মোজাম্মেল হক
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে পরপর তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে। তার পরই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য উদ্যোগ নেয় সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে পাঁচ ধাপে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় ফোরামে আলাপ-আলোচনা করে তাদের দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় তৃণমূলের নেতাকর্মীর কাছে। তারপর থেকেই তৃণমূল তাদের প্রার্থী যাচাই-বাছাই করে একাধিক প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে দলীয় সভানেত্রীর কার্যালয়ে পাঠায়। দলীয় সভানেত্রীর কার্যালয় থেকে পুনরায় যাচাই-বাছাই করে দলীয় প্রতীক নৌকা মার্কার প্রার্থী নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ফলে মনোনয়ন বঞ্চিতদের মাঝে বিরাজ করে ক্ষোভ ও হতাশা। ক্ষোভ ও হতাশাগ্রস্ত মনোনয়ন বঞ্চিতরা দলীয় নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে ক্ষমতাসীনদের মাঝে চলে ভোটবিভক্তি। এই বিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে দলীয় কোন্দল। বিদ্রোহী প্রার্থীরাও তাদের মতো করে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই অবস্থা দেশের অন্যান্য পৌরসভা-সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। স্থানীয় সরকার নির্বাচন পৃথিবীর অনেক দেশেই দলীয়ভাবে হয়। কিন্তু এমনভাবে নয় যে, রাজনৈতিক দল শুধু একজন প্রধান ব্যক্তিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে তার দলীয় লোক হিসেবে। এমন পদ্ধতি দিয়ে কোনো নির্বাচনই উত্সবমুখর করা সম্ভব হবে না। এমনকি হচ্ছেও না।
স্থানীয় পর্যায়ের উপযুক্ত লোক যদি নির্বাচনে কোনো কারণে অংশ নিতে না পারেন, তাহলে এসব নির্বাচনে শুধু দল করে, পেশি আর অর্থশক্তি আছে, এমন ব্যক্তিরাই দখলে রাখবেন। দলেরও অনেক যোগ্য প্রার্থী এঁদের কারণে নির্বাচন করতে পারবেন না। এমনিতেই অন্যতম একটি রাজনৈতিক দল দলীয় সরকারের অধীনে উপজেলা নির্বাচন না করার সিদ্ধান্তে অনড়। এদিকে চতুর্থ ধাপ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় জনগণের মধ্যে উত্সাহ-উদ্দীপনা কম এমনকি নির্বাচনের দিন ভোটার উপস্থিতিও ছিল তুলনামূলক কম। ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগিয়ে। পিছিয়ে নেই বিদ্রোহী প্রার্থীরাও। সমান তালে পাল্লা দিয়ে তাঁরাও বিজয়ী হয়েছেন।
দেশজুড়ে উপজেলা নির্বাচনের ভোট চলছে কয়েকটি ধাপে। কিন্তু ভোটের দামামা বলতে যা বোঝায় তা এখনো পর্যন্ত দৃশ্যত বেশি দেখা যায়নি। সাধারণ ভোটারদের দিক থেকে কেমন এক নিরাসক্ত আয়োজন এই ভোট। বর্তমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দেখা যায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। কাজেই জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলনের লক্ষ্যে জননেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় প্রতীক না দিয়ে সকলের জন্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য উন্মুক্ত প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। যেমনটি হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান গোপালগঞ্জের ক্ষেত্রে। উন্মুক্ত এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে একাধিক ব্যক্তি একে ওপরের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। জয়ীরা সবাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত নেতা। গোপালগঞ্জের নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, উন্মুক্ত প্রতীকের নির্বাচনে দল মত নির্বিশেষে উত্সবমুখর ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভোটার উপস্থিতিও ছিল অনেক। সেখানকার জনগণ ব্যাপক উত্সাহ ও উদ্দীপনার মাঝে ভোট দিয়ে তাঁদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত করেছেন। একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে লড়ে জানান দিয়েছেন নিজের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তাকে। কাজেই আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারকে ব্যাপক প্রস্তুতি হাতে নিতে হবে। আগে থেকেই তৃণমূলে ঘোষণা দিতে হবে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে উন্মুক্ত প্রতীকে। যে নির্বাচন হবে যে কারো জন্য উন্মুক্ত। দলীয় প্রতীকবিহীন নির্বাচন হবে অংশগ্রহণমূলক। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে মনোনয়ন বঞ্চিতদের মাঝে কোনো প্রকার ক্ষোভ থাকবে না। বাড়বে বন্ধুত্ব ও সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক। জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণে উত্সবমুখর হয়ে উঠবে আমাদের দেশের নির্বাচনীব্যবস্থা।
কিশোরগঞ্জ