অধ্যাপক (ডা) কাজী মনজুর কাদের
ক্যান্সার! শোনার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে যায় এবং নিশ্চিত মৃত্যু বলে মনে করে। আসলে তা ঠিক নয়। এ রোগ যদি সূচনায় ধরা পড়ে এবং সময়মতো চিকিত্সা দেওয়া যায় তাহলে এক-তৃতীয়াংশ সমপূর্ণভাবে নিরাময় করা যায়। বাকি এক-তৃতীয়াংশ চিকিত্সার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাকি এক-তৃতীয়াংশ অনেক দেরিতে ধরা পড়ে বলে নিরাময় বা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক চিকিত্সা পদ্ধতির মাধ্যমে উপশম করা যায়। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং ক্যান্সার সমপর্কে ধারণা দিতে হবে। তবে এটা ঠিক, ক্যান্সার চিকিত্সা ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি।
স্তন ক্যান্সার মহিলাদের অন্যতম প্রধান ক্যান্সার। আমাদের দেশে যতটুকু তথ্য উপাত্ত আছে তাতে দেখা যায় ব্যাপকতার দিক দিয়ে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের সমান্তরালে এর অবস্থান। পৃথিবীতে অনেক দেশেই মহিলাদের এক নম্বর ক্যান্সার হলো ব্রেস্ট ক্যান্সার এবং সাধারণত প্রতি এক লাখ মহিলার মধ্যে আশি জনের বেশি প্রতিবছর আক্রান্ত হন। আমাদের দেশে সকল মহিলা ক্যান্সার রোগীর প্রায় ২০-২৫ শতাংশই স্তন ক্যান্সার। সাধারণত স্তনের দুগ্ধবাহী নালীতে হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি স্তনের অন্যান্য কলা থেকেও শুরু হতে পারে। এটি পিন্ড বা চাকা হিসেবেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম ধরা পড়ে এবং ধীরে ধীরে বড় হয় এবং শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। স্তনের সঙ্গে নিকটস্থ বাহুমূলের লসিকা গ্রন্থিগুলোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় এগুলোতে টিউমার ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিক। স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয়ের জন্য একটি কার্যকরী পদ্ধতি হলো নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করা (Breast Self Examination: BSE)। প্রতিটি মহিলাই যদি প্রতিমাসে নিজের স্তন মাসিক হওয়ার পর পরই একটি নির্দিষ্ট দিনে ভালভাবে পরীক্ষা করেন তাহলে যে কোন ধরনের অসামঞ্জস্য ও অসুবিধা নিজেই চিহ্নিত করে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে পারবেন। নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করার ধাপ রয়েছে সেই মোতাবেক পরীক্ষা করাই শ্রেয়। ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য সাধারণত সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন:
* স্বাস্থ্য শিক্ষা ও প্রচারের মাধ্যমে, * নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষার অভ্যাস গড়ে তোলা,
* চিকিত্সক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা স্তন পরীক্ষা করানো নিডল বায়োপসি/এফ এ নিসি/টিস্যু বায়োপসি করে রোগ নির্ণয় করা হয়। * আন্ট্রাসনোগ্রাফি/ম্যামোগ্রাফি (প্রয়োজনে)।
স্তন ক্যান্সারের চিকিত্সা : এই চিকিত্সা সমন্বিত ও বহুমাত্রিক চিকিত্সা পদ্ধতি। শল্য চিকিত্সা, রেডিওথেরাপি (বিকিরণ চিকিত্সা), কেমোথেরাপি, হরমোন, চিকিত্সা, ইমিউনোথেরাপি, টারগেটেড থেরাপি সমন্বিতভাবে প্রদান করা যায়। এই রোগের মূল লক্ষ্য দুইটি (১) মূল টিউমার অপসারণ এবং (২) সামগ্রিক চিকিত্সা প্রদান।
শল্য চিকিত্সা (সার্জারি): সার্জারি স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অন্য যে কোনো চিকিত্সার চেয়ে রোগীকে বেশি আরোগ্য করে। যদি টিউমার স্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, শরীরের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়া টিউমারের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা নগণ্য।
রেডিওথেরাপি : এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য মূল টিউমার এলাকা। সাধারণত অপরেশনের পরও চোখে দেখা যায় না যদি এমন কিছু কোষ থেকে থাকে, তখন সহায়ক চিকিত্সা হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে। অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে রেডিওথেরাপি দেওয়া যায় বলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।
ক্যান্সার সমপর্কে সাধারণ জ্ঞান বিশেষ করে এর কারণসমূহ ও কিভাবে প্রতিরোধ ও চিকিত্সা সম্ভব, সে সমপর্কিত প্রচার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহে। সামাজিক বাধা ও লাজলজ্জা দূর করে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিত্সা করতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা। মহিলাদের রোগ চিকিত্সায় সময়মতো উদ্যোগী হওয়া এবং অবহেলা না করা। নির্ণীত রোগীর ক্ষেত্রে সামাজিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে তার পক্ষে নৈতিক ও সামাজিক সমর্থন জোরদার করা। সহিষ্ণুতা, সহযোগিতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি ক্যান্সার নিরাময়ে সহায়ক।
লেখক :বিভাগীয় প্রধান, অনকোলজি, ডেলটা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল