যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে যে কাজ শুরু হয়েছে মৌলবাদকে নির্মূল করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে তা পূর্ণতা দেবার অঙ্গীকার জানিয়ে পালিত হলো শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাংলার বিজয়ের ঊষালগ্নে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দোসরদের সহায়তায় এ দেশের যে মেধাবী সন্তানদের হত্যা করেছিল, সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে দেশবাসী। গতকাল রাজধানীর অনুষ্ঠান মঞ্চগুলো বুদ্ধিজীবী দিবস স্মরণে নানা অনুষ্ঠানের মুখর হয়ে উঠেছিল। ছিল একাত্তরের স্মৃতিজাগানিয়া গান, নৃত্য, নাটক, আবৃত্তি।
শিল্পকলার আয়োজন: শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আলোচনা এবং গান ও কবিতায় সাজানো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। সন্ধ্যায় একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে স্মরণ করা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইব্রাহীম হোসেন খান। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে আলোচনা করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শহীদ জায়া ও শিক্ষাবিদ শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, শহীদ মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিফ মুনীর, শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেনের ছেলে শাহীন রেজা নূর। আলোচনা শেষে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের চার মঞ্চে বিজয় উত্সব: গতকাল ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চারটি মঞ্চে বিজয় উত্সবের অংশ হিসেবে শহীদ বৃদ্ধিজীবী দিবস স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। গানে, আলোচনায় আর স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ মঞ্চ: এ মঞ্চে গতকাল বিকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনা সভা শুরু হয়। জোট সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দীন হোসেন-এর ছেলে শাহীন রেজা নূর ও রাজনীতিক সুভাষ সিংহ রায়। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে: ছায়ানট, মরমী লোকগীতি শিল্পীগোষ্ঠী। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন: তিমির নন্দী, কমলিকা চক্রবর্তী, আরিফুর রহমান তিমুল, নাহিয়ান দূরদানা সূচি। দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে: চারুকণ্ঠ, কণ্ঠস্বর। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন: আনোয়ার পারভেজ, মাহমুদুল হাকিম, অনিকেত রাজেশ। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে: দিব্য সাংস্কৃতিক সংগঠন। পথনাটক পরিবেশন করে: গতি থিয়েটার, নাগরিক নাট্যাঙ্গন বাংলাদেশ।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মঞ্চ:এ মঞ্চে অনুষ্ঠান শুরু হয় বিকালে। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে: বহ্নিশিখা, ভিন্নধারা। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন: ফরিদা পারভীন, আকরামুল ইসলাম, আবদুল ওয়াদুদ, আবিদা রহমান সেতু, হাবিবুল আলম, আসিফ ইকবাল সৌরভ। দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে: কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, স্বরব্যঞ্জন, ত্রিলোক বাচিক পাঠশালা। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন: সৈয়দ শহিদুল ইসলাম নাজু, মাসুম আজিজুল বাশার, সুপ্রভা সেবতী। শিশু সংগঠন: মৈত্রী চিলড্রেন থিয়েটার ট্রুপস। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে: সাধনা, নটরাজ, বহ্নিশিখা। পথনাটক পরিবেশন করে: নাট্যযোদ্ধা, খেয়ালী।
রবীন্দ্র সরোবর নায়ক রাজ্জাক ও আবৃত্তিশিল্পী কাজী আরিফ মঞ্চ:দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে: নন্দন, গণছায়া। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন: বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, সরদার রহমত উল্লাহ, নার্গিস চৌধুরী, মাহজাবিন রহমান শাওলী, সুচিত্রা, মিতা। দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে: মুক্তধারা সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, সংবৃতা। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন: রেজীনা ওয়ালী লীনা, সামসুদ্দোহা। শিশু সংগঠন: তাল কালচারাল সেন্টার। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে: নান্দনিক নৃত্য সংগঠন, ভোরের পাখী নৃত্যকলা কেন্দ্র। পথনাটক পরিবেশন করে: থিয়েটার আর্ট ইউনিট।
দনিয়া শিল্পী আব্দুল জব্বার ও বারী সিদ্দিকী মঞ্চ: দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে: তিমীর বিনাশী, বিরহী শিল্পীগোষ্ঠী, লালন পড়শী একাডেমি, আরোহী শিল্পীগোষ্ঠী, সুরছন্দ সংগীত একাডেমি, বাউল ভাব দরীয়া। দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে: সঞ্জনন আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, জাহানারা ইমাম স্মৃতি পাঠাগার, জলার্ক। শিশু সংগঠন: দনিয়া সবুজ কুঁড়ি কচি-কাঁচার মেলা। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে: বীণা সংগীত নিকেতন।
মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল হক মামা মঞ্চ: এ মঞ্চে নাচ, গান, আবৃত্তি, পথনাটক পরিবেশিত হয়।
মিরপুর অপু আনাম চলচ্চিত্র মঞ্চ: মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র পরিবেশিত হয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ওয়েবসাইট উদ্বোধন, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যদের অনুভূতি প্রকাশ ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। চন্দ্রকলা থিয়েটারের প্রযোজনায় বিকাল ৩টায় জাদুঘরের মুক্তমঞ্চে ‘যদি কিছু মনে না করেন’ নামের পথনাটক পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পঞ্চম দিনের অনুষ্ঠানমালা। বিকালে প্রধান মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ওয়েবসাইট উদ্বোধন করে জাদুঘর। এসময় শহীদ পরিবারের পক্ষে অনুভূতি প্রকাশ করেন শহীদ মধু দে’র নাতনি বর্ণিল ও শহীদ এনায়েত হোসাইনের নাতনি মিত্রিতা। প্রতিদিন বিকাল তিনটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত চারটি মঞ্চে একযোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই উত্সবের অনুষ্ঠানমালা।
অন্যদিকে উত্সবের অংশ হিসেবে ও শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালনে মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে অনুষ্ঠান। বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠের তিনদিনের আয়োজনের উদ্বোধনীতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন।
ইত্তেফাক/নূহু