২০০৭ সালে এসিডদগ্ধ নারী ও পুরুষদের পুনর্বাসনের আওতায় এসিড সার্ভাইভার্স ফাউন্ডেশনের সহায়তায় গ্রামীণ ফোনের বিভিন্ন পদে চাকরি পান ৬ জন এসিডদগ্ধ। ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল র্যাডিসনে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তত্কালীন কানাডার হাইকমিশনার মিজ বারবারা রিচার্ডসন, রাজকীয় নরওয়েজিয়ান দূতাবাসের ফাস্ট সেক্রেটারি আর্নে হোপ, গ্রামীণ ফোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এরিক অস, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি, গ্রামীণ ফোনের নিউ বিজনেস বিভাগের পরিচালক, এসিড সার্ভাইভার্স ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালকসহ গণ্যমান্যদের উপস্থিতিতে তাদের চাকরি দেওয়া হয়।
চাকরি দেওয়ার ওই অনুষ্ঠানে তত্কালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছিলেন, এসিডদগ্ধদের পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ ও চাকরি প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু চাকরি দেওয়া নয়, পাশাপাশি গ্রামীণ ফোন এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টিতেও কাজ করবে। কিন্তু এ কথা শুনে চাকরি নিয়ে এসিডদগ্ধদের মৃত্যুবরণসহ বর্তমানে চাকরি হারিয়ে ঋণে জর্জরিত হয়ে চরম হতাশায় জীবন-যাপন করতে হচ্ছে তাদের।
গতকাল বুধবার দৈনিক ইত্তেফাকের বরিশাল অফিসে উপস্থিত হয়ে কান্না বিজরিত কণ্ঠে গ্রমীণ ফোনে কর্মরত ১১ বছরের নিজের হতভাগ্য জীবনের বিবরণ দেন কর্মযুদ্ধে থাকা একমাত্র নারী কর্মচারী লুলু মানসুরা। লুলু মানসুরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ১১ বছর পার করা সত্ত্বেও তাকে প্যাকেজের নামে চাকরিচ্যুতিতে বাধ্য করার বিষয়ে সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করে আবেদন করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে এসিডদগ্ধ জীবনে বেকার স্বামী ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে শেষ সম্বল এ চাকরি থেকে অব্যাহতি দিলে কিভাবে বাকি জীবন পার করবেন সে দুঃশ্চিন্তায় দুই চোখে অন্ধকার দেখছেন। কেননা সহায় সম্বল বলতে তার জীবনের একমাত্র ভরসাস্থল গ্রামীণ ফোনের বিরুদ্ধে মামলা করে টিকিয়ে রাখা এ চাকরিটি। সেই চাকরি চলে গেলে সে এবং তার একমাত্র মেয়ের ভাগ্যেও অকালে জীবন হারানো সহকর্মী রেজাউলের ন্যায় মৃত্যুই জুটবে বলে তিনি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে জানান।
লুলু মানসুরা জানান, এইচএসসিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় দুষ্কৃতকারীদের হাতে এসিডদগ্ধ হয়ে ছিলেন। এরপর তিনি দমে না থেকে ডিগ্রি পার্স কোর্সের পড়াশোনা শেষ করেন। পড়াশোনার সুবাদে এবং এসিডদগ্ধ হওয়ায় বেশ কিছু এনজিও এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পেলেও এসিড সার্ভাইভার্স ফাউন্ডেশনের সহায়তায় গ্রামীণফোনের চাকরিটি তার পছন্দ হয়। যোগদানের পর সিনিয়র অফিস সহকারী পদে চাকরি দিয়ে ৬ মাস প্রশিক্ষণ শেষে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচ্যুইটি, পদোন্নতি, মেডিক্যাল ও ইন্স্যুরেন্স, লভ্যাংশ, ডব্লিউপিএফ মোবাইল বোনাসসহ অন্যান্য সুবিধাদির কথা বললেও ১১ বছরে সিকিভাগও জোটেনি এসিডদগ্ধদের। সারাদেশে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায় তাদের এসিডে পোড়া কপালেও নেমে আসে গ্রামীণফোনের হয়রানি, দমন, নিপীড়ন।
লুলু মানসুরা বলেন, তারা একসাথে ৬ জন এসিডদগ্ধ হেড অফিসে যোগদান করেন। তিনি গ্রামীণফোনে চাকরি পাওয়া মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে চাকরি পেয়ে সেখানে যোগদানের জন্য অব্যাহতি নিতে চাইলে তত্কালীন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার দেবাশীষ রায় তার ঐ চাকরির চেয়ে বেশি বেতন-ভাতা দেওয়া হবে বলে জানান। তিনি গ্রামীণফোন কর্তৃক হয়রানির শিকার হয়েছেন যখন বুঝতে পেরেছেন তখন তার সরকারি চাকরির বয়স শেষ হয়ে যায়। এরপর হতভাগ্য জীবন নিয়ে গ্রামীণফোনে কর্মরত থাকলেও একই সময়ে চাকরি পাওয়া হতভাগ্য এসিডদগ্ধ রেজাউল করিম ও মনসুরা খাতুনকে ২০১২ সালে চাকরিচ্যুত করা হলে তিনি চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ২০১২ সালে রেজাউল করিম তার চাকরি পুনর্বহালের মামলা করলে ২০১৩ সালে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে বাধ্য হয় গ্রামীণফোন; কিন্তু অপর হতভাগ্য মনসুরা খাতুন মামলা না করায় তার ভাগ্যে আর চাকরি জোটনি। এখন তিনি দুর্বিসহ জীবন নিয়ে বেঁচে আছেন; কিন্তু মামলা করে চাকরিতে আসা সিরাজগঞ্জের রেজাউল কর্মস্থলে নানান অপমান ও বঞ্চনার শিকার হয়ে ২০১৪ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। হতভাগ্য রেজাউলের পরিবারের সদস্যরা জানান, চিকিত্সাধীন অবস্থায় কিছু টাকা দিয়ে এবং মৃত্যুর পর দুইলাখ টাকা দিয়ে গ্রামীণফোন তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে।
রেজাউলের মৃত্যুর পর দুইটি বাচ্চা নিয়ে তার স্ত্রী মানবেতর জীবন-যাপন করলেও গ্রামীণফোন আর সেদিকে ফিরেও তাকায়নি বলে জানান প্রয়াত রেজাউলের সহকর্মীরা। এসিডদগ্ধ অপর দুইজন আফরোজা আক্তার কাকলী ও ফজিলাতুন্নেছা গ্রামীণফোন কর্তৃক অপমান, বঞ্চনার শিকার হয়ে একজন চাকরি ছেড়ে গেলেও অপরজন আফরোজা আক্তার কাকলীকে গ্রামীণফোন প্যাকেজের নামে স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে বাধ্য করে। বর্তমানে লড়াই কড়া একমাত্র নারী লুলু মানসুরা এবং সিরাজুল হক সেলসে কর্মরত রয়েছেন।
লুলু মানসুরা জানান, গত বৃহস্পতিবার জহির নামক এক ব্যক্তি মোবাইলে গ্রামীণফোনের পরিচয় তাকে ঢাকা গ্রামীণফোনের হেড অফিসে যোগদান করতে বলেন। মানসুরা বদলি সংক্রান্ত কাগজপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রামীণফোনের এইচআর থেকে তাকে জানানোর জন্য বলা হয়েছে বলে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। বদলি সংক্রান্ত কাগজপত্র লুলু মানসুরার সিনিয়র অফিসারের কাছে পাঠানো করা হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি লাইন কেটে দেন।
প্রকাশিত সংবাদ বিষয়ে গ্রামীণফোনের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য
মঙ্গলবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘গ্রামীণফোনের ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি’ শীর্ষ প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছে গ্রামীণফোন। এতে বলা হয়, প্রতিবেদনটি ভিত্তিহীন ও দুরভিসন্ধিমূলক। অন্যান্য কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো আমাদেরও সময় সময় রাজস্ব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ হয়। তা সমাধান করতে আদালতই যথাযথ স্থান। কর নিয়ে মতবিরোধকে কর ফাঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিচায়ক নয়।
প্রতিবেদকের বক্তব্য: কর ফাঁকির বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্ত ইত্তেফাকের হাতে রয়েছে। এখানে প্রতিবেদকের নিজস্ব কোনো বক্তব্য নেই। প্রতিবেদনে উল্লিখিত ভ্যাট বিষয়ে এনবিআরের বৃহত্ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-ভ্যাট) থেকে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ পাওনার বিষয়ে আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণের জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যানকে পাঠানো চিঠির কপিও ইত্তেফাকের হাতে রয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদপত্রে কিছু বলা হয়নি। এছাড়া সম্প্রতি বেশকিছু কর বা ভ্যাট ফাঁকির অর্থ পরিশোধ করা সংক্রান্ত প্রতিবেদনের অংশেরও প্রতিবাদ করা হয়নি।
ইত্তেফাক/নূহু