‘হামরা ঠান্ডায় মরি যাওছি’

‘হামরা ঠান্ডায় মরি যাওছি, কিন্তু হামাক কায়ো দেখেছে না বাহে।’ গতকাল শনিবার নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌর এলাকায় শীতে জুবুথুবু রিকশাচালক হায়দার আলী (৬৫) বলেছেন এ কথা। একই উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের বৃদ্ধা সহিত বেওয়া (৭০) বললেন, ‘কায়ো হামার পাকে ফিরে চায় না। লন্ডা (পুরনো কাপড়) বাজারের কাপড়ও কিনিবার পারি না বাহে।’

শুধু হায়দার আলী বা সহিত বেওয়াই নন, দেশের এমন লাখো দরিদ্র মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা তেমন মিলছে না। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার কুরুষা ফেরুষা গ্রামের হালিমা বেওয়া (৮৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কয়দিন ধরে ঠান্ডায় মুই বাঁচং না! এই ঠান্ডায় কেউ খোঁজ-খবর রাহে না। এহন পর্যন্ত কোন মেম্বার-চেয়ারম্যান মোক কম্বল দিল না বাহে! ভোট আসলে কি সুন্দর কথা কয়। বাহে মুই গরীব মানুষ। আমার সুখ-দুঃখের কথা কে শুনে?’ 

দেশের বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে এখনো শৈত্যপ্রবাহ বইছে। শনিবার রাজশাহী ও চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৫.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র শীত, ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠান্ডায় কাঁপছে সাধারণ মানুষ। জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। কোল্ড ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে  নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। মানিকগঞ্জের শিবালয়ে শীতজনিত কারণে কমপক্ষে ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সারাদিন সূর্যের আলো ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে থাকায় শ্রমজীবী মানুষেরা কাজেও যেতে পারছেন না। ফলে খাদ্য সংকটে পড়েছেন অনেকেই। শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, প্রচণ্ড শীতে নারী-শিশুসহ সববয়সী লোকজন, বিশেষ করে পদ্মা-যমুনা তীরবর্তী এলাকার মানুষ বেশি কষ্ট পাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপজেলার মেহেদীপুর গ্রামের কৃষক নবু শেখ (৬২), জাফরগঞ্জ হাইস্কুলের সাবেক শিক্ষক মাওলানা মানসুরুল রহমান (৮২) ও আরিচা ঘাটের ব্যবসায়ী তপন সাহা (৬০) মারা গেছেন। হাসপাতাল, ক্লিনিকে ঠান্ডায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।  ঘন কুয়াশায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, আরিচা-কাজীরহাট নৌরুটে প্রায়শই ফেরি, লঞ্চ, কার্গো-নৌকা চলাচল বন্ধের ঘটনায় আটকে পড়া যাত্রীরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, কনকনে শীতে কাঁপছে সৈয়দপুরের জনপদ। দুদিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। শীতে কষ্ট পাচ্ছে হতদরিদ্র মানুষ। আবহাওয়া অফিস জানায়, মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এই জনপদে। ফলে তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে। মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে ফগলাইট (কুয়াশা) জ্বালিয়ে ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করছে। বিমানবন্দর থেকে যাত্রবাহী বিমানগুলো কুয়াশার কারণে বিলম্বিত অবতরণ ও উড্ডয়ন করছে। একইভাবে ট্রেনগুলো কমপক্ষে ২ ঘণ্টা দেরীতে চলাচল করছে। সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ শীতজনিত রোগে ২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বজলুর রশীদ জানান, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১০০টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। আরও বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষের কাছে।

রাজশাহী স্টাফ রিপোর্টার জানান, শনিবার ভোরে রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৫.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি মৌসুমে এটিই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। ভোরে কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে রাজশাহী। সূর্যের মুখ দেখা গেছে সকাল ১০টার পর। তীব্র শীত এভাবে হামলে পড়ায় কাঁপছে মানুষ। তারা খড়কুটো জ্বালিয়ে শরীর গরম করছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা কম দামে গরম কাপড় কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন বিভিন্ন ফুটপাতের দোকানে।

দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় অসহনীয় শীত অনুভূত হচ্ছে। শনিবার চুয়াডাঙ্গায়ও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৫.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রতিদিন তাপমাত্রা কমছে। ঘণ্টায় প্রায় ১২ কিলোমিটার গতিবেগে বাতাস বইছে। খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে প্রতিদিন। কারণ শীতে কাজ নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে একরকম অসহায় জীবন-যাপন করতে হচ্ছে তাদের।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, গতকাল জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ অবস্থায় কনকনে ঠান্ডা আর উত্তরের হিমেল হাওয়ায় কাহিল হয়ে পড়েছে মানুষ। শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে ৩৫ জন শিশু, ডায়রিয়ায় ২০ জন ও অন্যান্য রোগে ৪৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। শীতকাতর মানুষেরা জানান, গরম কাপড় কেনার সামর্থ না থাকায় শিশুদের ঠান্ডাজনিত রোগ-ব্যাধি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে কাজের সন্ধানে বের হলেও কাজ জোটাতে পারছেন না দিনমজুররা।

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে  ধরলা নদী অববাহিকার অর্ধশতাধিক চর ও দ্বীপ চরের ২০ হাজার মানুষ। গরম কাপড়ের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা। রেহাই পাচ্ছে না পশু-পাখিও। রোপনের জন্য অপেক্ষমান বীজ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। সূর্যের আলোর অভাবে এলাকার সমস্ত বীজতলা হলদে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার মাহবুবুর রশিদ জানান, ইরিবোরো বীজ রক্ষায় সারারাত বীজতলা পানিতে ডুবিয়ে রাখতে এবং সালফার জাতীয় সার প্রয়োগের  পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, জেলায় গত কয়েক দিনে শীতের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাপমাত্রা কমার সাথে সাথে হাসপাতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। বড়রা আক্রান্ত হচ্ছে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে। বাড়ছে শিশু রোগীর সংখ্যা। শয্যা না পেয়ে অনেকের ঠাঁই হয়েছে বারান্দায়। শীতজনিত রোগ থেকে বাঁচতে শিশুদের গরমস্থানে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন          মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের চিকিত্সক আবু মোহাম্মদ রাজু। এদিকে  শ্রমজীবী মানুষ কাজের সন্ধানে গিয়ে কাজ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। সদর উপজেলার উজলপুর গ্রামের দিনমুজুর এখলাছ জানান, গত কয়েকদিনের শীতে তাদের আয়েও ভাটা পড়েছে। পরিবার পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, জেলার অসহায় শীতার্তরা শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে। শীতের তীব্রতায় দিনের বেলায় শহরে জনসমাগম যেমন কমে গেছে তেমনি সন্ধ্যার পর পরই হাট-বাজার একবারে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না অনেকেই। গরীব অসহায় মানুষজন শীতবস্ত্রের জন্য প্রতিদিন জনপ্রতিনিধি, অফিসপাড়া ও এনজিও অফিসে ঘুরছেন। শৈত্য প্রবাহ চলতে থাকলে আলু ও গমসহ রবিশস্যের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কনকনে ঠান্ডায় ভুগছে উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার হতদরিদ্র মানুষ। শীতের কাপড়ের অভাবে কাতরাচ্ছে তারা। এখনও কেউ কোন শীত বস্ত্র পায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওলিউজ্জামান বলেন, কিছু সরকারি কম্বল এসেছে, পর্যায়ক্রমে আরও আসবে। তবে যে পরিমাণ শীতবস্ত্র এসেছে তা অপ্রতুল।

গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, গত কয়েক দিন ধরে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, হিমেল হাওয়া ও অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহে তিস্তার চরাঞ্চল ও কূলবর্তী গ্রামসহ উপজেলার সর্বত্র জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চালকলগুলো বন্ধ রয়েছে। গতকাল তিস্তা বাঁধে আশ্রিত অভাবী লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায় শীতের কষ্টের কথা। এসব পরিবারের একটাই আকুতি, ‘ঠান্ডার হাত থেকে হামাক বাঁচান।’

এদিকে রংপুরসহ জেলার পীরগাছা ও বদরগঞ্জ, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও কামারখন্দ, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ, কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও বরিশালের আগৈলঝাড়া থেকে তীব্র শীতে মানুষজনের দুর্ভোগের খবর পাঠিয়েছেন ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।

ইত্তেফাক/নূহু