ইত্তেফাক ডেস্ক
আর মাত্র এক দিন পরেই বাঙালির প্রাণের উত্সব নববর্ষ। নববর্ষকে বরণ করতে চলছে বিভিন্ন প্রস্তুতি। জাতীয় জীবনের এই দিনটিকে বরণ করতে আগ্রহের কোনো কমতি নেই দেশের গ্রামীণ জনপদেও। চৈত্র সংক্রান্তি থেকে পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে বিভিন্ন স্থানে চলবে বৈশাখী মেলা। একসময় এসব মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল মাটির তৈরির বিভিন্ন খেলনা সামগ্রী এবং তৈজস পাত্র। আর এসব মাটির জিনিস তৈরিতে পুরো চৈত্রমাস জুড়ে পালপাড়ার লোকজন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
হাতি-ঘোড়ায় রঙ-তুলির আঁচড়
ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ): ফুলবাড়িয়া উপজেলায় ৫/৬টি পালপাড়া রয়েছে। তবে পালপাড়ার বর্তমান প্রজন্ম হাতি-ঘোড়া তৈরির পেশায় নেই। দিনের পর দিন পালপাড়ায় কমছে মৃিশল্পীর সংখ্যা। এক সময় প্রতিটি পালপাড়া থেকে মাটি পোড়ার গন্ধ পাওয়া যেত কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে। এখন পালদের চুল্লি জ্বলে বছরে এক থেকে দুইবার। টিকে থাকা পালপাড়ার মৃিশল্লীরা এখন ব্যস্ত বৈশাখ নিয়ে। রাতদিন চলছে হাতি-ঘোড়া তৈরির কাজ। কেউ আবার ভিন্নতার জন্য তৈরি করছেন সখের ফুলদানিসহ নানা মাটির পণ্য। পালদের তৈরি মাটির পণ্য দখল করেছে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম। মাটির তৈরি খেলনা বিশেষ করে পুতুল হাতি-ঘোড়া বেশি বিক্রি হয় বৈশাখী মেলাতে। রঙের পালাও শেষ।
ঝড়-বৃষ্টিতে কুমারপাড়ায় থমকে গেছে কাজের গতি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে প্রাণের স্পন্দন নেই কুমার পাড়ায়। ঝড়-বৃষ্টির কারণে কুমার পাড়ায় থমকে গেছে কাজের গতি। বর্ষবরণকে সামনে রেখে প্রতিবছর এ সময় মৃিশল্পীরা ব্যস্ত সময় পাড় করলেও বিরূপ আবহাওয়ায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম। আসন্ন বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে মাটির পুতুল, নৌকা, চুলা কলসিসহ বিভিন্ন খেলনা সময়মত শুকাতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন তারা।
বাঁশির গ্রাম শ্রীমদ্দি
হোমনা (কুমিল্লা): উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রামটি জেলায় বাঁশির গ্রাম হিসেবেই পরিচিত পেয়েছে। সারা বছর ধরেই এখানকার কারিগরেরা বাঁশি তৈরি করেন। তবে তাদের উত্পাদন ও বিক্রির প্রধান লক্ষ্য থাকে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটি। বৈশাখ এলেই শ্রীমদ্দি গ্রামের কারুশিল্পীদের মুখে হাসি ফুটে। ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ গ্রামে বাঁশি তৈরি হচ্ছে বলে জানান, গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান মোল্লা। বর্তমানে ৩০টি পরিবার এ শিল্পটিকে ধরে রেখেছেন। এসব বাঁশির দাম ডিজাইন ও গুণাগুণ ভেদে পাঁচ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
জায়গা করে নিয়েছে দইয়ের শরা-হাঁড়ি
বগুড়া: মাটির তৈরির বিভিন্ন খেলনা তৈরিতে বেশি সময় ব্যয় না করে দইয়ের হাঁড়ি, শরা ও খুঁটি তৈরিতে সময় কাটান। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া পালপাড়ায় ১১০টি পরিবারের বসবাস। প্রত্যেক পরিবারেই কেউ না কেউ ধরে রেখেছেন তাদের বাপ-দাদার আদি ব্যবসা। মৃিশল্পের কাজ চলছে ঘরে ঘরে; কিন্তু পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কাজ নেই বললেই চলে। পুরো পালপাড়া ঘুরে মাত্র একটি বাড়িতে দেখা পাওয়া যায় বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন শো-পিস তৈরি করতে। উদয়ন ভিলা নামের ওই বাড়িতে নারী-পুরুষ সমান তালে কাজ করছেন বিভিন্ন ধরনের শো-পিস তৈরিতে। তবে পহেলা বৈশাখ এগিয়ে আসায় এখন চলছে রকমারি ডিজাইনে রঙের কাজ।
খেলনা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা
সৈয়দপুর (নীলফামারী): ঘুম নেই নীলফামারীর সৈয়দপুরের পালপাড়ার মৃিশল্পীদের ও খেলনা তৈরির কারিগরদের চোখে। রাতদিন সমানতালে রঙ করে চলেছেন মাটির খেলনাগুলোতে। আসছে বৈশাখকে ঘিরে তাদের এই আয়োজন। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি— পরিবারের সবাই মিলে গড়ছেন মাটির গাছ, পাখি, ফুল, ফুলের টব, ব্যাংক, ফলমূল আর কত কী? এসব রঙ করার দায়িত্ব পেয়েছেন কেউ কেউ। স্প্রে মেশিনে মনের মাধুরী মিশিয়ে রঙ ছড়াচ্ছেন তারা মাটির খেলনাগুলোতে। অপরদিকে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে নীলফামারীর সৈয়দপুরে মাটি, কাঠ ও প্লাস্টিকের তৈরি খেলনার কারিগররা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় ও দেশের সর্বত্র সরবরাহের চাহিদা মেটাতে দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না তারা। তবে এ উত্সবকে ঘিরে সংসারের ব্যয় মিটিয়ে সঞ্চয়ের লক্ষ্যে সামান্য পুঁজি দিয়েই নতুন স্বপ্নে বিভোর এ শিল্পের কারিগররা। এ শিল্পের প্রসারে অর্থ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো বলে জানান তারা।
কাউখালীতে ব্যস্ত সময় পার করছে মৃিশল্পীরা
কাউখালী (পিরোজপুর): কাউখালীতে বৈশাখকে কেন্দ্র করে চলছে নানা আয়োজন। মেলাকে সামনে রেখে কাজের চাপে ব্যস্ত সময় পার করছে কাউখালীর উত্তর বাজার ও সোনাকুর গ্রামের মৃিশল্পীরা। আট বছরের শিশু সুমন পাল থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ্ব সুধির পাল পর্যন্ত সকলেই কাজে মহাব্যস্ত। বানানো শেষ হাতি, ঘোড়া, হরিণ, বাঘ, গরু। পঙ্খিরাজে যুবরাজ। আরো কত কিছু। পাল পাড়ার মানুষের তাই ব্যস্ততার কমতি নেই।
হাতে খড়ি দিচ্ছে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম
আগৈলঝাড়া (বরিশাল): বৈশাখী মেলায় মাটির খেলনা ও তৈজসপত্র বিক্রির প্রস্তুতি নিতে চৈত্র মাসের শুরু থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন উপজেলার একমাত্র গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামের পাল পাড়ার মৃিশল্পীরা। স্বামীর কাজে সহযোগিতা করতে ঘরে বসে নেই ওই পল্লির নারী শিল্পীরাও। অবসরে বৈশাখী মেলার খেলনা তৈরির মাধ্যমে হাতে খড়ি দিচ্ছে পালপাড়ার ভবিষ্যত্ প্রজন্মের শিশুরাও। কুমার পাড়ার শিল্পীরা খেলনায় হরেক রকম ডিজাইন আর বাহারি রঙের ছোটো-বড়ো খেলনা তৈরিতে এখন মহাব্যস্ত রয়েছেন। পহেলা বৈশাখ থেকে পুরো মাস জুড়ে এমনকি গ্রীষ্মকাল জুড়েই চলবে তাদের এই খেলনা ব্যবসা।