ভোর ৫টা, বেশিরভার মানুষ তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। ঠিক সে সময় জীবিকার সন্ধানে শ্রম বেচা-কেনার হাটে হাজির হন কুষ্টিয়ার শ্রমজীবী মানুষেরা।
এ সময় কারো হাতে দড়ি, কাঁচি, আবার কারো হাতে কোদাল বা কারো হাতে ডালি। কৃষিসহ বিভিন্ন কাজের সরঞ্জাম নিয়ে তারা হাজির হন প্রতিদিন ভোরে। যখন যে কাজের মৌসুম শুরু হয়, তখন সেই কাজের সরঞ্জাম নিয়ে দেখা যায় তাদের। দাঁড়িয়ে থাকেন শ্রম ক্রেতা বা তার প্রতিনিধির অপেক্ষায়।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র ঈগল চত্বরের ব্রিজ এলাকায় প্রায় এক যুগের অধিক সময় ধরে চলছে এই শ্রম বেচা-কেনার হাট। মিরপুর উপজেলাসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার মানুষ আসেন শ্রম বেচা-কেনার এ হাটে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে এই অভাবী মানুষগুলো কাজের সন্ধানে ছুটে আসেন ভোর ৫টা থেকে। শীতের রাতে যা রীতিমত কষ্টসাধ্য। কারণ তখনও কাক ডাকা শীতের ভোর শুরু হয় না।
সরেজমিনে এই শ্রম বেচা-কেনার হাটে গিয়ে দেখা যায়, শীতের ভোরে কয়েকশ’ লোকের উপস্থিতি। শরীরটা চাদরে মোড়ানো। ঘন কুয়াশায় চারিদিকে বয়ে যাচ্ছে হিমেল হাওয়া। রীতিমতো জবুথবু অবস্থা। ধান চাষের ও কাটার মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ৩শ’ থেকে ৫শ’ শ্রমিক উপস্থিত হন এই শ্রমের হাটে।
মিরপুর উপজেলার চিথলিয়া এলাকার শহিদুল মালিথা এ প্রতিবেদককে বলেন, গরিব মানুষ কাজ না করলে কি চলে! নিজ প্রামে কাজ করলেও হয়। কিন্তু নগদ টাকা সব সময় পাওয়া যায় না। তাই প্রতিদিন ভোর বেলায় ব্রিজের শ্রম বেচা-কেনার হাটে চলে আসি। এখানকার মাধ্যমে যেসব গেরস্থ্যের বাড়িতে কাজ করি, তারা কাজ শেষ হলেই টাকা দিয়ে দেন। আর এখান থেকে কাজ করতে গেলে কাজ শেষে ছুটিও পাওয়া যায় দ্রুত সময়ে।
জেলার দৌলতপুর উপজেলার শেরপুর গ্রামের দিন মজুর আজাদ মন্ডল জানান, শেরপুর থেকে প্রায় ১০ মাইল রাস্তা হেটে ঈগল চত্বরের ব্রিজ এ কাজের সন্ধানে কোদাল নিয়ে এসেছি। ভোর ৪টার দিকে বাড়ি থেকে হাটা দিয়েছি। এখন (তখন) সময় সাড়ে ৫টা, এসময় ধরে হেটে এসেছি। তার পর শ্রম বেচা-কেনার হাটে চলে আসি। এখানে গেরস্থ্যের (অবস্থা সম্পন্ন কৃষক) সাথে দরদামে বনিবনা হলে তখন আবার যেতে হয় তাদের ক্ষেতের জমিতে। অথবা গৃহের কোনো কাজের ক্ষেত্রে আমাদের সময় দেওয়া রয়েছে ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১টা পযর্ন্ত। এর আগে গেরস্থ্যের কাজ শেষ হয়ে গেলে গেরস্থ্য আমাদের পাওনা মিটিয়ে ছুটি দিয়ে দেন।
মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার দিন মজুর খোকন জানান, অভাবী মানুষ আমরা, প্রতিদিন কাজ করে খাই। কাজ না করলে সংসার চলে না আমার। তিন ছেলে মেয়েকে নিয়ে আমার সংসার। তাদের সবাইকে কম বেশি পড়াশোনা করাচ্ছি। তাদের পড়াশোনার খরচ ও পোশাক-আশাক দিতে প্রতিদিন কাজ করতে হয়। তাই কিসের ভোর আর কিসের শীত? সব কিছু উপেক্ষা করে সাইকেল নিয়ে চলে আসি ঈগল চত্তর ব্রিজের শ্রম বেচা-কেনার হাটে। এখন প্রতিদিনের মজুরী ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকা। কাজের যখন চাপ হয় তখন ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকা পযর্ন্ত দেয়া হয়।
চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার উদু ফকির জানান, আমার এলাকায়ও কাজ আছে। সেখানে কাজ করলেও চলে। কিন্তু টাকা গুলো গুছিয়ে রাখতে পারি না। তাই এত দূরে এসে কাজ করছি, যাতে মাস শেষে আমার আয়ের একটা বড় অংকের টাকা হাতে থাকে এই কারনে। মাঝে মাঝে বাড়ির জন্য মন খারাপ হয়। কি আর করা, আসলে আমার কপালে লেখা ছিলো এদেশে এসে কাজ করা তাই কাজ করছি।
শ্রমিক কিনতে আসা মিরপুর উপজেলার ধুবইল ইউনিয়নের গুলশান মোড়ের তিশান সোহেল জানান, মিরপুরের ঈগল চত্বরের ব্রিজে ভোর থেকে নিত্য নতুন শ্রমিকের হাট বসে। দরদাম করে প্রতিদিন ইচ্ছামত শ্রমিক কিনতে পাচ্ছি। মাঠে ফসলের কাজ তুলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সময়মতো সব কাজ সঠিক সময়ে করতে পারছি।
শ্রমিক কিনতে আসা মিরপুর আর্দশপাড়া এলাকার বিল্লাল মন্ডল জানান, কাজের মৌসুম হলে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ে। প্রতিদিন প্রায় ৩শ’ থেকে ৫শ’ শ্রমিক উপস্থিত হয় এখানে। কিন্তু এখন এই কয়দিন শ্রমিকের উপস্থিতি একটু কম দেখা যাচ্ছে।
কাজের মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে আবার শ্রমিকের আনাগোনা বেড়ে যায় এখানে। এলাকার মানুষ প্রয়োজন মতো হাট থেকে প্রতিদিন মজুরিতে তাদের কিনে নেন। অনেকটা পণ্যের মতো চলে তাদের শ্রমের দার কষাকষি। কামলা হিসেবে কাজ করা এ মানুষগুলোকে কুষ্টিয়ার স্থানীয় ভাষায় এসব ‘আইভাই’ হিসাবে পরিচিত।
ইত্তেফাক/নূহু