হলেণের পূর্বপরিচিত, তাই আমরা রাত দশটা বাজার অপেক্ষা না করে একটু আগেভাবে নাও ভাসিয়ে নোঙর করা জল-বিমানের কাছাকাছি চলে আসি। এখানে কাঠ পেতে জেটির মতো করা হয়েছে; তাই তারাজ্বলা আকাশের আলোয় দ্বীপে ল্যান্ড করতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। ডক্টর ফ্লিটি হলেণকে সম্ভাষণ জানান। তাঁর গলার স্বরে আমরা চমকে ওঠি। কাজরি ফিসফিস করে বলে, ‘হি ইজ সাউন্ডিং লাইক অ্যা মার্সিয়ান—তিনি মঙ্গল গ্রহের অধিবাসীদের মতো কথা বলছেন।’ হলেণ তার কব্জি টিপে ধরে তাকে নিশ্চুপ হওয়ার ইশারা দেয়। মনে হয়—অস্ত্রোপচারে ডক্টর ফ্লিটির স্বরযন্ত্রটি সম্পূর্ণ কাটা গেছে। তাই তিনি স্বাভাবিক বাকশক্তি হারিয়ে কণ্ঠনালীতে লাগানো মাইক্রোফোনের সাহায্যে ধাতবস্বরে কথা বলছেন।

তাঁর বৃহত্ টেলিস্কোপটি দেখতে অনেকটা মীরজুমলার কামানের মতো। তাতে চোখ রাখার জন্য কাজরি তিন ধাপ সিঁড়ি ভেঙে একটি প্ল্যাটফর্মে উঠে দাঁড়ায়। সে আইপিসে চোখ রাখলে-ডক্টর ফ্লিটি ধাতব খোনা গলায় বলেন, ‘লিটল গার্ল, তুমি এ মুহূর্তে যে রকম মঙ্গল গ্রহ দেখছো, তা ঠিক ষাট হাজার বছর আগে গুহাবাসী আদিম নিয়ানদারথালরা খালিচোখে দেখেছিল। এরপর মঙ্গল গ্রহ আবার পৃথিবীর কক্ষপথে এতটা কাছাকাছি আসবে ২২৮৭ সালে। জাস্ট এ হিসাবটা চিন্তা করে দেখো।’ কাজরির পর আমার গ্রহ দেখার পালা আসলে আমি মঙ্গলের মেরু অঞ্চলের তুষারাচ্ছন্ন পোলার আইসক্যাপ দেখতে চাই। ডক্টর ফ্লিটি দুরবিনে লালচে ফিল্টার পরিয়ে দিলে মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধের শাদাটে ড্রাই আইস পরিকীর্ণ অঞ্চল স্ফুট হয়। হলেণ দুরবিনে চোখ লাগিয়ে সৌরজগতের বৃহত্তম আগ্নেয়গিরি-যার শিখর প্রায় সতেরো মাইল উঁচু সেই ‘অলিম্পাসমন’ নামের আগ্নেয় পাহাড় দেখতে চায়। ডক্টর ফ্লিটি দুরবিণ ছেড়ে কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকে ‘ভয়জার’ নামক মহাকাশ যান থেকে তোলা আগ্নেয় পাহাড়ের ছবি দেখান।

লোহিতে কমলালেবু রঙের অ্যাকসেন্ট দেওয়া গ্রহটির দুরবিনজাত দৃশ্যপট দেখা শেষ হলে পর আমরা যখন বিদায় নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছি, ঠিক তখনই কাজরি আলটপকা জিজ্ঞেস করে বসে, ‘ইজ দেয়ার লাইফ ইন মার্স? মঙ্গল গ্রহে সত্যিসত্যিই জীবন আছে কি?’ ডক্টর ফ্লিটির মাইক্রোফোনে আবার ধাতব খোনা শব্দ হয়। তিনি নিরাসক্ত গলায় বলেন, ‘দ্যাখো, ১৯৯৬ সালে মঙ্গল থেকে আসা একটি বৃহত্ উল্কা অ্যান্টার্কটিকায় নামলে—নাসার বৈজ্ঞানিকরা তা সরেজমিনে নিরীক্ষা করার মওকা পান। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে—প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গলে মানুষের চুলের চেয়ে হাজারগুণ ছোট্ট ক্ষুদ্রতিক্ষুদ্র জীবাণুর অস্তিত্ব ছিল।’ ডক্টর ফ্লিটির মাইক্রোফোনে একটি লোহিত বাতি দপদপ করে জ্বলে। আরো দর্শনার্থীরা দুরবিনের কাছাকাছি জড়ো হচ্ছে দেখে আমরা বিদায় নিই।

জল-বিমানের জেটির কাছ থেকে খানিক কসরতে লগি ঠেলে নাওটি জলে ভাসাই। আকাশে মঙ্গল গ্রহ যেন চীনা লণ্ঠনের লাল ফানুস হয়ে উড়ছে। নিচে সরোবরের জলে শিশমহলে হাজারো মোমের শিখার মতো প্রতিফলিত হয় অজস্র তারকার মহাজাগতিক আত্মা। খানিক দূর থেকে ‘ডিজোরিডু’ নামক বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি ভেসে এলে আমরা পালতোলা নাওটিকে ছায়ার মতো ভেসে যেতে দেখি। আঁধার ঘনিয়ে এসেছে বলে সোনালি চুলো কিশোরীর কেশপ্রান্ত থেকে ঝুলন্ত ধাতব গ্রহমালায় বিচ্ছুরিত হয় না সৌরলোক। আমরা নীরবে বৈঠা বেয়ে পৃথিবীর অতি কাছে আসা এক লোহিত গ্রহের আলোয় ভেসে চলি নিজস্ব নির্জন দ্বীপের দিকে।