জহির রায়হান

বৃক্ষপ্রেমিক পাখিপ্রেমিক মানবপ্রেমিক

 
নিজের সামান্য আয়-রোজগার থেকে বাঁচিয়ে দরিদ্র ঘরের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য সাহায্য করেন জহির রায়হান। তাঁর আর্থিক সহযোগিতায় ৭ জন মেয়ে ও ৩ জন ছেলে পড়াশোনা করছে। তিনি তাদের বই, খাতা,  বেতন, পরীক্ষার ফি ইত্যাদির খরচ জোগান। এ রকমই একজন শিক্ষার্থী ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কনেসপুর গ্রামের জেসমিন আরা। জেসমিন জানায়, ৮ম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল বাবা-মা। জানতে পেরে তাদের বাড়িতে যান জহির রায়হান। মা-বাবাকে বুঝিয়ে এ বাল্যবিয়ে বন্ধ করেন
 
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার রামনগর গ্রামের দরিদ্র মানুষ জহির রায়হান। দরিদ্র হলেও মানুষের জন্য বড় কাজ করে চলেছেন তিনি। যদিও তাঁর কাজের পরিসর এখনো ক্ষুদ্র। তাঁর কাজ ইতিমধ্যে মানুষের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে।
 
ঝিনাইদহ শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে জহির রায়হানের গ্রাম। ছোটবেলায় গ্রামের নৈশস্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। এরপর প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। দ্বিতীয় শ্রেণির গণ্ডি পেরোতে পারেননি। দারিদ্র্যের কারণে শিশু বয়সেই জীবনধারণের জন্য কাজে নামতে হয় তাঁকে। শুরু হয় মাঠে গরু-ছাগল চড়ানো। এরপর অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। ১৯৮৭ সালের দিকে ১৫-১৬ বছর বয়সে রংমিস্ত্রীর কাজে যুক্ত হন। বর্তমানে রংমিস্ত্রীর কাজ তাঁর মূল পেশা। ১৯৯০ সালের দিকে তিনি মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেয়াল লিখন শুরু করেন। গাছ লাগানোর ব্যাপারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে দেয়ালে দেয়ালে লিখতে থাকেন। আবার কখনো হাদিস কোরানের বাণী লেখেন। এসব লেখা মানুষের নজরে আসতো। বিষয়টি কেউ কেউ ভালোভাবে নিলেও অনেকেই তাঁকে উপহাস করত। এমতাবস্থায় একসময় তিনি দেয়াল লেখা বন্ধ করেন। ২০০২ সালে ফের নতুন উদ্যমে দেয়াল লিখনের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানো শুরু করেন। নগরবাথান বাজার থেকে তাঁদের গ্রাম পর্যন্ত যে পাকা রাস্তা চলে গেছে, তার পাশে গাছ লাগান। এর মধ্যে ছিল—আম, জাম, কাঁঠাল, মেহগনি, বকুল, তাল, খেজুর এবং বিভিন্ন ঔষধি গাছ। নিজের টাকায় নার্সারি থেকে গাছ কিনে রাস্তার পাশে রোপণ করতেন। গাছ বড় হতে থাকলে তাঁর আগ্রহ বেড়ে যায়। একসময় তাঁর মাথায় আসে পথচারিদের বিশ্রামের জন্য কিছু একটা করা দরকার। পথচারিদের বসার জন্য তাঁর লাগানো বকুল গাছের গোড়ার চারদিক পাকা করে দেন। তাদের পানি পিপাসা মেটানোর জন্য পাশে নলকূপ স্থাপন করেন। এ পর্যন্ত তিনি ৩টি স্থানে পথশ্রান্ত পথিকদের জন্য বিশ্রামের জায়গা করে দিয়েছেন। এরপর জহির রায়হান গ্রামের রাস্তা ছেড়ে ঝিনাইদহ শহরের বিভিন্ন স্থানে গাছ লাগানো শুরু করেন। অফিস-আদালত প্রাঙ্গণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গাছ লাগান তিনি। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি এবং বাউল তীর্থ ছেউড়িয়াতেও গাছ লাগিয়েছেন। গাছের চারা তৈরির জন্য নিজ বাড়ির পাশে এক খণ্ড জমি লিজ নিয়ে নার্সারি স্থাপন করেছেন। নিজের নার্সারি থেকে চারাগাছ বিভিন্ন প্রতিবন্ধীদের বাড়িতে লাগিয়ে দিয়েছেন। তাঁর হিসাবমতে এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির হাজার দশেক গাছ লাগিয়েছেন। মানুষের মাঝে পরিচিতি পেয়েছেন ‘গাছ ভাই জহির’ নামে। বর্তমানে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে উত্সাহ ও প্রশংসা পাচ্ছেন। এতে তাঁর আনন্দ ও উত্সাহ বেড়ে গেছে।
 
নিজে লেখাপড়া না জানলেও মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে তিনি সচেষ্ট। আর এ লক্ষ্যে বছর পাঁচেক আগে নিজের বাড়িতে ক্ষুদ্রপরিসরে একটি লাইব্রেরি গড়ার কাজে লেগে যান। অন্যের কাছ থেকে কয়েকটি বই সাহায্য হিসেবে পান। তা দিয়ে শুরু হয় লাইব্রেরি। নিজেও কিছু বই কেনেন। কিন্তু বাড়িতে বইয়ের পাঠক যেত না। তিনি ভিন্ন একটা বুদ্ধি আঁটলেন। বাইসাইকেলে তৈরি করলেন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি। কাজের ফাঁকে সময় পেলে গ্রামের রাস্তায় বই নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বইয়ের পাঠকও পান। তাঁর কাছ থেকে বই নেন অনেকে। পড়া শেষে বই ফেরত দেন তাঁরা। এভাবে চলছে জহির রায়হানের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি। বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে প্রায় পাঁচ শত বই আছে। জেলা প্রশাসক লাইব্রেরি গড়ার জন্য ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নগরবাথান বাজারে এক খণ্ড জমি বরাদ্দ দিয়েছেন। এ জমিতে ইটের গাঁথুনী দিয়ে টিনের ঘর তোলা হচ্ছে ‘এসো দেশ গড়ি জহির রায়হান গ্রন্থগার’-এর জন্য।
 
নিজের সামান্য আয়-রোজগার থেকে বাঁচিয়ে দরিদ্র ঘরের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য সাহায্য করেন জহির রায়হান। তাঁর আর্থিক সহযোগিতায় ৭ জন মেয়ে ও ৩ জন ছেলে পড়াশোনা করছে। তিনি তাদের বই, খাতা,  বেতন, পরীক্ষার ফি ইত্যাদির খরচ জোগান। এ রকমই একজন শিক্ষার্থী ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কনেসপুর গ্রামের জেসমিন আরা। জেসমিন জানায়, ৮ম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল বাবা-মা। জানতে পেরে তাদের বাড়িতে যান জহির রায়হান। মা-বাবাকে বুঝিয়ে এ বাল্যবিয়ে বন্ধ করেন।  জেসমিন এখন ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগ, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। পড়াশোনায় জহির রায়হান সাহায্য করছেন বলে জানায় সে।
 
একদিন তাঁর মাথায় চাপল পাখিদের কীভাবে নিরাপদ আবাস গড়ে দেওয়া যায়। সে চিন্তা থেকে কাজ শুরু করেন। বুদ্ধি আঁটলেন গাছে গাছে মাটির কলস বেঁধে দিলে কেমন হয়? পাখিরা ওই কলসের ভেতর বাসা বাঁধবে। বাচ্চা তুলবে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি কলস গাছে বেঁধে দেন। দেখলেন, পাখিরা ওই কলসের ভেতর বাসা বাঁধছে। তিনি জানান, আগে বড় বড় গাছ ছিল। গাছের খোঁড়লে পাখি বাসা বাঁধতো।  এখন বড় বড় পুরনো গাছ নেই। কলস পেয়ে পাখিরা তার ভেতর বাসা তৈরি করছে। প্রথমে তাঁর নিজ এলাকায় গাছে গাছে কলস বেঁধে দিতেন। এরপর জেলা প্রশাসকের অফিসের আঙিনার গাছে কয়েকটি কলস বেঁধে দেন।  জেলা প্রশাসক কলস কিনে দেন। জহির রায়হার সার্কিট হাউজ এলাকায় অনেকগুলো কলস বেঁধে পাখিদের জন্য নিরাপদ আবাস গড়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়—এ পর্যন্ত হাজার দুয়েক কলস গাছে গাছে বেঁধে পাখির আবাস গড়ে দিয়েছেন। লোকে যাতে পাখিদের নিরাপদ রাখে তার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। কেউ যেন পাখিদের উত্পাত না করে তার অনুরোধ করেন। তাঁর কথায়—এতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।
 
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির প্রভাব নিয়েও তিনি মানুষকে সচেতন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি তো লেখাপড়া জানি না। তবু সময় সুযোগ পেলে স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের জলবায়ু পরির্তনের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করি। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাদের পরামর্শ দিই।
 
গ্রামের মানুষের বিনোদনের জন্য খেলাধুলার আয়োজন করে থাকেন জহির। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সেখানে আমন্ত্রণ করে আনেন। আবার দরিদ্র শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণও করেন তিনি। যদিও এসব কম্বল সংখ্যায় বেশি নয় এবং দামেও সস্তা, কিন্তু শীত তো নিবারণ হয়। গ্রামের একটি প্রতিবন্ধী পরিবারকে তিনি দুটি ছাগল দিয়েছেন। এ ছাগল প্রতিপালনের মাধ্যমে পরিবারটিতে সচ্ছলতা এসেছে।
 
 এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে জহির রায়হানের চার জনের পরিবার। তিনি নিজে রংমিস্ত্রীর কাজ করেন। তাঁর স্ত্রী বাড়িতে দর্জির কাজ করেন। মাসে দুজন মিলে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। তাঁদের সংসারের মাসিক খরচ দশ হাজার টাকার মতো। বেঁচে যাওয়া বাকি পাঁচ হাজার টাকায় তিনি এসব কাজ করেন।          
 
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. জাকির হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, কয়েক মাস আগে জহির রায়হান তাঁর সাথে দেখা করে বলেন, ‘তিনি পাঁচ শত গাছের চারা লাগাবেন বিভিন্ন স্থানে। তাঁর কথা শুনে খুব ভালো  লাগল। জানলাম, তিনি নিজ উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে বেড়ান।’ তাঁর এ মহত্ কাজে সহযোগিতার জন্য জেলা প্রশাসক দেড় হাজার গাছের চারা সংগ্রহ করে দেন। আরো একটি এনজিও কিছু চারা দিয়ে সহায়তা করে। চারাগুলো যত্ন করে লাগান জহির রায়হান। শুধু গাছ লাগানো নয়, পাশাপাশি আরো কিছু সমাজ-সেবামূলক কাজ করেন তিনি। একজন সাদা মনের প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ তিনি। আমাদের দেশকে সবুজে ভরিয়ে দিতে তাঁর মতো প্রকৃতিপ্রেমী সাদা মনের মানুষ খুব প্রয়োজন।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর