সন্ত্রাসী পেশা ছাড়ি, আলোকিত জীবন গড়ি—এই প্রত্যয় নিয়া চরমপন্থিরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়া আসিতেছেন। শুধু চরমপন্থি নহে, সাম্প্রতিক সময়ে জলদস্যু ও মাদক কারবারিরাও একে একে ফিরিয়া আসিতেছেন সুস্থ জীবনে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ইহা একটি বিরাট অগ্রগতি। ইহা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদারতা ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনও বটে। ভুল শুধরাইয়া পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে স্বাভাবিক জীবন-যাপনের সুযোগ গ্রহণের আহ্বান তিনি বরাবরই জানাইয়া আসিতেছেন। সম্প্রতি পাবনার শহীদ অ্যাডভোকেট আমিনউদ্দিন স্টেডিয়ামে দেশের ১৪টি জেলার পূর্ববাংলা সর্বহারা, পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা), নিউ পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি ও কাদামাটি নামের চারটি চরমপন্থি সংগঠনের ছয় শতাধিক সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাহারা ৬৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৭৫টি দেশীয় অস্ত্র জমা দেন। তাহাদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, বিস্ফোরক ও অস্ত্র মামলা রহিয়াছে। তাহাদের অধিকাংশই ফেরারি ও আত্মগোপনে থাকিয়া অস্বাভাবিক জীবন যাপন করিতেছিলেন। আজ তাহারা শুধু পরিবারের সদস্যদের মাঝে ফিরিয়াই আসেন নাই, আর্থিক সুবিধা প্রদান ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাহাদের পুনর্বাসনের চেষ্টাও চলিতেছে।
দীর্ঘ ২০ বত্সর পর দ্বিতীয় দফায় দেশের উত্তর-দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের এসব চরমপন্থি নেতা-কর্মী আত্মসমর্পণ করিলেন। ইহার আগে ১৯৯৯ সালে দুই হাজার চরমপন্থি আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। বলাবাহুল্য, তখনও ক্ষমতায় ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৯ হইতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পাবনা ও এতদঞ্চলে চরমপন্থিদের হাতে নিহত হইয়াছে ২৮৭ জন নিরীহ মানুষ। তাহাদের হামলায় আহত হওয়া ও সম্পদ খোয়ানোর ঘটনা অসংখ্য। উল্লেখ্য, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে একশ্রেণির চরমপন্থিদের তত্পরতা লক্ষ্য করা যায় যাহাদের অধিকাংশ ছিলেন নকশাল আন্দোলনের অন্যতম নেতা চারু মজুমদারের আদর্শে উজ্জীবিত। নকশাল শব্দটি আসিয়াছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোটগ্রাম ‘নকশালবাড়ি’ থেকে। এই বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে ছিলেন চারু মজুমদার, সুশীতল রায়চৌধুরী, কানু সান্যাল ও জঙ্গল সাঁওতাল। কৃষকদের উপর স্থানীয় ভূস্বামীদের অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদে তাহারা ছিলেন সোচ্চার। চারু মজুমদার ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও সেতুংয়ের অনুসারী, যিনি মনে করিতেন ভারতের কৃষক ও গরীব মানুষদের উচিত তাহার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া শ্রেণিশত্রুদের চিহ্নিতপূর্বক তাহাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করা। তাহার রচিত ‘হিস্টরিক এইট ডকুমেন্টস’ বা আট দলিল নকশাল আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে। বাংলাদেশেও এই আন্দোলনের প্রভাব দেখা দেয় এবং সিরাজ শিকদার পর্যন্ত এক ধরনের আদর্শিক ভাবধারা লক্ষ করা গেলেও পরবর্তী সময়ে তাহাদের মধ্যে কোনো আদর্শ আর বিদ্যমান ছিল না। লুটতরাজই হইয়া উঠিয়াছিল তাহাদের মূল লক্ষ্য। একসময় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে তাহাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় ভয়ঙ্কর বিভক্তিও ।
সুস্থ-সুন্দর স্বাভাবিক জীবন কেবল নিজের জন্যই নহে, পরিবার ও সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্যই প্রয়োজন। বিষয়টি উপলব্ধি করিয়া ও ভুল স্বীকার করিয়া যাহারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়া আসিতে চাহে, তাহাদের সেই সুযোগ দেওয়া দরকার। তাই এইক্ষেত্রে সরকার এক অনন্য নজিরই স্থাপন করিল।