ঢাবি রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচনেও আওয়ামীপন্থীদের জয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নির্বাহী পরিষদ সিন্ডিকেটের শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন, সিনেট শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন ও শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে ভরাডুবির পর এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচনেও বিএনপি-জামায়াতপন্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। রবিবার ঢাবি সিনেট রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট ২৫ জন প্রতিনিধি নির্বাচনের ফল প্রকাশ করে। এতে ২৪টিতে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগপন্থীদের গণতান্ত্রিক ঐক্য পরিষদ আর বিএনপি-জামায়াতপন্থীদের জাতীয়তাবাদী ঐক্য পরিষদ মাত্র একটিতে জয় পেয়েছে।

এর আগে ২০১৪ সালের সিন্ডিকেট শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে সরকারি দল সমর্থক নীল দল মোট ছয়টি পদের চারটিতে বিজয়ী হয়। দুটিতে জয়ী হয় বিএনপি-জামায়াত সমর্থক সাদা দল। এছাড়া অ্যাকাডেমিক পরিষদের ছয়টি এবং ফিন্যান্স কমিটির একটি পদের প্রত্যেকটিতে জয়ী হয় নীল দলের শিক্ষকরা।

গত বছরের মে মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নীল দল ৩৫টি আসনের মধ্যে ৩৩টি ও বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাদা দল দুইটি আসন পেয়েছিলো। একই বছরের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ২০১৮ সালের কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচনে ১৫টি পদের ১৪টিতে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত নীল দল। শুধু একটি সদস্য পদে জয় পায় সাদা দলের প্রার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, সিনেট ও শিক্ষক সমিতির নির্বাচন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধির নির্বাচন একটু ভিন্ন প্রকৃতির। সিন্ডিকেট, সিনেট ও শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে ভোটার থাকে শিক্ষকরা। কিন্তু রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচনে রেজিস্টারকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্ররাও ভোট দেয়।

সিন্ডিকেট, সিনেট নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা দাবি করেন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকই নানারকম সুযোগ সুবিধা নেওয়ার জন্য তাদের প্যানেলে ভোট দেয়। কিন্তু রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট নির্বাচনে সমগ্র বাংলাদেশে ভোটার ছিলো। এই নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশশ্ববিদ্যালয় বিএনপিপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকার বাইরের কেন্দ্রগুলোতে কিছুটা গন্ডগোল হয়েছে। এছাড়া ঢাকার কেন্দ্রেও যেভাবে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা সরব উপস্থিতি দেখিয়েছে তাতে বিএনপিপন্থী সাধারণ ভোটাররা কিছু অনুভব করেছে। এসবের প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলে পড়েছে।

এ বিষয়ে বিএনপিপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন খান ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকার বাইরের অধিকাংশ কেন্দ্রে আমাদের সমর্থকদের ওপর হামলা, কেন্দ্র ভাঙচুর ইত্যাদি করেছে। আমরা মনে করছি তার প্রভাব নির্বাচনে পড়েছে। বাইরের কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচন সুষ্টুভাবে সম্পন্ন হলে নির্বাচনি ফলাফল ভিন্নরকম হতে পারতো বলে দাবি করেন তিনি। তবে নির্বাচন ফলাফল তারা মেনে নিয়েছেন বলে জানান।

তবে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বলছেন ভিন্ন কথা। আওয়ামীপন্থীদের জয়ের পেছনের কারণ সম্পর্কে ইত্তেফাককে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে সামনে এনেছে। আর্থসামাজিক, অবকাঠামোগত উন্নয়ন সারাদেশে, শিক্ষাক্ষেত্রে বিস্তৃতি সর্বপরি বাংলাদেশের নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার প্রতি আস্থার বহিঃপ্রকাশ এটি।

গতকাল রবিবার বিকালে রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন কমিশনার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। সঠিকভাবে ভোট গণনা করা হয়েছে। আমরা কারও অভিযোগ পাইনি। যদিও গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয়তাবাদী পরিষদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন খান ঢাকার বাইরে মোট ৪২টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী পরিষদের ভোটার ও সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করেন।

এবারের রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ঐক্য পরিষদ, জাতীয়তাবাদী পরিষদ এবং প্রগতি পরিষদ অংশ গ্রহণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ২৫জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচনে ৮০জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মোট ৪৫টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হয়। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৪৩ হাজার ৯৯৭জন। নির্বাচনে ভোট পড়েছে মোট ২২ হাজার ৬৪২টি, তন্মধ্যে ১ হাজার ২৬০টি ভোট বাতিল হয়েছে।
            
গণতান্ত্রিক ঐক্য পরিষদ নির্বাচিতরা হলেন- অধ্যাপক ড. অসীম সরকার, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, এ এইচ এম এনামুল হক চৌধুরী, অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, এ বি এম বদরুজ্জো, অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সালন, এম ফরিদউদ্দিন, অধ্যাপক ড. এমরান কবীর চৌধুরী, এস এম বাহালুল মজনুন চুন্নু, অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা, অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী, নিজাম চৌধুরী, অধ্যাপক মাহফুজা খানম, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুস সামাদ, অধ্যাপক মো. আব্দুল বারী, আতাউর রহমান প্রধান, অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আজিজ, মো. আলাউদ্দিন, মো. নাসির উদ্দিন, ড. মো. লিয়াকত হোসেন মোড়ল, রঞ্জিত কুমার সাহা, রামেন্দু কৃষ্ণ মজুমদার,  অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ও অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার। সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন রুপালী ব্যাংকের এমডি আতাউর রহমান প্রধান (১২৯৬৭) ভোট।

জাতীয়তাবাদী পরিষদের নির্বাচিত একমাত্র প্রার্থী হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার।

ইত্তেফাক/নূহু