শৈত্যপ্রবাহ থাকতে পারে আরো তিন দিন

চট্টগ্রাম বাদে সারা দেশের ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা আবহাওয়া অফিস জানায়, রাজশাহী, পাবনা,  দিনাজপুর  ও  কুষ্টিয়া  অঞ্চল সমূহের  উপর দিয়ে  তীব্র  শৈত্য  প্রবাহ  বয়ে  যাচ্ছে। আর শ্রীমঙ্গল  ও  সীতাকুন্ড  অঞ্চলসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগ  এবং রাজশাহী,  রংপুর ও খুলনা বিভাগের অবশিষ্টাংশের ওপর দিয়ে বইছে মৃদু থেকে  মাঝারী ধরনের শৈত্য প্রবাহ এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশে মাঝারী থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং তা কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল দিনাজপুরে ৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়া অফিসের কর্তব্যরত পূর্বাভাস কর্মকর্তা জানান, জানুয়ারি শীতলতম মাস। এ সময় শৈত্যপ্রবাহ স্বাভাবিক। চলতি শৈত্যপ্রবাহ আগামী বুধবার অব্যাহত থাকতে পারে। জোরাল পশ্চিমী ঝঞ্ঝার কারণে কনকনে ঠান্ডা বাতাস হু হু করে ধেয়ে আসায় তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে মৃদু, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে মাঝারী ও ৬ ডিগ্রির নীচে নামলে আমরা তাকে তীব্র শৈত্য প্রবাহ বলে থাকি।

শৈত্য প্রবাহ বয়ে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। ঘন কুয়াশায় যানবাহন ও নৌ ও বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে খেতের ফসল। কাজে যেতে পারছেন না শ্রমজীবী মানুষ। শীতার্ত মানুষ ভিড় করছেন গরম কাপড়ের দোকানে। অনেক জায়গায় স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে।

স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর থেকে জানান, গত কয়েকদিন থেকে ক্রমেই নেমে আসছে তাপমাত্রা। বাড়ছে শীতের তীব্রতা। তীব্র শীতে কাহিল হয়ে পড়েছে মানুষ। তীব্র শীতে ছিন্নমুল ও অসহায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।               প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে সন্ধ্যা হলেই শহর ও গ্রামাঞ্চলের রাস্তঘাট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না মানুষ।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, পাবনার ঈশ্বরদীতে রবিবার ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে স্থানীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কাজের উদ্দেশ্যে শহরে এসে প্রচন্ড শীতের মধ্যে দুর্ভোগে আছেন।

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, রাজশাহীতে তাপমাত্রার আরো কমেছে। এতে জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না কেউ। খড়-কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন অনেকেই। তবে শ্রমজীবী মানুষ পড়েছেন বেশ বেকায়দায়। শনিবার ভোরে রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিলো ৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে রবিবার ভোরে তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রবিবার দুপুর ১টা নাগাদ রাজশাহীতে সূর্যের মুখ দেখা যায়। কয়েকটি স্কুলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তীব্র শীতের কারণে স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিত্সকরা জানাচ্ছেন, শীতের কারণে হাসপাতালে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।

রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০, ২৪, ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে শিশু রোগীদের ভর্তি করা হয়। এই চার ওয়ার্ডে ১২০টির মতো শয্যা আছে। তবে এখন শিশু রোগী ভর্তি আছে চারশোরও বেশি।  প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০জন শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের রোগীরা ভর্তি হচ্ছে চিকিত্সার জন্য।

জেলার বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও শিশু রোগীর চাপ বেড়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় সেখানে রোগ সারানোর চেষ্টা চলছে। সম্ভব না হলে রোগিদের রামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। বাইরের অন্য কয়েকটি জেলা থেকেও রামেক হাসপাতালে রোগী আসছে। বহু সংখ্যক শিশু রোগি ভর্তি আছে নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে। রবিবার দুপুরে রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ওয়ার্ড বেশ শিশু রোগী।

কুষ্টিয়া সদরের কুমারগাড়া থেকে দুই মাস বয়সি শিশু আলিফ হোসেনের চিকিত্সা করাতে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে এসেছেন বাবা মনির খান শিমু। তিনি জানান, ১০ দিন হলো নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে আলিফ। চিকিত্সা করেও রোগ সারছে না। এখন দেখা দিয়েছে খিঁচুনি।

হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিত্সক ডাক্তার শিমুল জানান, শীতে ঠান্ডা লেগে শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিউলাইটিস রোগে। নিউমোনিয়ার প্রকোপ শিশুদের মাঝে সারা বছর কমবেশি দেখা গেলেও ব্রঙ্কিউলাইটিসের প্রকোপ তেমন থাকেনা। কিন্তু শীতে রেসপিরেটরি সিনসেটিয়াল ভাইরাস (আরএসবি) ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে সংক্রমণজনিত এই রোগটির প্রকোপ হঠাত্ করে বেড়ে গেছে।

জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান,  গত দু’দিনে ঘন কুয়াশা ও শীতের তীব্রতা বেড়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে যানবাহন চলাচল করছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। শীতের তীব্রতা থেকে বোরো বীজতলা রক্ষার জন্য পলিথিনে ঢেকে রাখা হচ্ছে ক্ষেত। লেটব্রাইট নামক এক প্রকার ছত্রাকের আক্রমণ থেকে আলু ক্ষেত রক্ষার জন্য কৃষি বিভাগ কৃষকদের সতর্ক করছে।

সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা কনকনে ঠান্ডায় কাঁপছে নীলফামারীর সৈয়দপুরের জনপদ। দুদিন ধরে সূয়ের দেখা নেই। কুয়াশার কারণে মহাসড়কে ফগলাইট (কুয়াশা) জ্বালিয়ে ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করছে। সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকেও যাত্রবাহী বিমানগুলো কুয়াশার কারণে বিলম্বে অবতরণ ও উড্ডয়ন করছে। সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে শীতজনিত রোগে ২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল রবিবার দিনভর দেখা মেলেনি সূর্যের। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কুয়াশার চাদরে ঢেকেছিল রংপুরের রাস্তা-ঘাট। হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করেছে যানবাহন। সড়কগুলো ছিল প্রায়ই জনশূন্য। অব্যাহত ঘন কুয়াশা ও কনকনে হিমেল হাওয়া এবং সূর্যের দেখা না মেলায় তীব্র ঠান্ডায় মানুষের পাশাপাশি কাবু হয়ে পড়েছে গবাদী পশু ও পাখি। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। গতকাল রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে প্রচন্ড শৈত্য প্রবাহে কারণে শ্রমজীবি মানুষ কাজে যেতে পারছে না। দেখা মিলছে না সূর্যের। ঘন কুয়াশার কারণে গাইবান্ধার ঘাঘট, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনাসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে নৌ চলাচল ব্যহূত হচ্ছে। দিনের বেলাতেও সড়ক পথে যানবাহন চলাচল করছে হেড লাইট জ্বালিয়ে। স্কুল, কলেজ মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী উপস্থিতি সংখ্যা খুবই কম। লোক সমাগম না থাকায় শহর, হাট-বাজার ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে স্থবিরতা। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা। প্রচন্ড শীতের কারণে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক শিশু ভর্তি হয়েছে। এছাড়া ঘন কুয়াশা ও শীতের কারণে বোরো বীজতলা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে পড়েছে। শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবে জেলার হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে।

এছাড়া ঈশ্বরদী (পাবনা), সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা), মহাদেবপুর (নওগাঁ), ঝিনাইগাতী (শেরপুর), বীরগঞ্জ (দিনাজপুর), বদরগঞ্জ (রংপুর), নরসিংদী, বদলগাছী (নওগাঁ), তেতুলিয়া (পঞ্চগড়), ধামইরহাট (নওগাঁ), গঙ্গাচড়া (রংপুর) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা শৈত্যপ্রবাহ ও মানুষের কষ্ট নিয়ে সংবাদ পাঠিয়েছেন।

ইত্তেফাক/নূহু