গহীন আঁধার হইতে ছেঁচিয়া আনা বিস্ময়ছবি

মহাকাশের এক অনন্ত বিস্ময় ব্ল্যাকহোল—যাহাকে বাংলায় বলা হয় কৃষ্ণগহ্বর। এই অনন্ত বিস্ময়ের তত্ত্বীয়রূপ সম্প্রতি বাস্তবে ধরা দিয়াছে। এতদিন চাঁদের মাটিতে মানুষের হাঁটা বা মঙ্গলে রোবটের পদচারণাকে মহাজাগতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বলিয়া বিবেচনা করা হইত। সেই পথকে আরো একটুখানি আগাইয়া মানুষের চোখ পৌঁছাইয়া গেল মেসিআর ৮৭ ছায়াপথের কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোলে—যাহার আয়তন আমাদের সূর্যের চাইতে ৬৫০ কোটি গুণ বড়! দূরত্বখানিও চমকাইয়া যাইবার মতো—পৃথিবী হইতে ৫২ লক্ষ কোটি কিলোমিটার। কৃষ্ণগহ্বরটি সকল কিছু গিলিয়া ফেলিতেছে, এমনকী আলোও। এই মহাজাগতিক গর্তের ছবি তোলা হইল অভিনব উপায়ে—পাঁচটি মহাদেশ, অ্যান্টার্কটিকা হইতে চিলি, আটটি দৈত্যাকৃতি রেডিও টেলিস্কোপ দিয়া। এই অধরা ‘ব্ল্যাকহোল’ ক্যামেরাবন্দি করিবার অভিনব চেষ্টা চলিতেছিল ২০১২ সাল হইতে। এই কাজে যুক্ত ছিলেন কয়েক শত বিজ্ঞানী। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয় শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতি। অবশেষে দুই বত্সর পর ধরা দিল অধরা কৃষ্ণগহ্বর!

প্রত্যেক ব্ল্যাকহোলের চারিদিকে একটি সীমা রহিয়াছে, যেইখানে একবার ঢুকিলে আর বাহির হওয়া যায় না। ইহা অনেকটা মহাভারতের চক্রব্যূহের মতো, যাহার মধ্যে প্রবেশ করা যায় কিন্তু বাহির হওয়া যায় না। কৃষ্ণগহ্বরকে বলা হয় মহাকাশীয় মহাদানব, যাহার প্রবল আকর্ষণের গ্রাস হইতে নিকটবর্তী কেহই রক্ষা পায় না। কৃষ্ণগহ্বরের জন্মের ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নহে। একটি অতিকায় তারার মৃত্যু হইতে জন্ম লয় একটি কৃষ্ণগহ্বর। একটি তারার অভ্যন্তরে যতক্ষণ পর্যন্ত হাইড্রোজেন গ্যাস অবশিষ্ট থাকে, ততক্ষণ অবধি ইহার ভিতরে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া চলিতেই থাকে। হাইড্রোজেন শেষ হইয়া গেলে ইহার কেন্দ্রীয় মূলবস্তু প্রচণ্ডভাবে সঙ্কুচিত হইতে শুরু করে। এইভাবে মৃত্যু ঘটে একটি তারার। সেই তারাটি যদি অতিকায় হয়, তবে তাহার অন্তস্থ বস্তু পরিণত হয় কৃষ্ণগহ্বরে। তৈরি হয় শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র।

এই কৃষ্ণগহ্বর লইয়া জ্যোতির্বিজ্ঞানী তো বটেই, জ্ঞানপিপাসু সাধারণ মানুষেরও কৌতূহলের শেষ নাই। সুতরাং দু্ই বত্সরের লাগাতার পর্যবেক্ষণের পর গত বুধবার যখন সর্বগ্রাসী কৃষ্ণগহ্বরের ছবি প্রকাশ করা হইল, তখন তাহা স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বব্যাপী প্রবল সাড়া ফেলিল। বলা যায়, সাফল্যের অন্ধকারে ডুব দিয়া গহীন আঁধার ছেঁচিয়া তুলিয়া আনা হইল সৃষ্টি রহস্যের অজানা মণিমুক্তা। নিউটনের তত্ত্বকে নস্যাত্ করিয়া আইনস্টাইন যেই ‘থিয়োরি অফ রিলেটিভিটি’ তত্ত্ব প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাহারই বাস্তবিক প্রমাণ মিলিল।

কৃষ্ণগহ্বরের এই ছবি তুলিবার নেপথ্যে সকল বিজ্ঞানীকে অভিনন্দন জানাই। বিশেষভাবে অভিনন্দন রহিল ২৯ বত্সর বয়সী কেটি বাউম্যানের জন্য, যাহার নিষ্ঠা ও অবদান অতুলনীয়।