চট্টগ্রামে উঠতি সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া

চট্টগ্রামে বেপরোয়া হয়ে পড়ছে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক উঠতি সন্ত্রাসীরা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১৪ থেকে ১৮ বছরের কিশোররা ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক সেবন ও ব্যবসা, স্কুল ও কলেজগামী মেয়েদের উত্যক্ত করা, নিজেকে জাহির করার জন্য মিছিলে যাওয়া, মার্কেট-বিপণি দোকানপাটে চাঁদাবাজি ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারসহ খুনাখুনিতেও জড়িয়ে পড়ছে এসব উঠতি সন্ত্রাসীরা। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কিংবা নেশার টাকা জোগাড় করতে বাবা, মায়ের অজান্তে তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

গত সপ্তাহে নগরীতে নবম শ্রেণির একজন ছাত্র খুন হয়েছে উঠতি সন্ত্রাসীদের হাতে। পুলিশ বলছে, নিজেদেরকে ‘হিরো’ প্রমাণ করার জন্য আদনান ইসফার নামে ওই স্কুল বালককে খুন করেছে তার চেয়ে বছর কয়েকের বড় ৫ কিশোর। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পাড়াভিত্তিক প্রতিটি সন্ত্রাসী চক্রের পেছনেই মদদদাতা হিসেবে রয়েছে এক বা একাধিক বড় ভাই। প্রয়োজনে এই বড় ভাইরাই আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়। অনেক সময় সামান্য চা, সিঙ্গাড়ার বিনিময়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করিয়ে নেয় অল্প বয়সী কিশোরদের দিয়ে। কথিত বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় ৪১টি ওয়ার্ডে শতাধিক উঠতি সন্ত্রাসী চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। তাদের আড্ডার স্থানগুলোর ওপরও নজরদারি শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি নেপথ্যে থাকা বড় ভাইদেরও তালিকা করা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, শীর্ষ অপরাধীরা গডফাদারের ভূমিকায় নেপথ্যে থেকেই নতুন সন্ত্রাসীদের তত্পরতা নিয়ন্ত্রণ করছে। ঘটনার পর উঠতি সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ ধরা পড়লেও নেপথ্যে থাকা বড় ভাইরা অধরাই থেকে যায়।

এদিকে, উঠতি সন্ত্রাসীদের দাপটের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছেন নগরবাসী। নগরীর খুলশী, আকবর শাহ, বায়েজিদ, সদরঘাট, চান্দগাঁও থানা এলাকায় উঠতি বয়সীদের তত্পরতা বেশি চোখে পড়ে। বায়েজিদ এলাকায় জমি দখল, শিল্প কারখানায় চাঁদাবাজির মূল হোতা উঠতি সন্ত্রাসীরা। এসব সন্ত্রাসীদের বড় সুবিধা হচ্ছে, তাদের সর্ম্পকে পুলিশের কোনো ধারণা নেই। থানার খাতায় তাদের নাম নেই। ফলে কোথাও কোনো অপরাধ হলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়তে হয়। পুলিশের এই সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগাচ্ছে নেপথ্যের গডফাদাররা।

জানা গেছে, ২০০৫ সালের আগস্টে সর্বশেষ সন্ত্রাসী তালিকা তৈরি করেছিল চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)। এ তালিকাটি ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হালনাগাদ করা হয়। এরপর ২০০৯ সালে এ তালিকা ডিজিটালাইজড করার উদ্যোগ নেয়া হয়। নেয়া হয় ‘ক্রিমিনাল ডাটাবেজ সিস্টেম উইথ ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেনটিফিকেশন’ নামক প্রকল্প। প্রাথমিক পর্যায়ে পাহাড়তলী, হালিশহর ও ডবলমুরিং থানায় এ প্রকল্পটি চালু করা হয়। কিন্তু এ উদ্যোগ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বেশিদূর এগোয়নি। হালনাগাদ হয়নি সন্ত্রাসীদের তালিকাও। অথচ এ উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে একজন অপরাধী সম্পর্কে ৪৮টি তথ্য সংরক্ষিত থাকত পুলিশের কাছে। অপরাধ সংঘটনের এলাকা, গ্রুপ লিডারের নাম, রাজনৈতিক পরিচয়, তার কাছে অস্ত্র পাওয়া গেছে কিনা, সর্বশেষ গ্রেফতারের তারিখ ও মুক্তির তারিখ, কী ধরনের অপরাধে জড়িত, অপরাধীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ছবি ইত্যাদি সংরক্ষিত থাকত। সর্বশেষ ২০১৪ সালের শেষের দিকেও অপরাধের সঙ্গে জড়িত চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেয় পুলিশ। অপরাধীদের অপরাধের ফিরিস্তি তাত্ক্ষণিক জানার সুবিধার্থে পুলিশের নেয়া এ উদ্যোগও থমকে আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, অপরাধীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়ার পর শাসক দলের নাম ভাঙিয়ে অপরাধে জড়িতদের নাম আসতে থাকে ‘সন্ত্রাসী তালিকায়’। এতে পুলিশের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। বারবার উদ্যোগ নেয়ার পরও রাজনৈতিক প্রভাবে এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখছে না।

র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, কিছু উঠতি সন্ত্রাসী বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এসব সন্ত্রাসীর ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তালিকা নেই। তবে আমরা তাদের বড় ভাইদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিচ্ছি। এছাড়া প্রমাণসহ ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, উঠতি সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। পিতা-মাতা, এলাকার মুরুব্বি এবং জনপ্রতিনিধিদেরও আরো সচেতন হতে হবে।

ইত্তেফাক/নূহু