নববর্ষের দিন সামনে রেখে বাঙালি কত আয়োজনই করে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে নিজ বাড়ির মাটির দেয়ালে নানা আল্পনা আঁকছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একটি পরিবার। এবারও বাদ যায়নি নতুন আল্পনা আঁকা। বিভিন্ন প্রকারের পশু-পাখিসহ নানা ধরনের ফুল-উপকরণের ছবি শোভা পাচ্ছে ঘরের বাইরের মাটির দেয়ালে, ঘরের ভিতরের দেয়াল, একমাত্র সিঁড়ি এবং বারান্দাসহ পুরো বাড়ি জুড়ে।
নাচোল উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের টিকোল গ্রামের দরিদ্র দাশু বর্মণের স্ত্রী দেখন বর্মণ ও তাঁর তিন মেয়ের হাতে অ্াঁকা এসব আল্পনা গোটা এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে দাশু বর্মণের বাড়িটি এলাকায় ‘নঁকশাওয়ালা বাড়ি’র খেতাব কুড়িয়েছে। এ খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় দূর দূরান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নাচোলের অজপাড়া গ্রাম টিকোলের ওই বাড়ির আল্পনা দেখতে ভিড় করছে।
রাজশাহী শহর থেকে গোদাগাড়ী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার আমনুরা হয়ে সড়কপথে নাচোলের নিজামপুর ইউনিয়নের টিকোল গ্রামের ‘নঁকশাওয়ালা বাড়ি’তে যাওয়া যায়। এছাড়া তানোরের মুন্ডুমালা হয়েও নাচোলের টিকল গ্রামের ওই বাড়িতে যাওয়া যায়। তানোর হয়ে যেতে সড়ক ভাঙাচোরা হওয়ায় বেশ কষ্টসাধ্য। রাজশাহী থেকে ওই বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। সড়কপথে নাচোল উপজেলা সদরে যাবার ৫ কিলোমিটার আগেই হাতের ডান দিকে আরো ৫ কিলোমিটার দূরের নিজামপুর বাজার হয়ে যেতে হবে নঁকশাওয়ালা বাড়িতে। গ্রামের পাকা সড়ক ধরে গেলে সহজেই চোখে পড়বে দৃষ্টিনন্দন আল্পনা আঁকা বাড়িটি। অবশ্য দাশু বর্মণের স্ত্রীর দেখাদেখি গ্রামের আরো কিছু পরিবার বাড়ির মাটির দেয়ালে আল্পনা আঁকতে শুরু করলেও তা দাশু বর্মণের বাড়ি অধিক দৃষ্টিনন্দন ।
পরিবারের বড় মেয়ে অনিকা বর্মণ বলেন, তাঁর বাবা দাশু বর্মণ (রাজবংশী খত্রিয়) পেশায় কৃষিজীবী। বাড়ির সামান্য জমি আর ৪টি মাটির ঘরই তাদের সম্বল। আজ থেকে ৩৯ বছর আগে থেকে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ের পিড়িতে বসে তার মা দেখন বর্মণ এ বাড়িতে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের আল্পনা আঁকতে শুরু করেন। প্রথমে এ কাজে তাকে অর্থ ও উত্সাহ যুগিয়েছেন দাশু বর্মণ একাই। বর্তমানে দাশু বর্মণ ছাড়াও তাঁর দুই মেয়ের জামাই আর্থিক সহায়তা এবং তিন মেয়ে সরাসরি আল্পনা আঁকার কাজে সহায়তা করছেন।
আলাপে অনিকা বলেন, শুরুতে তার মা, কালো, সাদা ও লালমাটি দিয়ে তৈরি বিশেষ রঙ দিয়ে আল্পনা আঁকতেন। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমানে আল্পনা আঁকার উপকরণের ধরন ব্যাপক পাল্টে গেছে। ১০/১২ বছর ধরে বাড়ির চারটি মাটির ঘরের (একটি দোতলা) দেয়ালে আল্পনার কাজে আধুনিক রঙের সঙ্গে তারা ব্যবহার করছেন বার্নিশ অয়েল এবং এক ধরনের আঠা। এতে আল্পনার উত্কর্ষতাও বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
অনিকা আরো বলেন, তাদের কোনো ভাই নেই । তিন বোনেরও কোনো ছেলে নেই। তাঁর (অনিকা) স্বামী রণজিত্ বর্মণ কীর্ত্তন গেয়ে সংসার চালান এবং তাদের বাড়িতে পহেলা বৈশাখের আল্পনা আঁকায় আর্থিক সহায়তাও করেন। তাদের বড় মেয়ে রিমা বর্মণ এবার নাচোল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। ছোট মেয়ে প্রিয়ন্তি বর্মণের বয়স আড়াই বছর। মেজ বোন স্বামী পরিত্যক্তা বনিকা বর্মণের একমাত্র মেয়ে সাথী পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলের নবম শ্রেণিতে পড়ছে। তার ছোট বোন ববিতা বর্মণের একমাত্র মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। দরিদ্র পরিবারটি মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে সরকার ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের আন্তরিক সহায়তা কামনা করে, জানিয়ে অনিকা বর্মণ জানান, প্রতিদিন আগত অসংখ্য মানুষের ভিড়ে তারা ক্লান্ত। আগতদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কোনো কোনো দিন তারা রান্না খাওয়ারও সময় পান না।