একসময় হাটহাজারীতে প্রচুর খেজুর গাছ ছিল। সড়কের আশপাশে, পুকুর পাড়, খাল-বিল, নদীর পাড়ে, বসতবাড়ি ও বনাঞ্চলে অসংখ্য খেজুরগাছ চোখে পড়তো। শীত মৌসুম শুরু হলেই গাছিরা খেজুর গাছের উপরিভাগ কেটে রস সংগ্রহ করতেন। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই খেজুর রসের মাত্রা ও স্বাদ বেড়ে যেতো। খেজুরের রসকে আগুনে জ্বাল দিয়ে ঘন করে তৈরি করা হতো রাফ। এ রাফের কদরও ছিল বেশ। খেজুরের রস দিয়ে হরেক রকম পিঠা যেমন- ভাবা পিঠা, চিতই, গুঁড়া পিঠা, ছিটকা পিঠা, পাটিসাপ্টা পিঠা খাওয়ার ধুম পড়তো। খেজুরের রস ও রাফ উভয়টা খাওয়ার স্বাদটাই ছিল অন্যরকম। তবে ধীরে ধীরে সেই স্বাদ ভুলতে বসেছে উপজেলার মানুষ। কারণ খেজুরের রস কিংবা রাফ কোনটিই আর আগের মতো পাওয়া যায় না। গত দেড় দশক ধরে হাটহাজারীতে খেজুর গাছ ব্যাপক হারে কমে গেছে। পরিবেশের বিরূপ প্রভাবের কারণে খেজুরের রস কম পাওয়া ও খেজুর গাছকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করায় সাবাড় হয়ে যাচ্ছে একের পর এক খেজুর গাছ। বছরের পর বছর এভাবে চলতে থাকলে এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে খেজুর গাছ।
খবর নিয়ে জানা গেছে, পাহাড় ২৪৫ বর্গ কি.মি আয়তনের হাটহাজারী উপজেলায় এক সময় অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল। তবে বিগত দেড় দশক ধরে সময়ের সাথে খেজুর গাছের সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমে গেছে। চট্টগ্রাম নগরীর সাথে লাগোয়া এ উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নে খেজুরগাছের দেখাই মিলেনা। তবে এখনও মির্জাপুর, ধলই ও ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের কিছু এলাকায় খেজুরগাছ দেখা গেলেও তার সংখ্যা নগণ্য। আবার খেজুর গাছ থেকে রস কম পাওয়ার কারণে অনেকেই রসের জন্য খেজুর গাছ কাটেন না। এদিকে খেজুর গাছ না থাকা ও রস পাওয়া না যাওয়ায় এক শ্রেণির অসাধু মৌসুমে রস বিক্রেতা পার্শ্ববর্তী উপজেলা সীতাকুণ্ড, বাঁশখালী ও মিরসরাই থেকে খেজুরের রসের নামে ভেজাল রস বিক্রি করে মানুষকে ঠকাচ্ছে। তারা প্রতি লিটার খেজুরের রস ৬০ থেকে ৭০ টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে।
উপজেলা কি পরিমাণ খেজুর গাছ রয়েছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান উপজেলা কৃষি ও বন বিভাগের নেই। বিলুপ্তপ্রায় এ খেজুর গাছ জন্মানো এবং রক্ষায় কৃষি ও বন বিভাগের কোন ভূমিকাও নেই। এভাবে চলতে থাকলে একসময় খেজুরগাছ ও গাছের রস পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরব্য উপন্যাসের গল্পের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
সরেজমিন মির্জাপুর ইউনিয়নের চারিয়া আচার্য্য পাড়ার দুলাল আচার্য্যকে (৭২) খেজুরগাছ কাটতে দেখা যায়। কথা হলে তিনি আক্ষেপ করে জানান, ১৫ বছর আগেও এক একটি গাছে ৩ থেকে ৫লিটার রস পড়তো। এখন দশটি গাছ থেকে দশ কেজি রসও পাইনা। তাছাড়া এখন খেজুর গাছও নেই আগের মতো। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের বাসিন্দা মো. সেলিম, মো. শফি জানান, তারা খেজুরের রসের স্বাদ ভুলে যাচ্ছেন।
হাটহাজারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ আবদুল ওয়াহেদ বলেন, খেজুরের রস প্রচুর খনিজ ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। হাটহাজারীতে আগের তুলনায় এখন খেজুরগাছ অনেক কমে গেছে। বাড়ির আনাচে-কানাচে, রাস্তার পাশের পরিত্যক্ত স্থানে পর্যাপ্ত পরিমাণ খেজুর গাছ রোপণ করলে খেজুরের রস ও রাফের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।
ইত্তেফাক/এমআই