১৯৯১ সাল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বহির্বিভাগের তিন তলায় ক্লাস শেষে গল্প করছিলাম আমরা কয়েক বন্ধু। এমন সময় একটা ছোট্ট ছেলে এসে কাছে ভিড়ল, ‘স্যার, দশটা ট্যাহা দিবেন?’ কোনো উত্তর না পেয়ে আরেক বন্ধুকে অনুরোধ, ‘দ্যাননা স্যার দশটা ট্যাহা’। ‘কী করবি টাকা দিয়া?’ বন্ধুর প্রশ্ন। ‘রক্ত কিনুম, মায়ের লাইগ্যা।’ কৌতুহলবশতঃ ছেলেটিকে একদিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোর মা কোথায়?’ বলল, ‘২২ নং ওয়ার্ডে।’ সন্দেহ দূর না হওয়ায় বললাম, ‘চল তোর মাকে দেখতে যাব।’ ‘সন্ধানী’র একজন কর্মী হিসেবে প্রয়োজন বোধ করলাম ঘটনাটা জানার। ২২ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখলাম, সত্যিই এক জীর্ণ-শীর্ণকায় মহিলা শুয়ে আছে বিছানায়। ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘মহিলার পেটে আলসার, অপারেশন করা লাগবে। ও পজিটিভ রক্ত লাগবে দুই ব্যাগ।’ ডাক্তার সাহেবকে বলে আসলাম, ‘এই রোগীর রক্ত সন্ধানী অফিস থেকে দেয়া হবে।’ রোগী ও ছেলেটাকে বলে আসলাম, ‘চিন্তার কিছু নেই, রক্ত আমি জোগাড় করে দিব।’ রোগীর অপারেশন হলো, রক্ত দেয়া হলো, সপ্তাহখানেক পর ডিসচার্জ নিয়ে চলে গেল।
প্রায় দুই মাস পর, ঢাকা মেডিকেলের কাছেই ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। হঠাত্ পেছন থেকে ডাক, ‘স্যার’। তাকিয়ে দেখি সেই ৮/৯ বছরের ছেলেটি। অদূরেই তার মা রাস্তায় হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙার কাজ করছে। আমি দাঁড়িয়ে ছেলেটির দিকে তাকাতেই সে আবার দৌড়ে তার মায়ের কাছে গিয়ে আমার দিকে ইঙ্গিত করল। আমি হাত নেড়ে চলে আসলাম। তারা কৃতজ্ঞতার চোখে অপলক তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ। নিজেও তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললাম! এমন ভালোলাগার অনুভূতি একজন সন্ধানীয়ান হিসেবে অনেকবার পেয়েছি। এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে কিংবা রক্তের ব্যবস্থা করে একটি জীবন বাঁচানোর সুখ। একসময় রক্তদান ছিল এক ভয়ংকর ও দুঃসাহসী কাজ। তাই কেউই রক্তদান করতে আসত না। ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের প্রয়োজনে, বাবা-মা ছেলেমেয়ের প্রয়োজনে রক্ত দিতে ভয় পেত। আজ আর সেই অবস্থা নেই। কারও প্রয়োজনে যে কেউ রক্তদানে এগিয়ে আসছে। রক্তদান কোনো কঠিন কাজ নয়—এই সত্য এবং তথ্যটি স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে সন্ধানী জনপ্রিয় করে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করেছে। এখন সন্ধানী ছাড়াও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, কোয়ান্টাম, বাঁধন, পুলিশ ব্লাড ব্যাংকসহ অনেক সংগঠন রক্তদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এটা সন্ধানীর সার্থকতা।
সন্ধানীর শুরুটা ছিল মানবিক সহায়তা দিয়ে। ব্যাপারটা ছিল এরকম—১৯৭৭ সালের প্রথম দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র মো. ইদ্রিস আলী জানতে পারেন যে তারই এক সহপাঠী আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে সকালের নাস্তা না করে অভুক্ত অবস্থায় দুপুর ২ টা পর্যন্ত ক্লাস করে। তাঁকে ব্যাপারটি ভীষণভাবে নাড়া দেয়। তিনি তাঁর অন্য পাঁচ বন্ধু মোস্তাফিজুর রহমান স্বপন, মোশাররফ হোসেন মুক্ত, মো. আব্দুল কাইউম, মোস্তফা সেলিমুল হাসনাইন ও খুরশীদ আহমেদ অপুকে সকালে নাস্তার টেবিলে ব্যাপারটি জানান। এ নিয়ে কিছু একটা করতে তাঁরা ছয় বন্ধু একত্রিত হন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের এনেক্স ভবনের কড়ই গাছের নিচে। তাঁরা আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, একজন ৭ টাকা, বাকি ৫ জন ৫ টাকা করে জমিয়ে তাঁদের এই বন্ধুকে দিবেন। যেহেতু তাঁদের বন্ধু নাস্তার টাকা নিতে চাইবে না, তাই সবার টাকা জমা করে মো. ইদ্রিস আলীকে দেয়া হবে এবং তিনি সহপাঠীকে বুঝিয়ে টাকা হস্তান্তর করবেন। এই মাসিক ৩২ টাকা সহপাঠীকে সহযোগিতার মাধ্যমে ১৯৭৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পথ চলা শুরু করেন ছয় বন্ধু।
এই ছয় জন একসময় কাজটির সাংগঠনিক নামকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। ১৯৭৭ সালের ১৯ মার্চ বিকাল ৫টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেকে সংগঠনের একটি করে নাম ঠিক করে একত্রিত হলেন। ‘অনির্বাণ’, “আমরা ক’জন”, ‘সন্ধানী’ এবং আরো কয়েকটি নামের মধ্য থেকে মোশাররফ হোসেন মুক্ত’র প্রস্তাবিত ‘সন্ধানী’ নামটিকেই তাঁদের স্বপ্নের সংগঠনের জন্য মনোনীত করলেন। সন্ধানীর প্রথম সংবিধানে উদ্দেশ্য হিসেবে লেখা ছিল—‘যাবতীয় অনাচার থেকে মুক্ত রেখে নিজেদেরকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং মানবতার কল্যাণের জন্য সাধ্যানুযায়ী সার্বিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া’। প্রতিষ্ঠাতা ছয় জনের কল্পনার ডানা আস্তে আস্তে মেলতে শুরু করল এবং একসময় তাঁরা দেখলেন যে, রক্তের অভাবে হাসপাতালে অনেক রোগী মারা যাচ্ছে। তাঁরা চিন্তা করলেন, সবাই একটু স্বপ্রণোদিত হয়ে রক্তদান করলেই তো অনেকগুলো জীবন বেঁচে যায়। তাঁরা ১৯৭৮ সালের ২ নভেম্বর প্রথম স্বেচ্ছায় রক্তদান অনুষ্ঠান করলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে—যেখানে ২৪ ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হলো। এই কর্মকাণ্ডকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ১৯৮২ সালে দেশের ৭টি মেডিকেল ও একটি ডেন্টাল কলেজ নিয়ে সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদ গঠিত হয়, যার প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন আবুল কালাম আজাদ—যিনি বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। ১৯৮৪ সালে ডা. আবুল কালাম আজাদসহ সন্ধানীর কিছু নিবেদিত ডাক্তারবৃন্দ চিন্তা করেন সন্ধানী যেহেতু মেডিকেল ও ডেন্টাল ছাত্রছাত্রী পরিচালিত সংগঠন, এর ব্যাপ্তি ডাক্তারসহ প্রফেশনালদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়া দরকার। দেশে তখন কর্নিয়ার সমস্যার কারণে অন্ধত্ববরণ করছে শিশুসহ অনেক মানুষ। শ্রীলংকার ডা. হাডসন সিলভা মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলনে পাইওনিয়ার ভূমিকা পালন করে শ্রীলংকাকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেছেন। ১৯৮৪ সালের ২৫ নভেম্বর ডা. হাডসন সিলভার উপস্থিতিতে বাংলাদেশে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রংপুরের কিশোরী বালিকা টুনটুনীর চোখে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে শুরু হয় এই মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলন। যে টুনটুনী জন্মের পর পৃথিবীর আলো দেখতে পায়নি, তার প্রিয় মাকে দেখতে পায়নি সে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের পর তার মাকে দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলে বলে, ‘মা, আমি তোমারে দেখতে পাইতেছি, তুমি অনেক সুন্দর, পৃথিবীর সব কিছুই কী সুন্দর!’ শুরু হলো সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির যাত্রা। দেশে বর্তমানে ৫ লক্ষাধিক লোক কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বে ভুগছে। প্রতি বছর আরও নতুন করে যোগ হচ্ছে ৪০ হাজার লোক।
মানুষ মরণশীল। মৃত্যুর পর দেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মাটির সাথে মিশে যাবে। অথচ একজন মৃতব্যক্তির অঙ্গ সংগ্রহ করে অন্য কোনো জীবিত দেহে প্রতিস্থাপন করলে একটি মানুষ সুস্থ হয়ে নতুন জীবন ফিরে পেতে পারে, একজন কর্নিয়াজনিত অন্ধ ফিরে পেতে পারে পৃথিবী দেখার আনন্দ। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআন শরিফেও বলেছেন, ‘যে একজন মানুষের জীবন বাঁচাল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন বাঁচাল’। সৃষ্টির সেবা সর্বোত্কৃষ্ঠ ইবাদত। বাংলাদেশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন আইনে যেকোনো বয়সের ব্যক্তির মরণোত্তর চক্ষুদান এবং মৃত্যুর পর তাঁর কোনো উত্তরাধিকারের লিখিত অনুমতি-সাপেক্ষে চক্ষু সংগ্রহের বিধান রয়েছে। সৌদি আরব, ইরান, কুয়েতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ মৃত্যুর পর মৃতদেহ থেকে অঙ্গ সংগ্রহ করে অন্য জীবিত দেহে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অসংখ্য রোগীর জীবন বাঁচিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে এবং মৃতদেহ থেকে চক্ষু সংগ্রহ করে অন্য অন্ধ ব্যক্তির চোখে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অসংখ্য কর্নিয়াজনিত অন্ধের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের মতো রক্ষণশীল দেশেও প্রতি বছর সাত হাজার কর্নিয়া প্রতিস্থাপন হচ্ছে। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা গেলে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব দূরীকরণে বাংলাদেশ এক বিপ্লব তৈরি করতে পারে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষাধিক লোক মৃত্যুবরণ করে। এর ২% মানুষের কর্নিয়া সংগ্রহ করতে পারলে বছরে আমরা ৪০ হাজার কর্নিয়া পেতে পারি। অথচ আমরা এখন বছরে মাত্র ৬০-৭০টি কর্নিয়া পাচ্ছি। এইভাবে চলতে থাকলে দেশের কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব দূর করতে ৬ হাজার বছর লাগবে। এই ভয়াবহ অবস্থার উন্নতি হতে পারে যদি সর্বমহলে সচেতনতা তৈরি হয়।
স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান শুধুমাত্র মহত্ কাজ নয়। এ এক সমাজের সুস্থ ধারা। পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা কোথায় যাচ্ছি তা চিন্তা করা জরুরি। মানুষের উন্নতি হোক, পৃথিবী এগিয়ে যাক। কিন্তু মানবিকতা, সরলতা, ন্যায্যতা, নষ্ট না হোক। সকল মহত্ কাজ প্রণোদনা পাক। মানবতার জয় হোক। সন্ধানীর জয় হোক।
ইত্তেফাক/আনিসুর