অযত্ন-অব্যবস্থাপনায় বেহাল রমনা পার্ক

রাজধানী ঢাকার মানুষকে প্রশান্তি দিতে নিবিড় সবুজের চাদরে মোড়ানো সুপরিচিত স্থান রমনা পার্ক। তবে অযত্ন-অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় বেহাল পার্কটির পরিবেশ। গেল বছরের জানুয়ারিতে একটি গাছের চারা লাগিয়ে রমনা পার্কের উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন শেষে পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, ঐতিহ্য সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অপ্রয়োজনীয় গাছ অপসারণ করে সুনির্দিষ্ট বৃক্ষরোপণ, উন্মুক্ত স্থান নির্ধারণ, প্রতিটি গাছের ইতিহাসসহ পরিচিতি ফলক লাগানো এবং অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা অপসারণ করার কথা বলা হয়। তবে বছর পেরিয়ে গেলেও সে কাজের কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

পাম, অশোক, সোনালু, নাগেশ্বর বীথি, কুসুম বীথি, মহুয়া, শতবর্ষী দেশি গাবগাছ, অশ্বত্থসহ ২০ প্রজাতির গাছ রয়েছে পার্কটিতে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা পার্কটির অভ্যন্তরে ৮১২ মিটার লম্বা লেক রয়েছে। পার্কে মোট আটটি ফটক আছে। ভোর ৬টায় খুলে রাত ৮টার পর ফটক বন্ধ করা হয়। তবে নানা অনিয়মের ফলে পার্কের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিটি ফটকের সামনে বিভিন্ন নিয়ম-কানুন লেখা থাকলেও মানা হচ্ছে না যথাযথভাবে। পার্কের অভ্যন্তরে ঘটতে থাকা নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্প্রতি পার্কের পরিবেশগত নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, পার্কের দক্ষিণ দিকে লেকের পাশ থেকে শুরু করে কাকরাইল মসজিদের পেছন পর্যন্ত বসার বেঞ্চগুলো বেশ পুরনো। সংস্কারের অভাবে বেশ কয়েকটি ভেঙে পড়েছে। তবে পার্কের খোলা জায়গায় কর্ণার করে নতুন বেঞ্চ তৈরি করেছে গজিয়ে ওঠা প্রাতঃভ্রমণকারীদের বিভিন্ন সংগঠন। পার্কটিতে মোট ৪টি টয়লেট (শৌচাগার) থাকলেও তা বেশ অপরিচ্ছন্ন। পার্কের অভ্যন্তরে থাকা শিশুপার্কের খেলার উপকরণগুলোর বেশিরভাগ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পার্কে নতুন করে ডাস্টবিন বসানো হলেও ব্যবহারে তেমন আগ্রহী দেখা যায় না কাউকে। বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা ও ঝরেপড়া পাতার স্তূপ দেখা যায়। দেখভালের দায়িত্বে থাকা আনসার ও অন্য সদস্যদের সামনে লোকজন সাবান দিয়ে কাপড় ধোয়াসহ লেকের পানিতে গোসল করছে। বিভিন্ন গাছের শুকনো ডালপালা ও পাতা ইত্যাদি পচে লেকের পানি দূষিত হচ্ছে। মূল লেক থেকে কালভার্টের মাধ্যমে আলাদা দুইটি মিনি লেকের অবস্থাও বেশ খারাপ।

অভিযোগ রয়েছে, রমনা বটমূল ছাড়া পার্কজুড়ে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কারণে ক্ষতি হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। অব্যাহতভাবে নানা রকম স্থাপনা বিনষ্ট করছে পার্কের সবুজ অঙ্গনকে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার জন্য এখন পার্কটিতে সাধারণ দর্শনার্থীদের বিভিন্ন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলেও জানান অনেকে। মাদকসেবী, ভাসমান যৌনকর্মী, পকেটমার, বখাটে ও ছিনতাইকারির দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে বহুলাংশে। পার্কের যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করছে ভবঘুরে, হকার, ভিক্ষুক, এমনকি পার্কের দর্শনার্থীরাও।

প্রতিদিন পার্কে হাঁটতে আসা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত পার্কে প্রতিদিন শত শত মানুষ হাঁটতে আসেন। অথচ পার্কটি বেশ অপরিচ্ছন্ন থাকে। সুপেয় পানিরও কোনো ব্যবস্থা নেই। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। সকাল ১০টার পর থেকে পার্কের সবত্র বখাটেদের আড্ডা বসে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে পার্কের সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত গণপূর্ত অধিদফতরের কার্য-সহকারী শামসুল ইসলাম বলেন, পার্ক পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। সার্বিক সমস্যার খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলেন তিনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ রতন বলেন, এ পার্কের অনেক সমস্যা রয়েছে। তবে পার্কটি গণপূর্ত অধিদফতরের অধীনে থাকায় এটা আমার আওতার বাইরে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন বলেন, ‘রমনা পার্ক ঢাকা শহরের অন্যতম একটি পার্ক যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ হাঁটা-চলার জন্য আসেন। সম্প্রতি প্রাতঃভ্রমণকারীরা এলাকাভিত্তিক দল গঠন করে পার্কের অভ্যন্তরে মেঝে পাকা করে নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যায়ামের সরঞ্জাম বসিয়ে বিভিন্ন কর্ণার তৈরি করেছে। এবং অপরিকল্পিতভাবে যেখানে সেখোনে গাছ লাগিয়ে পার্কের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে যা সম্পূর্ণ পার্কটির নিয়ম বহির্ভূত।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এর সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুস সোবহান বলেন, দেশীয় প্রজাতির গাছের আধিক্য কম। এমন গাছপালা লাগানো উচিত যেখানে পাখির আবাসস্থল হতে পারে। পার্কের সবরকম অপরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনা দূর করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ইত্তেফাক/নূহু