৩০জন কুপিয়ে হত্যা করল যুবলীগ কর্মীকে

 
সোনারগাঁয়ে পিরোজপুর ইউনিয়নের কান্দারগাঁও এলাকায় একটি কোম্পানির বালু ভরাট কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের বিরোধের জের ধরে মোহাম্মদ আলী মামুন নামের এক যুবলীগ কর্মীকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষ। বুধবার গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে বৃহস্পতিবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেনসহ ৬জনকে আটক করেছে পুলিশ। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পর্যন্ত সোনারগাঁ থানায় মামলা হয়নি। নিহত মোহাম্মদ আলী সোনারগাঁ পৌরসভার সাহাপুর গ্রামের মৃত আরজন আলীর ছেলে। তিনি তার মায়ের সাথে পিরোজপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি জাকির হোসেনের বাড়িতে বসবাস করতেন। তিনি জাকির হোসেনের ভাগিনা। ঘটনার পর দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খ-অঞ্চল) মো. সাজিদুর রহমান ও ওসি ওবায়েদুর রহমান। 
 
জানা গেছে, গত ১২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় একশ’ ভূমি মালিক নিজেদের জমি রক্ষায় নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়েছিল, সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের জৈনপুর, রতনপুর, চরভবনাথপুর ও ছয়হিস্যা মৌজায় গ্রামবাসী যেসব কৃষিজমিতে ধান চাষ করে আসছিলেন ওই জমিগুলোতে সোনারগাঁ ইকোনমিক জোন নামের প্রকল্পে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইউনিক প্রপার্টি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড 'সোনারগাঁ রিসোর্ট সিটি' নামে আবাসন প্রকল্প চালু করে। প্রকল্পভুক্ত কিছু লোকের জমি খরিদ এবং কিছু লোকের জমি খরিদ না করে বহু মানুষের কাছে আবাসন প্লট বিক্রি করে। আজ পর্যন্ত কাউকে প্লট রেজিস্ট্রি বা দখল বুঝিয়ে দেয়নি। প্লট মালিকদের টাকা ফেরত না দিয়ে এসব প্লটের মালিক সেজে নতুনভাবে 'সোনারগাঁ ইকোনমিক জোন' নামের প্রকল্প হাতে নেয় একই গ্রুপ। যারা প্লট কিনেছে তাদের জানিয়ে দেয়া হয়, এখানে আবাসন প্রকল্প হবে না। যারা টাকা দিয়ে প্লট কিনেছেন তাদের টাকা ফেরত দেয়া হয়নি। এতে করে প্লট কেনা অনেকেই মিথ্যা প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। কৃষকের ধানের জমি জোর করে ভরাট করায় সাধারণ কৃষকরা তাদের একমাত্র উপার্জনের পথ হারাচ্ছেন। প্রস্তাবিত প্রকল্পের সব ভূমি তিন ফসলি কৃষিজমির পাশাপাশি প্রকল্প ঘেঁষা মেঘনা নদীর বিরাট অংশ এবং এলজিইডির কান্দাগাঁও গ্রাম পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তাসহ বালু দিয়ে ভরাট করায় অত্র এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দার চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে। লিখিত আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই বালু ভরাটের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসদুর রহমান মাসুম, ৬নং ওয়ার্ড মেম্বার আলমগীর কবির, ৭নং ওয়ার্ড মেম্বার মোশাররফ হোসেন, ভাটিবন্দর গ্রামের আফজাল হোসেন, জৈনপুরের বাসিন্দা নোয়াব হোসেন ও খোকনসহ আরো অনেকে। নিহত মোহাম্মদ আলীর মামা পিরোজপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি জাকির হোসেন জানান, নূর আলীর মালিকানাধীন ইউনিক গ্রুপের পক্ষ নিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান মাসুম, ৭নং ওয়ার্ড মেম্বার মোশাররফ হোসেন, ৬নং ওয়ার্ড মেম্বার আলমগীর কবিরসহ একটি গ্রুপ বালু সন্ত্রাসীর কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইজিপি, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন দফতরে যে অভিযোগ দেয়া হয়েছিল তাতে গণস্বাক্ষরে নিহত মোহাম্মদ আলীর মায়ের স্বাক্ষর ছিল ৬ নম্বরে। এছাড়া ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত ছিল। ওই আন্দোলনের জের ধরেই মোহাম্মদ আলীকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। 
 
নিহতের মামা জাকির হোসেন জানান, ইউনিক গ্রুপের সোনারগাঁ রিজোর্ট সিটি নামের একটি  কোম্পানি উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জমি ক্রয় না করেই সাধারণ কৃষকদের জমিসহ আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তিতে অবৈধ ভাবে বালু ভরাট করে আসছে। কৃষকদের ফসলী জমি রক্ষা করতে গিয়ে কয়েক গ্রামের শত শত নারী পুরুষ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। এছাড়াও গত ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ ইং তারিখে জোর করে অবৈধ ভাবে বালু ভরাটের প্রতিকার চেয়েছি ভূমি মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের আইজিপি, নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার, সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের ১৪ দফতরে স্থানীয় শতাধিক কৃষকের স্বাক্ষরসহ অভিযোগ দায়ের করেছি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে স্থানীয় ৭নং ইউপি সদস্য ভবনাথপুর গ্রামের আব্দুল বাতেনের ছেলে মোশারফ হোসেন আমাকে ও আমার পরিবারের লোকজনদের নানাভাবে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল। এ ঘটনায় আমার ও আমার পরিবারের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ২ জানুয়ারি সোনারগাঁ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি। যার নং ৭৫। পরিকল্পিতভাবে মোশারফ ও তার বাহিনী আমার ভাগিনাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কোম্পানির বালুর মাঠে কুপিয়ে হত্যা করেছে। 
 
সোনারগাঁ থানার আটক ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেন জানান, মোহাম্মদ আলী একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। সে কান্দারগাঁও গ্রামের সাধন মিয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি। আমাদের বালু ভরাট কাজ থেকে সে প্রতিদিন ১৭ হাজার টাকা করে চাঁদা নিত। একদিন টাকা না দেওয়ায় রাতের বেলায় তার লোকজন নিয়ে ড্রেজারে হামলা চালায়। এসময় হামলাকারীদের প্রতিহত করার এক পর্যায়ে মোহাম্মদ আলী আহত হয়। এ ঘটনার সাথে আমি জড়িত না। 
 
সোনারগাঁ থানার ওসি (অপারেশন) আব্দুল জব্বার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নে কান্দারগাঁও এলাকায় ইউনিক গ্রুপ নামে কোম্পানির বালু ভরাটকে কেন্দ্র করে যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন ও ইউপি সদস্য মোশারফ বাহিনীর মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। বুধবার রাতে মোহাম্মদ আলীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে পালিয়ে যায়। পরে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি  মারা যান। এ ঘটনায় রাতেই ইউপি সদস্য ও ইউপি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোশারফ হোসেনসহ ৬জনকে আটক করে পুলিশ। ওসি অপরাশেন আরো জানান, এ ঘটনার তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ওবায়েদ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে কিলিং মিশনে থাকা শামীম সরকার নামে কিলার নিহত মোহাম্মদ আলীকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে। পিটুনীতে নিহতের মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয়েছিল। এছাড়া মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। এ ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান মাসুমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেনি।
 
ইত্তেফাক/আরকেজি