ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির শরীরে নির্মমভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পাঁচদিন পর তার মৃত্যুতে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে গোটা দেশ। নৃশংসতার ধরণে হতবাক, কিংকর্তব্যবিমূঢ় সবাই। তবে একসময় সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে খ্যাত ফেনীতে নৃশংসতা কিন্তু নতুন নয়। এই জেলা একসময় ‘মৃত্যুউপত্যকা’ ও ‘লেবানন’ বলেও দেশে-বিদেশে পরিচিতি পেয়েছিল। ২০১৪ সালের ২০ মে ফেনী শহরেই ফুলগাজী উপজেলার তত্কালীন চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হককে দিনে-দুপুরে গুলি করে ও গাড়িসহ পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা এখনও দগদগে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসন ও রাজনীতির ছত্রছায়ায় যুগ যুগ ধরে ফেনীতে সন্ত্রাসীরা নির্মমতা ও হিংস্রতার যে বিষবৃক্ষ রোপণ করে গেছে, সেটি পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি বলেই এর সর্বশেষ বলি হতে হয়েছে নুসরাতকে।
২০১৪ সালের ২০ মে সকাল সাড়ে ১০টায় ফেনী শহরের মাস্টার পাড়ার বাসা থেকে গাড়িতে করে ফুলগাজী যাওয়ার পথে একাডেমি এলাকার বিলাসী সিনেমা হলের সামনে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গাড়ি আটকে দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করে পুড়িয়ে হত্যা করে একরামকে। হত্যাকাণ্ডের হিংস্রতা ও বীভত্সতা সেদিনও স্তব্ধ করে দেয় দেশবাসীকে। এবার নুসরাতের ঘটনাও নাড়া দিয়েছে সারা দেশের মানুষকে।
সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে একসময় সারাদেশে আলোচিত হওয়া ফেনীতে রাজনৈতিক হত্যা, গুম, অপহরণ, দিনে-দুপুরে অস্ত্র উঁচিয়ে ছিনতাই, টেন্ডারবাজি, বালুমহাল লুট, বাসস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারে অস্ত্রের প্রকাশ্য মহড়া, সোনার দোকানে ডাকাতি, ব্যাংকের টাকা ছিনতাই ছিল এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ও সন্ত্রাসের গডফাদারদের সন্ত্রাসযজ্ঞের বিরোধিতা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরই প্রাণভয়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে যেতে হয়েছে- গত দুই দশকের খতিয়ান ওল্টালে এমন ঘটনাও পাওয়া যাবে ভুরি ভুরি। প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর নৃশংসভাবে হত্যার জন্য এখানে একসময় নির্ধারিত ছিল ‘মৃত্যুকূপ’।
ড্রিল মেশিন দিয়ে মানুষকে ছিদ্র করে মেরে ফেলার রেকর্ডও রয়েছে ফেনীতে। একটা সময় ছিল, ফেনীতে মানুষ কথা বলতো ফিসফিসিয়ে। সন্ধ্যার পর অনেকে ভয়ে বাড়ি থেকে বের হতেন না। ৯৭ সালের ২৫ মার্চ তুষার নামে একজনকে ড্রিল মেশিন দিয়ে ছিদ্র করে হত্যা করা হয়। একই বছরের ২৭ মার্চ শহরের ট্রাংক রোডে নাছির, ৯৮ সালে নূর নবী, রতনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সুমন নামে একজনকে পেট্রোবাংলা এলাকায় জবাই করে হত্যা করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে হত্যার শিকার হন জাকির, বশির, মান্নান, মুন্নাসহ অনেকে।
ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার চন্দ্রপুরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল চারজনকে। যেই সোনাগাজীতে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হয়েছে, এই সোনাগাজীর চর ইঞ্জিমান এলাকায় একসময় হত্যা করে কয়েকজনের লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। ফেনীর লেমুয়ায় যুবদল নেতা আবুল কালামের মস্তকবিহীন লাশ এবং শহরের বিসিক এলাকা থেকে অপহরণ হওয়া যুবলীগ নেতা শহীদুল আলমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল ২০১৪ সালে। একই বছরে গুম হওয়া মাহবুবুর রহমান রিপন ও কৃষক ইউসুফ মিয়ার হদিস মেলেনি আজও।
২০১৪ সালে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার মুহুরীগঞ্জে শাহীনুর আলম সুমন (২৫) ও ফেনী পৌরসভার পাঠনাবাড়ি সড়কে ব্যবসায়ী আবুল হাসান মো. কায়সার (২৮) খুন হন। একই বছরে ফেনী পৌরসভার বারাহীপুরের শহীদুল ইসলাম অমল, ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের পশ্চিম মধুগ্রামে মো. ছিদ্দিক (২৮), দাগনভূঞা উপজেলার রামনগর ও বরইয়া গ্রামের সীমানায় এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সরকারি হিসাব মতে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ফেনীতে খুন হয়েছে ৭০ জন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত খুন হয় ১৫০ জন।