সংবাদপত্রের স্বাধীনতা

 
দেশের এমন এক ক্রান্তিলগ্নে আপনারা আমাকে আহ্বান জানিয়েছেন দু’কথা বলার জন্যে, যে ক্রান্তিলগ্নে পৌঁছে দিগ্বলয়ে তিমিরাবসানের প্রতীক্ষায় আমরা সকলেই অধীর এবং উদ্বিগ্ন। জানি না, ‘তিমির বিদায় উদার অভ্যুদয়’ আমরা দেখে যেতে পারব কি না। কিন্তু আমি নিজে সূর্য-সম্ভাবনায় বিশ্বাসী। আপনাদেরও এ বিশ্বাসে বলীয়ান হয়েই সাংবাদিকতার মহান ব্রতে অটল থাকার জন্য অনুরোধ জানাই। এটা আমার প্রৌঢ়ত্বের অভিমান নয়, বলা যেতে পারে অভিজ্ঞান, যে অভিজ্ঞানের দাবিতে আজ নিঃসংকোচে একথা আপনাদের জানাতে পারি, এ পেশায় স্বাচ্ছন্দ্য নেই সত্য, সন্তোষ আছে; স্বস্তি নেই, তৃপ্তি আছে। প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও একথা ভাবতে আনন্দ আছে যে, আমাদের এ দুঃখবরণ আমাদেরই দেশবাসীর ভালোবাসা আর অগাধ স্নেহে সিক্ত। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’, জনসাধারণকে সেই স্বার্থে জাগ্রত করবার প্রার্থনা ছিল এদেশের কবির। স্বাধীন সংবাদপত্রের লক্ষ্য তাই। মনীষীরা তাই বলেছেন, স্বাধীন সংবাদপত্র ছাড়া স্বাধীন জনসমাজ তৈরি হতে পারে না। শৃঙ্খলিত সংবাদপত্র শৃঙ্খলিত জনসমাজেরই প্রতীক। শৃঙ্খলিত জনসমাজের আত্মবিকাশ যেমন অসম্ভব, তেমনিভাবে স্বাধীন ও মর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি-মানসের স্ফুরণও অকল্পনীয়। এক কথায় স্বাধীন সংবাদপত্রের অস্তিত্ব ছাড়া একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন জাতির অস্তিত্ব কল্পনা করা কষ্টকর। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে তাই প্রতিটি উন্নত ও স্বাধীন দেশেই অলঙ্ঘনীয় বিধান বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশের পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনেও সংবাদপত্রের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আফ্রো-এশিয়ার দেশে দেশে জনসাধারণের পাশাপাশি সংবাদপত্রের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ফলে পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন হয়েছে বটে; কিন্তু বহু দেশেই আজ সেই শৃঙ্খল আবার সংবাদপত্রের হাতেই এঁটে দেওয়া হয়েছে। কারণ নতুন দেশীয় শাসকরা জানেন, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধই হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশে জনমতের যথার্থ কণ্ঠরোধ। তাই রাষ্ট্রীয়করণ, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণাদেশ আরোপ প্রভৃতি নানাভাবে নানা নামে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আজ খর্ব ও খণ্ডিত হচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর এই শেষ অর্ধশতকের নব্য, স্বাধীন ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সবচাইতে বড় ট্র্যাজেডিই সম্ভবত সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অপমৃত্যু অথবা মুমূর্ষু অবস্থা। এমন অবস্থাকে বেশিদিন চলতে দেওয়া মানে একটি স্বাধীন জনসমাজের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কাকে ত্বরান্বিত করা। তাই শুধু সংবাদপত্রসেবী হিসাবে নয়, সংবাদপত্রের পাঠক বিপুলায়তন জনসমাজের প্রতিনিধি হিসাবেও এ ভয়াবহ আশঙ্কাকে প্রতিরোধের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশেরই সচেতন নাগরিকদের সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।
 
 
বন্ধুগণ,
 
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সঙ্গে যদি জনজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং শুভাশুভের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না থাকত, তাহলে বিষয়টিকে শুধুমাত্র সংবাদপত্রের কল্যাণের গণ্ডিতে আবদ্ধ রেখে এতটা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রয়োজন আদৌ থাকত না। কিন্তু স্বাধীন সংবাদপত্র বলতেই আমরা বুঝি, স্বাধীন জনমত। তাই জনমতের কণ্ঠরোধে গোটা সামাজিক স্বাধীনতার তাত্পর্যই আমাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে ওঠে। লর্ড ফ্রান্সিস উইলিয়ামসের ভাষায় : 'The press is a weapon of freedom, a sword in the hands of those fighting old and new tyrannies—the one indispensable weapon in the armoury of freedom'. সংবাদপত্র সম্পর্কে এ উক্তি অত্যুক্তি নয়। বিভিন্ন দেশের জনসমাজের স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস যাঁরা অবগত আছেন, তাঁরা জানেন, সকল দেশেই এই স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে অগ্রপথিক সেনানীর ভূমিকা গ্রহণ করেছে সংবাদপত্র। স্বাধীন জনসমাজ আর স্বাধীন সংবাদপত্র কথা দুটি তাই একটি অন্যটির পরিপূরক। তাই আমরা যখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের কথা বলি, তখন ব্যাপক অর্থে জনসমাজে স্বাধীনতা বা গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সংগ্রামের কথাই বলি। এই অধিকার ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অর্থহীন।
IMG0
সংবাদ ও স্বাধীনতা—এই কথা দুটির ভেতরে আক্ষরিক মিল ছাড়াও একটি ঐতিহাসিক দ্যোতনা রয়েছে। মধ্যযুগে সংবাদপত্রের অস্তিত্ব ছিল না এবং প্রয়োজনও ছিল না। ব্যক্তিতন্ত্রের তখনও অভ্যুদয় হয়নি। ইতিহাস বলতে রাজ-রাজড়ার কাহিনী, খবর বলতে ছিল রাজা-বাদশার খবর। জনসাধারণ বাধ্যগত প্রজাপুঞ্জ মাত্র। শিল্প-বিপ্লব কৃষিভিত্তিক সামন্ত যুগে ফাটল ধরাল। এল প্রজাতন্ত্রের যুগ, ব্যক্তিতন্ত্রের যুগ। রাজার বদলে সাধারণ মানুষের সার্বভৌমত্ব ঘোষিত হল সমাজে। এই সাধারণ মানুষেরই খবর, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি কণ্ঠে ধারণ করে প্রকাশিত হল সংবাদপত্র। সামন্ততন্ত্র তার পতনের মুহূর্তেও জন-যুগের এই অভ্যুত্থানকে হিংস্র জিঘাংসায় দমন করতে চেয়েছে; কিন্তু পারেনি। সংবাদপত্রসেবীরা সব নির্যাতন সহ্য করেছেন, কিন্তু মাথা নত করেননি। সংবাদপত্র অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সম্পাদককে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, কিন্তু সংবাদপত্রের কণ্ঠ তাতে স্তব্ধ হয়নি। এমনি এক গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ঐতিহ্যের অধিকারী বলেই ব্রিটেনের জন-সমাজের নাগরিক স্বাধীনতা আজ এতটা সুরক্ষিত, সেখানে স্বাধীন সংবাদপত্রের ভূমিকা এতটা গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রেও প্রাথমিক স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু একটি সাপ্তাহিক কাগজের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা নিয়ে। রাশিয়ার কম্যুনিস্ট বিপ্লবে ‘ইস্ক্রার’ (স্ফুলিঙ্গ) ভূমিকা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। পাক-ভারত উপমহাদেশেও স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতিগঠনমূলক কাজে জাতীয় সংবাদপত্রের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই ভূমিকা আজ কোনো কারণে খণ্ডিত বা খর্বিত হলে জাতীয় চেতনারই একটা বড় অংশ তাতে অন্ধকার হবে।
 
বন্ধুগণ,
 
আমি আগেই বলেছি, সংবাদ এবং স্বাধীনতা এই কথা দু’টোর ভেতরে একটি ঐতিহাসিক দ্যোতনা রয়েছে। সংবাদপত্র আদপেই যখন জনসাধারণের খবরাখবর, সুখ-দুঃখ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার কাহিনী প্রকাশের মাধ্যম তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করার একমাত্র ব্যাখ্যা দাঁড়ায় জনসাধারণকেই নিয়ন্ত্রণ করা। মধ্যযুগে সংবাদপত্র ছিল না, সংবাদপত্র গণতান্ত্রিক যুগেরই ফসল। গণতন্ত্রের একটা বড় অবলম্বনও তাই সংবাদপত্র। তাই কোনো দেশের সরকার যখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করেন, তখন প্রকৃত অর্থে তাঁরা জনসাধারণেরই গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা চালান। উন্নত ও সচেতন জন-সমাজে এই হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত। কারণ, জনসাধারণই সেখানে তাদের বহুযুগের সংগ্রামলব্ধ অধিকারের অতন্দ্র প্রহরী। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশে বা সদ্য স্বাধীন দেশে জনসাধারণের সচেতনতার অভাব বা নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে চতুর শাসক অনেক সময় সংবাদপত্রের অধিকার হরণের নামে আসলে জনসাধারণের অধিকারই হরণ করে বসেন। অবশ্য স্বাধীনতা বা অধিকার বলতে এখানে আমি স্বেচ্ছাচারকে বোঝাচ্ছি না। স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শাসক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে প্রায়শই অভিযোগ শোনা যায় সংবাদপত্র তার স্বাধীনতার অপব্যবহারে আগ্রহী। এ অভিযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অযৌক্তিক বলে আমি মনে করি। দায়িত্বশীল সংবাদপত্র তৈরির একমাত্র পথ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। অবাঞ্ছিত বিধিনিষেধের বেড়াজালের মধ্যেই অধিকার অপপ্রয়োগের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অপব্যবহার রোধের আরেকটি বড় উপায় দায়িত্বশীল জনমত তৈরি। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ দ্বারা এই দায়িত্বশীল জনমত তৈরি সম্ভব নয় বলেই আমার ধারণা।
 
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আমি উন্নত এবং স্বল্পোন্নত দেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সমস্যার পার্থক্যের প্রতিও আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। মূলত, উন্নত এবং স্বল্পোন্নত দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সমস্যা এক নয়। এ সম্পর্কে আমি আমার নিজের মতামত প্রকাশের আগে বিলাতের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সম্পাদকের একটি অভিমত এখানে উল্লেখ করব। ‘গার্ডিয়ান’ সম্পাদক বলেছিলেন, বিলাতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে সরকার কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানা কোনো বড় প্রতিবন্ধক নয়। কারণ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কাগজগুলো এখন বড় বড় ট্রাস্টে পরিণত হচ্ছে। আর গণতান্ত্রিক সরকারও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করার পক্ষপাতী নন। কিন্তু বিভিন্ন একচেটিয়া বড় ব্যবসায়ী—যাঁরা বিজ্ঞাপন দিয়ে খবরের কাগজ বাঁচিয়ে রাখেন, তাঁরা সময় সময় নানাভাবে সংবাদপত্রকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করেন। অর্থাত্ উন্নত দেশগুলোতে বিজ্ঞাপনদাতা বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোই হচ্ছে এখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পথে কণ্টকস্বরূপ। কিন্তু স্বল্পোন্নত ও সদ্য স্বাধীন দেশগুলোতে অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
 
ব্যক্তিগত মালিকানা বা বেসরকারি বিজ্ঞাপনাদাতা শ্রেণী এখনও স্বল্পোন্নত দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পথে বিপজ্জনক হয়ে ওঠেনি। কারণ, এখন পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সর্বময় প্রতিভূ সরকার। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্যও তাই এ সকল দেশে ত্রিবিধ ক্ষমতার খড়্গ সর্বদা উত্তোলিত থাকে। সংবাদপত্রকে কোনো কোনো স্বল্পোন্নত দেশে তিনভাবেই নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথমত, সরাসরি সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, এটাকে প্রত্যক্ষ ব্যবস্থা বলা যেতে পারে। বাকি দুটো পরোক্ষ অথচ অধিকতর কার্যকরী ব্যবস্থা। প্রথমত, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণাদেশ আরোপ এবং দ্বিতীয়ত, সরকারি বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ দ্বারা সংবাদপত্রের আর্থিক ক্ষমতায় আঘাত হানা। এভাবে সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রণ দ্বারা প্রশাসনযন্ত্র আসলে জনমতেরই কণ্ঠরোধ করে। এতে স্বাধীন জন-সমাজের বিকাশ ব্যাহত হয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয়ের হাতে সীমাবদ্ধ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গোটাকতক ব্যক্তি বা পরিবারের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। এ ধরনের নিয়ন্ত্রিত বা বশীভূত জনসমাজে বুদ্ধি ও কৃষ্টির চর্চাও বিশেষ কায়েমী স্বার্থের পরিপোষক হয়ে ওঠে। ফলে, জাতীয় প্রগতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি হয়, তার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অনুভূত না হলেও যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার অনিষ্টকর ক্রিয়ার জের চলতে থাকে। (অংশবিশেষ)
 
 
* ১৯৬৬ সালের মে মাসে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে প্রদত্ত জনাব তফাজ্জল হোসেনের ভাষণ
 
ইত্তেফাক/আনিসুর