‘মেয়ের খাটিয়ার ভার সইবো কী করে! বাবা হয়ে মেয়ের লাশ ঘাড়ে করে নিয়ে রেখে আসতে হবে। ওকে কবরে রেখে বাড়িতে ফিরব কীভাবে! ও যে আমার একমাত্র মেয়ে, আমার মা। মানুষ এত নির্দয় হতে পারে? নিষ্ঠুরভাবে আমার মেয়ের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। একটুও হাত কাঁপেনি। ওদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের ভেতরে মেয়ের মৃতদেহ যখন কাটাছেঁড়া চলছে, তখন বারান্দায় অপেক্ষায় শোকার্ত বাবা মাওলানা এ কে এম মুসা এভাবেই বলছিলেন একমাত্র মেয়ে হারানোর বেদনার কথা। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে নুসরাতের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর বাড়ি ফেনীর সোনাগাজীতে। বাদ আছর সোনাগাজী সাবের পাইলট হাইস্কুল মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। সবার চোখে ছিল অশ্রু, কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ। এসময় হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন সর্বস্তরের মানুষ। নুসরাতের জানাজা পড়ান তাঁর বাবা। জানাজার আগে সবার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, হামলাকারীদের কঠোর শাস্তি চাই। আমার মেয়ে যাতে জান্নাতবাসী হয়, আপনারা সেই দোয়া করবেন। জানাজার পর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় পাশেই চারছান্দিয়া গ্রামে। যেখানে জন্ম নিয়েছিলেন নুসরাত। দাদীর কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা তাকে।
এর আগে বেলা সোয়া ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নুসরাতের মৃতদেহ ময়নাতদন্ত করা হয়। এ সময় মর্গের বারান্দায় অপেক্ষায় ছিলেন তাঁর বাবা এ কে এম মুসা। একমাত্র মেয়ের অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। বিলাপ করতে করতে মাঝেমধ্যেই বাকহীন হয়ে পড়ছিলেন।
গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় পরীক্ষা দিতে গেলে বোরকা পরা চারজন নুসরাতের হাত-পা বেঁধে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ২৭ মার্চ মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার হাতে যৌন হয়রানির শিকার হন নুসরাত। এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। আসামিপক্ষ নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে মামলা তুলে নিতে। নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এর জের ধরেই তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। উন্নত চিকিত্সার জন্য ওইদিনই তাকে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও চিকিত্সকরা বাঁচাতে পারেননি তাকে। বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় মৃত্যুর কাছে হেরে যান তিনি।
সুরতহালের পর ময়নাতদন্ত : গতকাল সকাল ৮টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গ থেকে মৃতদেহ নেওয়া হয় কলেজ মর্গে। সেখানে পৌনে ১০টার দিকে শাহবাগ থানার এসআই শামছুর রহমান মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক মর্গে যান মৃতদেহ দেখতে। এ সময় তিনি বলেন, ‘মানুষ বিচার পাচ্ছে না। নারীর প্রতি, শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন যেভাবে বাড়ছে, সেটা একটি খারাপ বার্তা দিচ্ছে। বিচার না হওয়ার অপরাধ বাড়ছে।’
এদিকে মৃতদেহ ময়ানতদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করেন বোর্ডের সদস্য ডা. প্রদীপ বিশ্বাস। ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘শরীরের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে যাওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে। মৃতদেহ থেকে ডিএনএ এবং মাইক্রোবায়োলজি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেতে কয়েকদিন সময় লাগবে। কারণ কয়েকটি পরীক্ষা করতে হবে। ’
‘মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া’ : অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার হাতে যৌন হয়রানির পর সহপাঠি বান্ধবীদের উদ্দেশে নুসরাতের লেখা আবেগঘন একটি চিঠি গত মঙ্গলবার দুপুরে তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। চিঠিতে দিন-তারিখ লেখা না থাকলেও বিষয়বস্তু বিবেচনায় এটি কয়েকদিন আগে লেখা বলে মনে করছেন তদন্তকারী কমকর্তা। তার পড়ার টেবিলে খাতায় দুই পাতার ওই চিঠিতে তামান্না ও সাথী নামের দুই বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে। ওই চিঠিতে গত ২৭ মার্চ ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনাও দিয়েছেন নুসরাত। চিঠিতে আত্মহত্যা করবেন না বলেও উল্লেখ করে তিনি। তবে যৌন হয়রানির ঘটনার পর অধ্যক্ষ গ্রেফতার হলে তার মুক্তির দাবিতে বান্ধবীদের অংশগ্রহণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নুসরাত। তাকে নিয়ে বান্ধবীদের বিভিন্ন কটুক্তিতেও সে মর্মাহত- এমন কথাও উল্লেখ করা হয় ওই চিঠিতে।
চিঠিতে নুসরাত লিখেন: ‘তামান্না, সাথী। তোরা আমার বোনের মতো এবং বোনই। ওই দিন তামান্না আমায় বলেছিল, আমি নাকি নাটক করতেছি। তোর সামনেই বললো। ... আর তুই নাকি নিশাতকে বলেছিস আমরা খারাপ মেয়ে। বোন প্রেম করলে কি সে খারাপ? তোরা সিরাজ উদ দৌলা সম্পর্কে সব জানার পরও কীভাবে তার মুক্তি চাইতেছিস। তোরা জানিস না, ওইদিন রুমে কি হইছে? .....উনি আমায় বলতেছে- নুসরাত ডং করিসনা। তুই প্রেম করিস না। ছেলেদের সাথে প্রেম করতে ভালো লাগে। ওরা তোরে কি দিতে পারবে? আমি তোকে পরীক্ষার সময় প্রশ্ন দেবো। আমি শুধু আমার শরীর দিতাম ওরে। বোন এই জবাবে উত্তর দিলাম। আমি একটা ছেলে না হাজারটা ছেলে...। আমি লড়বো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে। সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নিবে। কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো, ইনশাআল্লাহ।’
দাদীর কবরের পাশে দাফন : ঢাকা থেকে নুসরাতকে বহন করা লাশের গাড়ি বিকাল সোয়া ৫টার দিকে সোনাগাজীতে পৌঁছে। সেখানে উপস্থিত মানুষের কান্নায় এক হূদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সন্ধ্যায় উত্তর চারছান্দিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাদীর কবরের পাশে নুসরাতকে দাফন করা হয়। এর আগে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় শুধু সোনাগাজী নয়, আশপাশের জেলার মানুষও উপস্থিত ছিলেন। সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন, পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রহমান বিকম, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, জাতীয় পার্টির জেলা সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম খন্দকারসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ এতে অংশ নেন।