নাম কী? বোমফুটি। এ আবার কেমন নাম? কোন মানুষের নাম কী এমন হওয়া সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার উপজেলা ক্যাম্পাস সংলগ্ন শিতলী পাড়ায় বসবাসকারী ৫৮ বছর বয়সী মর্জিনার নামই বোমফুটি। তার নাম যে মর্জিনা তা এই এলাকার অধিকাংশ মানুষই জানে না। কিন্তু, কেন তার নাম বোম ফুটি? কারণ তার এই নামের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প।
স্বাধীনতার পর মর্জিনা এলাকার মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন বোমফুটি নামে। ৭১ সালে বোমের আঘাতে উড়ে গেছে মর্জিনার বাম পা ও বাম হাতের একটি আঙুল। শুধু তাই নয় উড়ে গেছে বুকের একটি অংশও। ফেলে রাখা বোমা বিস্ফোরণে মর্জিনার শরীরকে শুধু ক্ষত বিক্ষত করেনি; নিজের নামটিও সকলের কাছে ঢাকা পড়েছে।
নামের মতো তার স্মৃতিতে এখনো তরতাজা হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তি বাহিনীদের সম্পর্কে মর্জিনা বলেন, ‘আমাদের বিলের ধারে মুক্তি বাহিনীরা এসে সংগঠিত হতেন। তাদের সাথে আমার দেখা হতো, কথাও হতো। আজ তারা অনেকেই বেঁচে নেই। যেমন- তানোর হিন্দুপাড়ার মৃত নিশিত ও কার্তিক। তবে কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন; যেমন ত্রিনাথ, টুকু আরও অনেকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তখন তো খাবার পানির এতো ভালো ব্যবস্থা ছিল না। পানি আনতে হতো অনেক দূর থেকে। মুক্তিযুদ্ধারা ক্লান্ত হয়ে এসে পানি চাইতেন। আমি ছোট তাই দৌড়ে গিয়ে তাদের খাবার পানি এনে দিতাম। আমার অসুস্থতার খবর শুনে তারাই আমার চিকিৎসার জন্য জরুরিভাবে রাজশাহী হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয় তারা চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তাও করেছিলেন।’
স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও বোমফুটি মর্জিনার কোন স্বীকৃতি মেলেনি। তাতেও যেন তার কোন অভিযোগ নেই। বাঁশের লাঠির উপর ভর করে সহায় সম্বলহীন মর্জিনকে ছোট বেলা থেকেই জীবন অতিবাহিত করার জন্য বেছে নিতে হয়েছে ভিক্ষার পথ। এমনটিই জানালেন বোম ফুটি পরিচয়ে পরিচিত মর্জিনা।
মর্জিনার এ দুর্ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় অধিবাসী মো. আফসার আলী (৬৫), গোল্লাপাড়া গ্রামের জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত কৃষক নূর মোহাম্মদ (৭৫) জানান, ‘যুদ্ধের সময় তানোর থানা যেখানে অবস্থিত সেখানে পাক বাহিনীরা অবস্থান নিতেন। মুক্তি বাহিনীরা তাদের বিতাড়িত করার জন্য এলাকার রাস্তা বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে বোমা মেরে ভেঙে ফেলেন এলাকার সকল ব্রিজ ও কালভার্ট। পরবর্তীতে দিনের বেলায় পাক সেনারা অন্য জায়গায় চলে গেলে সেই সুযোগে গোপনে তাদের আস্তানায় বোমা পেতে রাখেন। এছাড়াও পুড়িয়ে দেন তাদের আস্তানাটি। পাশাপাশি এই এলাকায় যেন পুনরায় যাতে আস্তানা না গড়তে পারে সে উদ্দেশ্যে বাঙ্কারে বোমা পেতে রাখেন। এমনি অবস্থায় শীতলী পাড়ার মর্জিনা মেয়েটি খড়ি (জ্বালানি) সংগ্রহের জন্য যান তানোর থানার পাশে। বাঙ্কারে পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরিত হয়ে জ্ঞান হারান তিনি। সেই থেকেই পঙ্গু হয় মর্জিনা।’
শারীরিক অবস্থার সাথে সাথে তিনি কখনোই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি সংসার গড়েছেন। তার একটি মাত্র ছেলে সন্তান। ছেলেকে বিয়েও দিয়েছেন। নাতি নাতনি নিয়ে ৬ সদস্যের পরিবার। বর্তমান জীবনযাপন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘৫-৬ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছি। তাই আমাকে এখন বিধবা ভাতা হিসেবে মাসে ৪০০ (চারশত) টাকা সহায়তা পাই। যার পুরাটাই আমার ঔষধ খরচেই লেগে যায়।’
সারা জীবন পার করেছেন অন্যের কাছে থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ছেলে দিন মজুরি করে তার ৫ সদস্যের পরিবার চালাতে হিমশিম খায়। আবার আমার দায়িত্বও পড়েছে তার উপরেই। আমি আগের মত মানুষের বাড়ি বাড়ি যেতেও পারি না। তাই অসুস্থ জীবনে টানাপোড়নের মধ্যেই জীবন পাড়ি দিতে হচ্ছে আমাকে।’
তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা অভাব-অনটন কোনটাই নিয়ে তার কোন অভিযোগ নেই। কারো কাছে কোন চাহিদা বা প্রত্যাশাও নেই। ইচ্ছা ও প্রত্যাশা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে এটাই বড় কথা। বর্তমান অবস্থায় বড় ইচ্ছা ও প্রত্যাশা কোনটিই আমার নেই। অসুস্থ জীবনে তিন বেলা তিন মুঠো ভাত ও ঔষধ খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেই বাকি জীবনটা হয়তো সুখেই কাটাতে পারতাম।’
ইতিহাসের উল্লেখিত জীবন্ত উপাদান হয়ে মর্জিনা আমাদের মাঝে বেঁচে আছে বোমফুটি নামে। তার এই অদ্ভুত নামের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিকথা। এ রকম হাজারো বোম ফুটির গল্প আমাদের মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষরণ সতেজ ও প্রবাহমান স্মৃতিফলক।
ইত্তেফাক/এমআর