ঋতুর রানির কোমলতা

পৃথিবীতে মৃদু বলে একটা শব্দ আছে। এই মৃদু শব্দটা আমাদের অনেকাংশে আশ্বস্ত করে। আমাদের যদি মৃদু এসে আঘাত করে, তবে আমরা নিহত তো হই-ই না, আহত হলেও তা হই মৃদু। আর যদি মৃদুমন্দ বাতাস আমাদের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাহলে মৃদু স্পর্শের আবেশে মজ্জমান হয়ে বার বার তার কথা মনে হতে থাকে। মনে হয় এক্ষুনি বুঝি একটা মৃদু স্পর্শের ঘটনা রচিত হবে। তাছাড়া আমরা মৃদু ঘটনাসমূহের ভেতর সাঁতার কেটে যেতে যেতে জীবনকে আস্বাদন করতে চাই। এভাবে ‘মৃদু’ আমাদের সুখ বিতরণ করে। এভাবে এত কংক্রিট, এত নির্দয়তা, এত পেশাদারিত্বের ভেতর আমাদের খানিক মৃদু স্পর্শের বড় প্রয়োজন হয়ে পড়ে কখনো কখনো, প্রায়শই। এ সত্য তো প্রকৃতি আরো ভালো বুঝতে পারেন। বুঝতে পারেন বলে তিনি একটি ঋতুর পুরোটাই মৃদু দিয়ে গড়ে দিলেন।

তো কে সে মৃদু ঋতু। এর উত্তর প্রশ্নের থেকেও সহজ। শরত্ ঋতুর রানি। রানিরা সবসময় সৌন্দর্যের প্রতিভূ, কোমলতার প্রতিভূ। এ কারণে তাঁদের পোশাক থাকে শ্বেত-শুভ্র। এ কারণে তাঁদের হাসি থেকে বেরিয়ে আসে মৃদুমন্দ কোমলতা।

‘রাস্তার দুধারে এত কাশফুল দাঁড় করাল কে?

বন থেকে উঁকি দিচ্ছে একটি বালক, অপু নয়।’

জয় গোস্বামী এ কথা বলেছেন। অপুর যদি উঁকি দেওয়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে সে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ধানখেতের দিকে উঁকি দেবে, কাশবনে ওর কী? কাশবনে তো যাবে সাদা পালকের স্বপ্ন দেখা সেইসব যুগল, যাদের হূদয়ে খেলা করে একটা সাদা উঠোনের বাড়ি। তা-ই না? যাহোক খবর

হলো—গত দু বছর ধরে শরত্ আসার সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে শ্বেতশুভ্র পোশাক জড়ানো এক বান্ধবী এসে হাজির হচ্ছে। হাজির হচ্ছে বললে কম বলা হবে, সে আসলে শরতের পুরো দুটা মাস আমাকে ঘিরে রাখে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তার সাদা ওড়নার ঢেউ। রাতে জ্যোত্স্নার মৃদু আলোতেও টের পাওয়া যায় মাথা দুলিয়ে কোমল দ্যোতনা জন্ম দেওয়ার রেশ।

আর কী আশ্চর্য—শরত্ ঋতুর রানি বলে কাশফুল সাদা, শেফালি সাদা, প্রায় ফুরিয়ে যাওয়া দোলনচাঁপা সাদা, মেঘের রঙ সাদা আর শরতের জ্যোত্স্না এতই ধবল যে তার কোনো তুলনা নেই। এর সঙ্গে আকাশ কিন্তু তীব্র নীল, সূর্য প্রখর লাল আর খেতে খেতে ধানগাছগুলো নিবিড় সবুজের সমারোহ।

‘এটা কি শরত্সন্ধ্যা? বাংলাদেশ? কাশফুলে ছেয়ে গেছে চর?

উদাম আকাশ তবে এখনও কি মাথার ওপর?

এমন নির্গন্ধ বায়ু কোন কালে ছিল কি এদেশে?

আমার পঙিক্ত শুনে, কারা হাসে? প্রেতের আদেশে

মনে হয় মরে গেছে শরতের সন্ধ্যার শহর।’

—আল মাহমুদ

না শরত্ জেগে আছে। সে মরে যেতে পারে না। আরো বহুদিন তার বেঁচে থাকতে হবে। কেননা, আমি যে কোমল শরতের হাত ধরি, সে বলেছে তার একটা সাদা উঠোন থাকবে। উঠোনের পাশে থাকবে একটি শিউলি গাছ। ওই উঠোনে আমার প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত। এই কথা শুনে বলি—ও উঠোনে আমি যাব শুধুই শরতে, আর কখনো নয়। সে গম্ভীর হয়ে বলে, তাহলে উঠোন ঘিরে যে কুঁড়েঘরটা থাকবে সেখানে একটা লাল দড়ি ঝুলিয়ে দেবো। আমি বিরাট এক শঙ্কা নিয়ে মিনমিন করে বলি, কেন? মুহূর্তে সে শরতের মতো পেলব হাসি চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে জানায়, ওই দড়ি

দিয়ে শরতের চাঁদকে বেঁধে রাখা হবে। তাহলে সারা বছর শরত্, বছরের নাম হবে শরত্বছর। যদি এমন জ্যোত্স্না হয় যা অমলধবল, তাহলে শরত্ই থাকুন। যদি প্রেমিক প্রেমিকাকে, প্রেমিকা প্রেমিককে কোমল কথা ছাড়া আর সকল কথা বরাদ্ধ বন্ধ করে দেয়, তাহলে শরত্ই থাকুন।