ভয়াবহ আগুন হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে থাকা ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতের পিতার আহাজারি এটি। সন্তানকে জাগিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা তার, ঘুমিয়ে পড়লেই যে তা হবে নুসরাতের শেষ ঘুম। ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে লাইফ সাপোর্টে থাকা মেয়েটি চাচার কাছে পানি খেতে চেয়েছিল একবার, কিন্তু পানি পান করার অবস্থাও তার ছিল না। ইতিমধ্যে নুসরাতের অপারেশন হয়েছে একটা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিত্সার দায়িত্ব নিয়েছেন। সিঙ্গাপুরের ডাক্তাররা চিকিত্সা মনিটর করেছেন। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকায় তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া যায়নি। কিন্তু সব চেষ্টা সব প্রার্থনাই বিফলে গেছে। দেশবাসীর আকুলতা আর ঢামেকের চিকিত্সকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও না ফেরার দেশে চলে গেছেন নুসরাত।
শারীরিক নিগ্রহের প্রতিবাদে মামলা করায় অনুসারী নুরউদ্দীনের পরিকল্পনায় পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নিয়ে আগুনে পোড়ানোর দুঃসাহস নুসরাতের মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদ্দৌলা পেয়েছেন, কারণ তিনি চেতন ও অবচেতনে স্থির বিশ্বাসী ছিলেন যে, গ্রেপ্তার হলেও এ ধরনের গুরুতর অপরাধ করেও চূড়ান্ত বিচারে তার কিছু হবে না। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করার প্রমাণ আমরা ইতোমধ্যে পেয়েছি। জানা গেছে, নুসরাতের মামলার প্রথম এজাহারে সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাদ্রাসা অধ্যক্ষের নাম বাদ দিয়েছিলেন।
একটা গণতান্ত্রিক ও ভোগবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় যখন রাজনীতির নামে দুর্বৃত্তপনা ও প্রতিশোধপরায়ণতা, প্রাতিষ্ঠানিক অসততা গ্রহণীয় হয়, নিরবচ্ছিন্ন জবাবদিহিতা ব্যাহত হয়, বিচারব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হয়, নীতিহীনতা অন্যায় বলে মনে হয় না তখন সমাজ ও ব্যক্তি পর্যায়সহ সব ক্ষেত্রেই অসততা, অসাধুতা, ধর্ষণ, ব্যভিচারের মতো যাবতীয় নেতিবাচক রিপু জায়েজ হয়ে ওঠে। ফলে প্রাত্যহিক জীবন আমাদের হয়ে উঠেছে বিপন্ন ও অনিশ্চিত। ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগকারীদের থানা থেকে আদালত পর্যন্ত মারাত্মক হয়রানি পোহাতে হয়, উপরিপাওনা হিসেবে লোকলজ্জা আর ছিঃ ছিঃ তো আছেই। তদুপরি, বাংলাদেশের নারী নির্যাতন মামলার বিচারের অবস্থার দিকে একবার চোখ বোলানো যাক।
একটি জাতীয় দৈনিকের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা জেলার পাঁচটি ট্রাইব্যুনালে আসা মারাত্মক ছয়টি অপরাধের মামলায় পুলিশ আসামিদের খুঁজে পাচ্ছে না অথবা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাচ্ছে না। পুলিশ আর সরকারি কৌঁসুলিরা (পিপি) সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করে মামলা জিততে পারছেন না। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণ শেষে হত্যা, যৌতুকের জন্য হত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা আর যৌন পীড়নের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও পারছেন না। ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আসা ৭ হাজার ৮৬৪টি মামলার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে দৈনিকটি। তখনো পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল ৪ হাজার ২৭৭টি মামলা আর মাত্র ১১০টি মামলায় সাজা হয়েছিল। অর্থাত্ বিচার হয়েছিল ৩ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে। বাকি ৯৭ শতাংশ মামলার আসামি হয় বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে, নয়তো পরে খালাস হয়ে গেছে। মামলাগুলোর তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশের অবহেলা, গাফিলতি ও অদক্ষতার পাশাপাশি আদালতে সাক্ষী আনা আর সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনেও পুলিশ ও পিপিদের অযত্ন-অবহেলা থাকে। ভুক্তভোগীরা হয়রানি আর ঘুষের বিনিময়ে মামলা ঘুরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। একটা প্রেক্ষাপটে নুসরাতের উপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।
নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় এ পর্যন্ত বেশ কজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন, আর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে এ মামলাটি। নুসরাতের স্বজনরা সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপর অনাস্থা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, মামলার এজাহারে ঘটনাস্থলের নাম ভুলভাবে এসেছে, হাত-পা বেঁধে আগুন লাগানোর প্রসঙ্গ আসেনি এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আসামির নাম আসেনি। এলাকাবাসীও জানিয়েছেন, থানা পুলিশ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বার্তা পাঠিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বা অন্য কর্মসূচি পালন না করতে বলেছেন। অবশ্য নুসরাতের পরিবারের দাবির মুখে এজাহার বদলানো হয়েছে। প্রত্যাহার করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট ওসিকে। মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পিবিআইকে।
চরম যাতনা ও ক্ষোভ নিয়ে নুসরাত চলে গেছে। তার বাবা-মা, ভাই অবর্ণনীয় মনোবেদনা ও শূন্যতা নিয়ে জেগে থাকবেন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়। আমরাও যেন ঘুমিয়ে না যাই, এই মামলাসহ অপরাপর নারী নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধীর দ্রুত ও কঠোর সাজা হোক, বিচার যেন দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে না যায়। সে পর্যন্ত সবাইকে চোখ খোলা রাখতেই হবে।
n লেখক: একটি অনলাইন পত্রিকার সাবেক বার্তা সম্পাদক