দ্রুত এগিয়ে চলেছে পদ্মা সেতুর কাজ

 
বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে এর মূল কাজের অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২ ফেব্রুয়ারি টুঙ্গিপাড়া যাবার পথে সেতুটির নির্মাণ কাজের অগ্রগতি সরেজমিন পরিদর্শন করবেন।
 
সেতুমন্ত্রী আরো বলেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে জাজিরা প্রান্তে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটির ওপর ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৩ হাজার ২০০ টন ওজনের প্রথম স্প্যানটি বসানোর পর সেতুটি দৃশ্যমান হয়। আগামী ৪/৫ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় স্প্যান বসবে। এভাবে মোট ৪১টি স্প্যান বসার পর দাঁড়িয়ে যাবে পূর্ণাঙ্গ সেতু। মাওয়া প্রান্তে আরো ১০টি স্প্যানের সাপ্লিমেন্টারি কাজ চলছে। চলতি সালের ডিসেম্বর নাগাদ কাজ সম্পন্ন করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে। ২০১৪ সালের ১৮ জুন মূল পদ্মা সেতু নির্মাণে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে সরকার। তাতে খরচ ধরা হয় ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। আর নদীশাসনের কাজ করছে চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। তাদের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। এ কাজের খরচ ধরা হয় ৮ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া দুই প্রান্তে টোল প্লাজা, সংযোগ সড়ক, অবকাঠামো নির্মাণ করছে দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেতুর প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে প্রকল্পের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
 
দ্বিতলবিশিষ্ট এ সেতু মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের মাধ্যমে পদ্মার দুই পাড়কে সংযুক্ত করবে। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য (পানির অংশের) ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। ডাঙার অংশ ধরলে সেতুটি প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। খুঁটির ওপর ইস্পাতের যে স্প্যান বসানো হবে, এর ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। আর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন।
 
অনেক বাধা অতিক্রম : পদ্মা সেতু বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্প। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আগে ‘দিন বদলের সনদ’ নামে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে নির্বাচনী ইশতেহার দেওয়া হয় সেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণের। ক্ষমতায় এসে সেই অনুযায়ী কাজও শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু এরই মধ্যে শুরু হয় বিশ্বব্যাংকের আনা দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের কথিত অভিযোগসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধকতা। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এ সেতুর নির্মাণ কাজ। অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের টালবাহানায় ক্ষুব্ধ হয়ে ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি সংস্থাটিকে এক সপ্তাহের আল্টিমেটাম দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ওই মাসের মধ্যে বিশ্বব্যাংক তাদের অবস্থান স্পষ্ট না করলে সরকার তাদের কাছ থেকে কোনো ঋণ নেবে না। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ হবে। পরে ৩১ জানুয়ারি সরকার পদ্মা সেতুর জন্য অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাহার করে বিশ্বব্যাংককে চিঠি দেয়। বিশ্বব্যাংকের কাছে অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাহারের আগে-পরে মালয়েশিয়া, চীনসহ কয়েকটি দেশ অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়। তবে সেগুলো দেশের জন্য সাশ্রয়ী না হওয়ায় সরকার সেদিকে না গিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের কাজ হাতে নেয়। পরবর্তী অর্থবছরের (২০১৩-১৪) বাজেটে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য ছয় হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্য দিয়ে সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে।
 
আওয়ামী লীগের অভিযোগ : পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিল হওয়ার পেছনে নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসের হাত ছিল বলে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হয়েছে। দলটির দাবি, বয়সের কারণে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকতে না পেরে ড. ইউনূস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে ঋণ চুক্তি বাতিলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার ড. ইউনূসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘পদ্মা সেতু ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আমাদের দেশের একজন নোবেল জয়ী জড়িত। ব্যাংকের এমডি পদে থাকতে না পেরে তিনি এ ষড়যন্ত্র করেছিলেন।’ এ প্রসঙ্গে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন প্রধানমন্ত্রীকে ফোনও করেছিলেন বলে তিনি জানান। এখনো পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে বলে অভিযোগ তাদের।
 
দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি : পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কানাডার আদালতে তার কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি বিশ্বব্যাংক। গত ১০ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কানাডার আদালত জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ঋণ বাতিল করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কানাডার আদালতের এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সততার শক্তি ছিল বলেই বিশ্বব্যাংকের ওই অভিযোগকে তিনি চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছিলেন।
 
ইত্তেফাক/মোস্তাফিজ