মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা


গতকাল সারাদেশে ছিল বিজয়োত্সব, বিজয়ানন্দ। লাল-সবুজের বিজয় নিশান আর ফুল হাতে, অহংকার আর অর্জনের বিজয়ের উল্লাসে মেতে ছিল পুরো বাংলাদেশ। মুখে ছিল বিজয়ের গান আর যুদ্ধাপরাধী-রাজাকারমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও সমৃদ্ধ জনপদ গড়ার শপথ। এ বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য স্বীকৃতি পাওয়ায় শনিবার বিজয়ের সাতচল্লিশ বছরে পদার্পণের দিনে দেশবাসী যেন দ্বিতীয় যুদ্ধ জয়ের আনন্দে মেতে ওঠে। লাখো মানুষের স্রোত গিয়ে মিশেছিল সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে যারা বাংলাদেশের জন্য পতাকা এনেছিল সেই বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তারা। ফুলে ফুলে ছেয়ে গিয়েছিল বাঙালির অহংকার জাতীয় স্মৃতিসৌধ।

গতকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে বিজয় দিবসের কর্মসূচি সূচিত হয়। ৬টা ৩৪ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সশস্ত্র সালাম জানায়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা হুইল চেয়ারে বসে শহীদ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনকালে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, বিচারপতিবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, নির্বাচন কমিশনার, কূটনীতিক ছাড়াও বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এ সময় দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মধ্যে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল ছিল সরকারি ছুটির দিন। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রধান সড়কগুলো জাতীয় ও বর্ণিল পতাকায় শোভিত করা হয়। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বেতার ও টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী কুজকাওয়াজ, বিজয় ব্যালি, মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বেলা ১০টা ৫৫ মিনিটে জাতীয়ে স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এসময় তিনি শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. মঈন খান, খন্দকার মোশারফ হোসেন প্রমুখ এসময় উপস্থিত ছিলেন। এরপর জাতীয় পার্টি (এরশাদ), গণফোরাম, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ (ইনু), জাসদ (রব), এলডিপি, এনডিপি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা: ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে সকাল ৮টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। তিনি দেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান হিসেবে দলের সিনিয়র নেতা-কর্মীদের নিয়ে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এসময় সর্বস্তরের মানুষের ভিড়ে গোটা এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ৪৭তম বিজয় দিবস উপলক্ষে ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকেট ও উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেছেন। এছাড়া পাঁচ টাকা মূল্যমানের একটি ডাটা কার্ড এবং ডাক বিভাগের ইস্যুকৃত একটি স্মারকগ্রন্থও অবমুক্ত করেন। সকালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এক অনুষ্ঠানে এগুলো অবমুক্ত করা হয়। এছাড়া সন্ধ্যা ৭টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের শুভেচ্ছা জানাতে প্রধানমন্ত্রী এবারও নগরীর মোহাম্মদপুরের গজনবী রোডে অবস্থিত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে ফুল, ফল এবং মিষ্টি পাঠিয়েছেন।

বঙ্গভবনে সংবর্ধনা: বিকালে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গভবনে এক সংবর্ধনার আয়োজন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশ নেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিজয় দিবসের কেক কাটেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যরা এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের ৪৬ বছর পূর্তিতে সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর দৃষ্টিনন্দন কুচকাওয়াজে সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উপস্থিত ছিলেন।

জেপির শ্রদ্ধা:যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান বিজয় দিবস উদযাপন করেছে জাতীয় পার্টি (জেপি)। দিবসটি পালনে গতকাল সকাল সাড়ে ৬টায় দলের সকল কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল ৭টায় কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন জেপি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক এম. সালাহ উদ্দিন আহমেদসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী।

দিবসটি উপলক্ষে সকালে রাজধানীর হাতিরঝিলে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় সাইকেল র?্যালি। শিখা চিরন্তনে তরুণ প্রজন্মের হাতে পতাকা হস্তান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম। বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে হয়েছে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এদিকে গতকাল সকাল থেকেই ঢাকার রাজপথে চলে লাল-সবুজের মেলা। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রঙে সেজেছিল বাঙালি নারী থেকে শুরু করে ছোট্ট শিশুটিও। কেউ হাতে পতাকা নিয়ে কেউবা গালে কিংবা কপালে পতাকা এঁকেছেন। কেউ সবুজ শাড়ি, কেউ সবুজ কামিজ কিংবা সবুজ পাঞ্জাবি পরে বেড়িয়ে পড়েন প্রিয়জনদের সঙ্গে। রিক্সা, সাইকেল, মোটরসাইকেল, বাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে সবাই মেতে উঠেন উত্সবের রঙে।

ইত্তেফাক/নূহু