জাফলংয়ে গভীর গর্ত করে পাথর উত্তোলন

ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়ায় (ইসিএ) গভীর গর্ত করে অনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পিয়াইন নদীর তীরবর্তী জাফলংয়ের পাঁচটি আদিবাসী খাসিয়াপুঞ্জি। পিয়াইন নদী থেকে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে মাটির পাঁচ ফুট নীচ থেকে পাথর উত্তোলনের ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও কেউ এটা মানছে না। সেখানে নদীর ৬০-৮০ ফুট নীচ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে পাথর।

আশঙ্কা হরা হচ্ছে এভাবে পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকলে আসন্ন বর্ষা মওসুমে পাঁচটি খাসিয়াপুঞ্জি পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বিলীন হয়ে যাবে। বাস্তুহারা হবেন সেখানকার আড়াই শতাধিক খাসিয়া পরিবার। কিন্তু এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলে খাসিয়াদের কেউই সরাসরি কথা বলতে রাজী হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, ‘প্রতিবাদ করার শক্তি আমাদের নেই। যেখানে থানা পুলিশই কিছু করে না। সেখানে আমরা কি করবো।’  খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। ঐ সিন্ডিকেটের লোকজন দিনেদুপুরে পুঞ্জির ভিতরে মহড়া দিয়ে বেড়ায়। এলাকার অনেকেই আবার তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।

জাফলং এলাকায় সংগ্রামপুঞ্জি, নকশিয়াপুঞ্জি, লামাপুঞ্জি, প্রতাপপুর ও বল্লা পুঞ্জি - নামে পাঁচটি পুঞ্জি রয়েছে। প্রতিটি পুঞ্জিতে গড়ে ৫০টি করে পরিবার বসবাস করে। সবমিলিয়ে এসব পুঞ্জিতে প্রায় তিন সহস্রাধিক লোকের বাস।  বল্লা পুঞ্জি ছাড়া বাকি চারটি পুঞ্জির উত্তর পাশে গভীর গর্ত করে উত্তোলন করা হচ্ছে পাথর। এসব পুঞ্জির পাশে প্রায় দুই শতাধিক পাথরের গর্ত রয়েছে। বড়বড় মেশিন লাগিয়ে বালি সরানো হচ্ছে, আর মাটির গভীরে বোমা মেশিন লাগিয়ে পাথর তোলা হচ্ছে। সে এক বিশাল কর্মযঞ্জ। দেখলে মনে হবে সরকারের কোন বিশাল প্রকল্পে কাজ চলছে। পুঞ্জির খাসিয়া   নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা মূল্যের পাথর উত্তোলনের ‘মচ্ছব’ চলছে।

গোয়াইনঘাটের বাসিন্দা, লেখক-কলামিস্ট আব্দুল জব্বার জানান, পিয়াইন নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার সুবাদে পাথরখেকো চক্র এখানে নির্বিঘ্নে পাথর উত্তোলন করছে। পিয়াইন নদীর পানি প্রবাহ সচল করা গেলে পাথরখেকোরা এখান থেকে সহজে পাথর উত্তোলন করতে পারবে না বলে তিনি মত প্রকাশ করে। সিলেট  জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহিন বলেন, এসব কোয়ারিতে পাথর উত্তোলনের পিছনে কিছু সিন্ডিকেট কাজ করছে।

গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, উচ্চ আদালতের নিদের্শনার আলোকের ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি জাফলংকে ইসিএ (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া) ঘোষণা করা হয়। ইসিএ’র মোট সীমানা হচ্ছে ১৪ দশমিক ৯৩ বর্গ কিলোমিটার। তিনি বলেন, ইসিএ এলাকায় পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের একটি অংশ উচ্চ আদালতে রিট করে। রিটের প্রেক্ষাপটে আদালত মূল পিয়াইন নদীতে পাথর উত্তোলনের আদেশ দিয়েছেন। এ কারণে মূল পিয়াইন নদীতে বর্তমানে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। আদালতের আদেশের কারণে আমরা এ ব্যাপারে কিছু করতে পারছি না। পাথর কোয়ারিতে গভীর গর্ত করে পাথর উত্তোলন প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, আমরা বিষয়টি মনিটর করছি। কোন গর্ত গভীর হলে আমরা সেখানে লাল ফ্ল্যাগ তুলে দেই। পাশাপাশি পাথর তোলার গর্তে কেউ হতাহত হলে মামলা দায়ের করি। তিনি উল্লেখ করেন, জাফলংয়ের জুম মন্দির এলাকায় কাউকে কোন পাথর তুলতে দেয়া হবে না। এরই মধ্যে গর্ত ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো ওই এলাকার ভূমি মালিকদের একটি তালিকা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

ইত্তেফাক/নূহু