কেশবপুর উপজেলার জলাবদ্ধতা নিরসনে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ কাজ সম্পন্ন হলে আগামী ৫ বছর কেশবপুর উপজেলা বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি ২৪নং পোল্ডারের আওতায় কেশবপুর ও মনিরামপুর উপজেলার ২৯ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমি নতুন করে ফসল আবাদের আওতায় আসবে।
এ প্রকল্পে ৩টি নদী পুনর্খননে ৪০ কোটি ৯৭ লাখ ৬ হাজার টাকা, ৭টি সংযোগ খাল পুনর্খননে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা, নদী ও খাল রক্ষণাবেক্ষণে ১ কোটি টাকা, ৯টি স্লুইচগেট মেরামতে ৯০ লাখ টাকা ও কাশিমপুর নামকস্থানে ৩টি ক্লোজার নির্মাণে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ৪২ কিলোমিটার হরিহর নদী দিয়ে ঝিকরগাছা, যশোর সদর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বর্ষার অতিরিক্ত পানি ও ৩২ কিলোমিটার বুড়িভদ্রা নদী দিয়ে ত্রিমোহিনী, সাতবাড়িয়া, কেশবপুর সদর, মজিদপুর, বিদ্যানন্দকাটি ও মঙ্গলকোট ইউনিয়নের বর্ষার অতিরিক্ত পানি আপারভদ্রা নদী দিয়ে শ্রীহরি নদীতে নিষ্কাশন হয়ে থাকে। পলিতে ৩টি নদীই ভরাট হয়ে গেছে। আবার বিগত সময়ে ঘ্যাংরাইল বেসিংয়ের আওতাভুক্ত শ্রীহরী, হরিহর, আপারভদ্রা ও বুড়িভদ্রা নদীকে পলির হাত থেকে রক্ষায় কেশবপুরের সাবেক সংসদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেকের উদ্যোগে আপারভদ্রা নদীর কাশিমপুর নামকস্থানে প্রতিবছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সাময়িক ক্রসবাঁধ দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ওই স্থানে ক্রসবাঁধ দেয়া হতো এবং জুনের শেষের দিকে তা অপসারণ করা হতো। এ বাঁধ নির্মাণে সরকারের ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা খরচ হলেও এ উপজেলার নদ-নদীগুলো পলি উঠে ভরাট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেত। কিন্তু গত ৫ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড ওই স্থানে ক্রসবাঁধ দেয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে ঘ্যাংরাইল বেসিংয়ের আওতাভুক্ত নদ-নদীগুলো পলিতে ভরাট হতে থাকে। পাশাপাশি ২৪নং পোল্ডারের আওতাধীন ১৭টি স্লুইচগেটের দু‘পাশই পলিতে ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে যায়। যার কারণে গত ২ বছর ধরে ভাটি অঞ্চলের এ কেশবপুর উপজেলা প্লাবিত হচ্ছে।
গত বছরের ১৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রবল বর্ষণ, উজানে হরিহর ও বুড়িভদ্রা নদীর উপচে পড়া পানিতে কেশবপুর পৌরসভাসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৮০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের সদিচ্ছায় দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্যে ৩টি ভাসমান এস্কাভেটর যন্ত্র দিয়ে হরিহর, আপারভদ্রা ও বুড়িভদ্রা নদীর পলি অপসারণে পাইলট চ্যানেলের কাজ শুরু হয়। যার কারণে শহরের প্রধান সড়কগুলোর পানি নেমে যায়। তবে ঘেরের কারণে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা স্থায়ী আকার ধারণ করে। ফলে বাড়িঘর ছাড়া মানুষের ঈদ অানন্দ রাস্তায় করতে হয়। এ সমস্যা নিরসনে গত বছরের ৩ আগস্ট উপজেলা পরিষদ হল রুমে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, এনজিও ও সুশীল সমাজের নেতাদের সাথে বন্যা পরবর্তী করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা করেন। এ সময় তিনি যে সমস্ত ঘেরের কারণে পানি প্রবাহে বাঁধার সৃষ্টি হচ্ছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনাসহ শীতের শুরুতে নদী খননের ঘোষণা দেন। কিন্তু তার এ নির্দেশনা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
কেশবপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯.৫ কিলোমিটার হরিহর নদী পুনর্খননে ২৭ কোটি ৮৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, ১৫ কিলোমিটার আপারভদ্রা নদী পুনর্খননে ১০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ও বুড়িভদ্রা নদী পুনর্খননে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া নদীর সংযোগ খালগুলোর মধ্যে ১ কিলোমিটার কন্দর্পপুর খাল কননে ৯ লাখ টাকা, ৩ কিলোমিটার বড়পিট খাল খননে ৭৬ লাখ টাকা, ১.৫ কিলোমিটার গরালিয়া খাল খননে ৪৩ লাখ টাকা, ৩ কিলোমিটার পাথরা খাল খননে ৫৬ লাখ টাকা, ৩ কিলোমিটার বুড়ুলিয়া খাল খননে ৯১ লাখ টাকা, ১.৫ কিলোমিটার আগরহাটি খাল খননে ৫২ লাখ টাকা ও ৩ কিলোমিটার ডহুরী খাল খননে ৯৮ লাখ টাকার বরাদ্দপত্র দেয়া হয়েছে। এছাড়া নূরানিয়া, গরালিয়া, বুড়ুলী, পাথরা, মধ্যকুল, খোজাখারি, জামলা, আগরহাটি ও ভরতভায়না স্লুইচগেট মেরামতে ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরে ৫৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী ও খাল রক্ষণাবেক্ষণে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
কেশবপুর পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতা অ্যাডভোকেট আবুবকর সিদ্দিক বলেন, এ প্রকল্প সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, প্রয়োজনে স্থানীয় মনিটরিং কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। নদী থেকে পানি যাতে লোকালয়ে ঢুকতে না পারে সেজন্যে নদীর দু‘পাড়ে বাঁধ দিতে হবে। এ প্রকল্প শীতের ভেতরই শুরু করতে হবে। তা না হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে আবারও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
খুলনা-যশোর পানি ব্যবস্থাপনা ফেডারেশনের সভাপতি পানি বিশেষজ্ঞ মহিরউদ্দীন বিশ্বাস বলেন, কাশিপুরে ক্রসড্যাম না থাকার কারণে প্রতিবছর এসব নদীতে সাগর থেকে আসা ১৮ লাখ ঘন মিটার পলি জমে। যা অপসারণ করতে গেলে সরকারের ৫৫ থেকে ৬০ কোটি টাকা লাগবে। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে ওই স্থানে ক্রসড্যাম দেয়ার পাশাপাশি টিআরএম চালুর কোন বিকল্প নেই।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, কেশবপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে জরিপ করে একটি প্রস্তাবনা সরকারের উন্নয়মূলক প্রজেক্টে দাখিল করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত সভা হয়ে গেছে। যা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেবে। আগামী ২০ জানুয়ারি অনুমোদন হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কপোতাক্ষ অঞ্চলের মত এ অঞ্চলও বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে।
তিনি আরও জানান, বিশ্বব্যাংকের পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আরও ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নূরানিয়া, বেতাগ্রাম, বগার খাল, কাদার খাল ও বাদুড়িয়া খাল খনন করে ওই এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন করার জন্য প্রস্তাবনা দাখিল করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/আরকেজি