অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত রংপুরের জনজীবন

‘মাঘের জারে বাঘ কাঁন্দে’ এই প্রবাদ বাক্যটিই পৌষের শেষদিকে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে রংপুর বিভাগের মানুষ। অব্যাহত ঘন কুয়াশা আর কনকনে হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। হাড় কাঁপানো শীতে মানুষের পাশাপাশি কাবু হয়ে পড়েছে গবাদী পশু-পাখিও। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। সন্ধ্যার পরপরই কুয়াশার চাদরে বন্দি হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ। রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল করছে নিয়ন্ত্রিত গতিতে। 
 
শীত মৌসুমের শুরুতে রংপুর বিভাগে সে রকম একটা শীত অনুভূত না হলেও পৌষের শেষ দিকে তা জেঁকে বসতে শুরু করেছে। সেইসাথে বইছে কনকনে হিমেল হাওয়া, ঘন কুয়াশা আর সূর্যের লুকোচুরি খেলা।  বিরূপ আবহাওয়ায় জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। হাড় কাঁপানো শীতের হাত থেকে বাঁচতে মানুষজন তাদের শেষ গরম কাপড়টিও শরীরে জড়িয়েছে। তবে সামান্য এক টুকরো গরম কাপড় দিয়ে বেঁচে থাকা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল ও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। হিমেল হাওয়া, শিরশির ঠাণ্ডার আক্রমণে ওইসব অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকা কষ্টদায়ক হয়ে পড়েছে। নদীর চরে বসবাসকারী মানুষ বয়ে যাওয়া হিমেল হাওয়ার সাথে এক ধরনের যুদ্ধ করেই টিকে আছে। প্রতিটি জেলায় হতদরিদ্র শীতার্ত মানুষের সংখ্যা গড়ে আড়াই লাখের ওপর। সেই হিসেবে রংপুর বিভাগের ৮ জেলার দরিদ্র শীতার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখের ওপর। সচেতন মহলের দাবি, শীতার্ত মানুষের পাশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলো এখনই এগিয়ে না এলে চরম দুর্ভোগে পড়বে মানুষ।
 
এদিকে শীতের জন্য নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কর্মের অভাব দেখা দিয়েছে। খেটে খাওয়া মানুষরা ঠিকমত নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে না পেরে চরম বেকায়দায় রয়েছে। ঘন কুয়াশা ও কনকনে শীতের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম কমে গেছে। এছাড়া গৃহ পালিত পশু-পাখিকে ঠাণ্ডার হাত থেকে রক্ষায় নানা ধরণের চেষ্টা করছে গৃহস্থরা। গোয়াল ঘরে আগুন দিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। এমনকি খড়ের বিছানাও পেতে দিয়ে পশু-পাখিকে রক্ষা করা হচ্ছে। কনকনে শৈত্যপ্রবাহে বৃদ্ধি পাচ্ছে কোল্ড ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসনালীর প্রদাহ ও সর্দি-জ্বরসহ বিভিন্ন শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব। প্রতিদিনই রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ শিশু ও বৃদ্ধ। হাড় কাঁপানো শীতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে শিশুসহ বৃদ্ধরা।
 
অপরদিকে, শীত ও কনকনে ঠাণ্ডায় গবাদী পশুর মাঝে কোল্ড ডায়রিয়া ও রোটা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ঠাণ্ডাজনিত ধকলসহ নিউমোনিয়া, সর্দি জ্বর ও কাশিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে শত শত গরু-ছাগল। ঘন কুয়াশার কারণে রংপুর অঞ্চলের আলু চাষীরা মৌসুমের শুরুতেই ছত্রাকজনিত আরলি ব্লাইট ভাইরাস আক্রমণে আলু ক্ষেতে পচন ধরার ভয়ে আতংকিত হয়ে পড়েছে। যদিও এ অঞ্চলে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়নি তবুও ঘন কুয়াশাপাতের ধরণ দেখে চাষীরা দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তীব্র ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে নগ্ন পায়ে কাদা মাটিতে কাজ করতে গিয়ে চাষীরা ঠাণ্ডায় হিম হয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অপরদিকে ভাসমান লোকজন আশ্রয়ের অভাবে দালান-কোটার বারান্দায় আশ্রয় নিলেও শীতে কাবু হয়ে জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। সামান্য খড়কুটো জোগারের মাধ্যমে তা জ্বালিয়ে তাপ গ্রহণ করছে এই মানুষগুলো। একদিকে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় কাহিল হয়ে পড়েছে মানুষ, অন্যদিকে সকল কাজ কর্মে ধীরগতি এসেছে। ফলে লোকজন বাড়ি থেকে তেমন একটা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হচ্ছে না। কৃষকরাও তাদের ফসল নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
 
রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকতা ফরিদুল হক বলেন, মন্ত্রণালয়ে ১ লাখ শীতবস্ত্রের চাহিদা পাঠিয়েছি। এখন পর্যন্ত ৫৪ হাজার শীতবস্ত্র আমরা পেয়েছি এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে সেগুলো বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এ বছর যতগুলো শীতবস্ত্র এসেছে বিগত দুই বছরে তা আসেনি। 
 
ইত্তেফাক/এমআই