কৌলিন্যের বিচারে বসন্ত উচ্চবংশীয়। দুটি আবেদনময়ী বড় ঋতুর মাঝখানে নিজের চমত্কারিত্ব বেশ ভালোভাবেই জারি রাখতে পেরেছে বসন্ত। শীতের জড়তা ভেঙে পাতার আড়ালে বসে যখন কোকিল ডাকে, দূরের বনে দু-এক স্তবক মাধবী ফোটে, শিমুলকলিরা পাখা মেলে হাওয়ায় দোল খেতে থাকে অথবা পলাশের ডালে ডালে অগ্নিকন্যারা পসরা সাজাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে তখন আমরা অনুভব করি বসন্ত দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু বসন্তের এই উচ্ছ্বাস অতি দ্রুত মিইয়ে যায়। ফ্যাকাসে হতে থাকে তার দ্যুতি। বস্তুত প্রকৃতিতে আমরা বসন্তের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ প্রত্যক্ষ করি। কারণ শীতে গুটিসুটি মেরে থাকা প্রকৃতি ফাল্গুনের প্রথমভাগেই তার পুষ্পউচ্ছ্বাস মেলে ধরে। কিছুদিনের মধ্যেই তা আবার নিষ্প্রভ হয়ে ওঠে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্প্রতি তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন—‘আমাদের সত্যিকার বসন্তকে আমরা পাই ফাল্গুনে—যখন শীতের আমেজ প্রকৃতি থেকে বিদায় নেয়নি, কিন্তু গ্রীষ্ম অগোচরে তার রক্তাক্ত বল্লম নিয়ে প্রকৃতির অঙ্গনে এসে দাঁড়িয়েছে।’ শীতের শীতলতা ভেদ করে বসন্ত আসে দুরন্ত বাতাস আর অগ্নিস্পর্শ উষ্ণতা নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বইল প্রাণে দখিন হাওয়া আগুন-জ্বালা।’ আবার মায়ার খেলা গীতিনাট্যে তিনি বসন্তকে উদ্যাপন করেছেন উত্সবের আমেজে—
‘আহা, আজি এই বসন্তে,
এত ফুল ফোটে,
এত বাঁশি বাজে এত পাখি গায়।’
আবার—
‘ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান—
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান।’
‘ফাল্গুনী’ গীতিনাট্যে তিনি লিখেছেন—
‘বসন্তে ফুল গাঁথল আমার
জয়ের মালা
বইল প্রাণে দখিন হাওয়া
আগুন-জ্বালা।’
কবিগুরু ছাড়া যেমন বসন্ত অসম্পূর্ণ তেমনি প্রেম ও দ্রোহের কবি নজরুলও বসন্তকে হূদয়ে ধারণ করেছেন নানাভাবে। বসন্ত নিয়ে তিনি রচনা করেছেন অপূর্ব সংগীত—
‘বসন্ত আজ আসলো ধরায়,
ফুল ফুটেছে বনে বনে,
শীতের হাওয়া পালিয়ে বেড়ায় ফাল্গুনী মোর মন বনে।’
অন্যত্র আছে—
‘এলো খুনমাখা তূণ নিয়ে
খুনেরা ফাগুন।’
বসন্তযাপন প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—
‘এই মাঠের পারে শালবনের নূতন কচি পাতার মধ্য দিয়া বসন্তের হাওয়া দিয়াছে।
অভিব্যক্তির ইতিহাসে মানুষের একটা অংশ তো গাছপালার সঙ্গে জড়ানো আছে।’
অন্যভাবে তিনি আবার বসন্তে যে আমাদের মনোজগতে বহুমাত্রিক পরিবর্তন সূচিত হয় তার একটি যোগসূত্র স্থাপন করতে চেয়েছেন।
‘বসন্তে আমাদের মন অন্তঃপুর হইতে বাহির হইয়া যায়, বাতাসের উপর ভাসিতে থাকে, ফুলের গন্ধে মাতাল হইয়া জ্যোত্স্নার মধ্যে ঘুমাইয়া পড়ে; আমাদের মন বাতাসের মতো, ফুলের গন্ধের মতো, জ্যোত্স্নার মতো, লঘু হইয়া চারি দিকে ছড়াইয়া পড়ে।’ [বসন্ত ও বর্ষা]
প্রকৃতির অন্তরঙ্গ কবি জীবনানন্দ দাশ বসন্ত নিয়ে লিখেছেন—
‘সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি
মনে হয় কোনো এক বসন্তের রাতে:
ভূমধ্যসাগর ঘিরে যেই সব জাতি,
তাহাদের সাথে
সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন...’
বসন্ত নিয়ে কবি ও কথাশিল্পীদের এমন অসংখ্য অমিয়বচন বইয়ের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। যা নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা যাবে। কিন্তু আজকের এই লেখায় আমরা প্রকৃতির স্পর্শমাখা বসন্তবন্দনায় থাকতে চাই। এই বসন্তে মগ্নতার ভেতর দিয়েই আমরা ঘোরলাগা কোনো একটি মুহূর্তে গ্রামের বসন্তকে উদ্যাপন করতে পারি। প্রকৃত অর্থে বসন্তের সমস্ত আনন্দই গ্রামের পরতে পরতে লুকানো। নগরে যার ছিটেফোঁটাও আমরা উপলব্ধি করতে পারি না। বাংলার মাঠ-প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা বর্ণ-গন্ধ ও প্রাচুর্যকে কয়েকটি মুহূর্তের জন্য মনের গহনে লুকিয়ে থাকা বসন্ত সম্ভারের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে উদ্যাপন করা যাক—
গ্রামের কাঁচাপথ মাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। আঁকাবাঁকা পথ, কিছুদূর গিয়েই যেন কারো বাড়িতে ঢুকেছে। আসলে সেটি বাঁক। সেখানে আছে দুটি খড়ের পালুই, গোয়াল ঘর, গৃহস্থবাড়ির বিবর্ণ কাচারি ঘর। তারপর পাশাপাশি দুটি টঙ দোকান। দুপুর বলে খদ্দের কম। দোকানের উল্টোদিকে একটা পুকুর, ঘাটে দুরন্ত কিশোরদের দুপুরের প্রস্তুতি। কিছুটা এগোলে দু পাশে আর কোনো গাছ নেই। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ। বিস্তৃত সবুজের কার্পেট। দামাল বাতাস তাতে ঢেউ তাড়িয়ে ফেরে। শস্যভূমি ছুঁয়ে সে বাতাস পৌঁছে যায় দিগন্তরেখার পাশে, যেখানে দু-একটি বাঁশঝাড়, নিঃসঙ্গ তাল গাছ, বুনো ঝোপঝাড় আর শনেছাওয়া একটা উঁচু ঢিবি, লাউয়ের মাচা। এখান থেকে আরেকটি গ্রামের শুরু, নাম ফুলেশ্বরী। ‘রাইফেলটা কাঁধে তুলে নিয়ে ছোট্ট টিলাটার ওপরে এসে দাঁড়াই। সামনে তাকাই। বিরাট আকাশ। একটা লাউয়ের মাচা। কচি লাউ ঝুলছে। বাতাসে মৃদু দুলছে। কয়েকটা ধানক্ষেত। দুটো তালগাছ। দূরে আর একটা গ্রাম।’ (সময়ের প্রয়োজনে-জহির রায়হান)।
হঠাত্ কিছু তীব্র অথচ মধুর ঘ্রাণ সমস্ত ভাবনাকে এলোমেলো করে দিলো। মনে হলো শৈশব-কৈশোরের সমস্ত অনুভূতির মধ্যে ছড়িয়ে থাকা পরম আদরের ধন। এমন মনে না হবারও কোনো কারণ নেই। সত্যিই যে ভাঁটফুল ফুটেছে পথের দু ধারে। একটি দুটি নয়, অসংখ্য। বুকভরে শ্বাস নিচ্ছি ঘনঘন। অনেকদিন পর যেন শৈশবের হারিয়ে যাওয়া প্রিয় গন্ধ খুঁজে পেয়েছি। ‘একদিন অমরায় গিয়ে/ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিলো ইন্দ্রের সভায়/বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো কেঁদেছিলো পায়।’ (জীবনানন্দ দাশ)
সময় এগিয়ে যায়, পাল্লা দিয়ে আমরাও। তৃষ্ণার্থ চোখ আকণ্ঠ সবুজে ডুবে থাকে। হঠাত্ এক খণ্ড লালের রাজ্যে দৃষ্টি আটকে যায়। চিরায়ত বাংলার অন্তরঙ্গ শিমুল। সত্যিই বসন্ত নেমেছে শিমুলের উত্সবে। নাগরিক উদ্যানে দুষ্প্রাপ্য হলেও গ্রামে বেপারিদের চোখ এড়িয়ে বেঁচে আছে দু-চারটি। কিন্তু পলাশ পাই না একটাও। কোনো কোনো গাছে পাতা গজানোর প্রস্তুতি, এই নান্দনিকতাও দারুণ উপভোগ্য; এই পাতা কাঁচাসবুজ, তামাটে কিংবা লালচে, মসৃণ, কোমল, তুলতুলে। চৈত্রের প্রথমভাগেই মেহগনি, দেবদারু, জারুল, দেশিগাবসহ অসংখ্য গাছে নতুন পাতার উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে। এটিই বসন্তের আকর্ষণীয় মুহূর্ত।
প্রায় তিন কিলোমিটার ঘুরে, দিগন্তরেখার পাশঘেঁষে সবুজ মাঠের পূর্বপ্রান্ত ছুঁয়ে আমরা এসে দাঁড়াই ফুলেশ্বরীর স্কুল মাঠে। মাঠের একপ্রান্তে স্কুল, অন্যপ্রান্তে কয়েকটা দোকান, একটা খোলা ঘর। সম্ভবত মক্তব। একটু পরেই মনে হলো আমাদের মাথার ওপর যেন আরেকটি ছাদ। এখানকার সবকিছুকে ছায়া দিয়ে রেখেছে একটি বিশালাকৃতির মেঘশিরীষ। ভাবি, এই মেঘশিরীষটি বাদ দিলে জায়গাটির আর কোনো সৌন্দর্য কি অবশিষ্ট থাকে? এখানে গাছটির কত বিরাট ভূমিকা। আমরা মাঠের ধারের টঙ দোকানে গিয়ে বসি। দখিনা আলুথালু বাতাস আমাদের ভিজিয়ে দিতে থাকে বার বার। নিস্তব্ধ চারপাশ। দুটি টিয়াপাখি ছন্দ তুলে উড়ে গেল। ধারেকাছেই হয়তো বাসা বেঁধেছে ওরা। আমি স্বপ্নকাতর বিকেলের প্রতীক্ষায় থাকি। কখন মলিন হবে দিনের আলো, গোধূলিরঙ ছড়িয়ে পড়বে দূর সবুজের গায়ে। পাখিরা ফিরবে ঘরে, তৃণঝোপের ঘনায়মান অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে আরেকটি প্রসন্ন বিকেল।
শীতের শেষে ফাগুনের আগেভাগেই গাছে গাছে আমের মুকুল উঁকি দেয়। বসন্তের প্রথমভাগ জুড়ে তার মৌ মৌ গন্ধে উতলা হয় প্রকৃতি। আম্রমুকুল শুধু বসন্তেরই সূত্রধর নয়, বসন্তের সকল পুষ্পরাজিরও বার্তাবহ। শিমুলতলা থেকে ফুল কুড়িয়ে জড়ো করা ছিল আমাদের কাজ। বাসি ফুলের পরাগধানি খুলে নিলে সেগুলোকে মোমবাতির মতো দেখায়। মাঝে মাঝে আমরা ঘুড়ি নিয়ে পুবের সরু ছায়াপথের কাছে চলে যেতাম। সেখানে ফুটে থাকত অসংখ্য ভাঁট ফুল। এ ফুলের তীব্র বুনো গন্ধ ছড়িয়ে থাকত চারপাশে। ঠাকুরদের পোড়ো দালানের ফাঁকফোকরে ফুটত দণ্ডকলস। ধামার মতো এই সাদা ফুলের গোড়ায় মধু থাকে। সে খবর আমাদের ভালোই জানা ছিল। তখন এসব ওষধি গাছের কমতি ছিল না। আমরা সুযোগ পেলেই এসব গাছ খুঁজে বের করতাম।
এবার নাগরিক উদ্যানে ফুলেল বসন্ত দেখা যাক। বসন্তের ঝলমলে ফুল অশোক ঢাকায় মোটামুটি সহজলভ্য, রমনা পার্কে আছে অশোককুঞ্জ, বোটানিক্যাল গার্ডেনেও সুদৃশ্য বীথি আছে। গুচ্ছবদ্ধ এ ফুল লাল-হলুদ মেশানো। অশোক বহুপৌষ্পিক ও আকর্ষী। ‘আসত তারা কুঞ্জবনে চৈত্র জ্যোত্স্নারাতে/অশোক শাখা উঠত ফুটে প্রিয়ার পদাঘাতে।’ বসন্তের চঞ্চল ফুল মাধবী ও নীলমণি। প্রাক-বসন্তের মোহনীয় ফুলও বটে। রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বাংলা একাডেমি ও বলধা গার্ডেনে চোখে পড়ে। অনেকে মধুমালতী বা মধুমঞ্জরিকে ভুল করে মাধবী বলেন। কিন্তু মাধবী শুধু বসন্তেই ফোটে।
নীলমণির সৌন্দর্য রবীন্দ্রনাথেরও চোখ এড়ায়নি। এমনকি নীলমণি নামকরণের কৃতিত্বও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরই। তিনি লিখেছেন—
‘ফাল্গুন মাধুরী তার চরণের মঞ্জীরে মঞ্জীরে
নীলমণিমঞ্জরির গুঞ্জন বাজায়ে দিল কিরে?
আকাশ যে মৌনভার,
বহিতে পারে না আর,
নীলিমাবন্যায় শূন্যে উচ্ছলে অনন্ত ব্যাকুলতা,
তারই ধারা পুষ্পপাত্রে ভরি নিল নীলমণিলতা।’
বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই মাধবী উচ্চাসনে পৌঁছুতে পেরেছে। তিনি লিখেছেন একাধিক কবিতা।
‘বসন্তের জয় রবে
দিগন্ত কাঁপিল যবে
মাধবী করিল তার সজ্জা।’
নীলমণির চেয়েও কম সময়ের জন্য মাধবী ফোটে। হঠাত্ করেই অসংখ্য ফুলে ফুলে ভরে ওঠে গাছ। অপরূপ তার সজ্জা। ডালের আগায় ছোট ছোট থোকায় অজস্র ফুল, পাঁশুটে রঙ, তাতে হলুদের ছিটা। ভারি সুগন্ধি। তাতে ভোমরাও পাগল হয়। বর্তমানে দুর্লভ হয়ে উঠেছে। একসময় সিলেটের বনে অঢেল থাকলেও বর্তমানে খুব বেশি দেখা যায় না। বসন্তের অন্যতম ফুল পলাশ নিজস্ব আবাস শালবনে এখন প্রায় বিলুপ্ত। শুধুমাত্র পরিকল্পিত বাগানেই দু-একটি পলাশ চোখে পড়ে। সত্যি সত্যি অরণ্যের অগ্নিশিখা যেন, মাতিয়ে রাখে চারপাশ। পলাশহীন বসন্তের কথা কি ভাবা যায়! গ্লিরিসিডিয়ার উদার প্রস্ফুটন বসন্তের আগমন ও অবস্থানকে কমনীয় করে। রক্তকাঞ্চনও প্রাক-বসন্তে ফোটে। তাতে মণিমালা যোগ করে ভিন্নমাত্রা। নিষ্পত্র উদালের হলুদ ঝুলন্ত মঞ্জরি বসন্তের পুষ্পউত্সবকে বর্ণিল করে। ঢাকায় বিক্ষিপ্তভাবে মহুয়া চোখে পড়ে। মহুয়া দেখতে হলে যেতে হবে রমনা পার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে। মহুয়ার সুধা পান করতে শুধু মানুষই ভিড় করে না, পাখিরাও আসে দলবেঁধে। ‘মহুয়া বসন্তেরই অনুচর, আর ওর রসের মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে উন্মাদনা।’ শেষ ফাগুনে ফোটে কনকচাঁপা, মুচকুন্দ, হাপরমালী। কনকচাঁপা বা রামধনচাঁপা বসন্তের উল্লেখযোগ্য ফুল। পাহাড়ি ফুল হলেও সমতলে দু-চারটি দেখা যায়। পাতা লম্ব-ডিমাকার। শীতের শেষে গাছে প্রথমে কচি তামাটে পাতার উচ্ছ্বাস শুরু হয়। তারপরই হলুদ সুগন্ধি ফুলের ছোট ছোট থোকায় গাছ ভরে ওঠে। ফুল ৩-৪ সেন্টিমিটার চওড়া, পাপড়ি ১২, মুক্ত বৃত্যাংশের সমান লম্বা। সুউচ্চ গড়নের হওয়ায় গামারির বাদামি-হলুদ ফুল ফোটে নীলাকাশের গায়ে। তার মধুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।
শীত শেষ হবার আগেই রক্তকাঞ্চন ফুটতে শুরু করে। পাতা দেখেই এ গাছ চেনা যায়। দুটি পাতা, গোড়ায় জোড়া, মাথা দুটো আলগা। ফুল গাঢ় বা হালকা বেগুনি রঙের, প্রায় ৪-৫ সেন্টিমিটারের মতো চওড়া, ৫ পাপাড়ি, একটি আবার একটু বড়, তাতে নানান কারুকার্য। ঝাঁঝালো সুগন্ধি। বাকি কাঞ্চনগুলো অন্যান্য সময়ে ফোটে। কুরচি পাহাড়ি ফুল হলেও ইদানিং আমাদের চারপাশেও দেখা যায়। বসন্তের মাঝামাঝি সময় থেকে ফুটতে শুরু করে। এর আরেক নাম গিরিমল্লিকা। গাছ ছোট ধরনের। পাতা বেশ বড় আর চ্যাপটা। তবে ছোট পাতার গাছও দেখা যায়। সাদা ছোট ছোট ফুল, দু সেন্টিমিটার চওড়া, মধুগন্ধি। ঝরাফুল আর তাজা ফুলের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।
পারিজাত বা মাদার ফুলকে বেশ পবিত্র মনে করা হয়। এমনিতে খুব সাদামাটা ফুল মনে হলেও একটু ভালোভাবে দেখলে মনে হবে সত্যিই তো সুন্দর। পাঁশুটে-সবুজ কাণ্ড, কাঁটাভরা, লোকে লাগায় বাড়ির সীমানায়। একটি ডাঁটার মাথায় তিনটি পাতা থাকে। শীতে পাতা ঝরিয়ে বসন্তে ফুল। ৩০-৪০ সেন্টিমিটার লম্বা ডাঁটায় ঠাসা ফুল, গোড়া থেকে ওপরের দিকে ফোটে। ফুলও বেশ বড়, গড়নটা পলাশের মতো, তবে রঙ গাঢ়-লাল, বেরিয়ে থাকে কেশরগুচ্ছ। বেশ ঝলমলে এই ফুল।
ফাল্গুনের শেষদিকেই শীতঘুম শেষে জেগে ওঠে শটি। প্রথমে মাটির নিচ থেকে দু-একটি পাতা উঁকি দেয়। তারপর অন্যান্য পাতাগুলো বের হতে থাকে। পাতাগুলোকেই সবাই ফুল মনে করে। আসলে হালকা হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল থাকে পাতার কোলে। সব মিলিয়ে ভারি সুন্দর। গ্লিরিসিডিয়া আমাদের দেশি ফুল নয়। তবে বসন্তে তার পাতাহীন ডালে ডালে অসংখ্য ফুলের বান ডাকে। ফুল হালকা গোলাপি বা বেগুনি। ফোটে থোকায় থোকায়। গড়ন অনেকটা শিমফুলের মতো, হালকা সুগন্ধি। বসন্তের মাঝামাঝি সময়ে বরুণ ফুটতে শুরু করে। পানির কাছেই থাকতে পছন্দ। এ ফুল মৌসুমে সাদা ফুলের অভাব ঘোচায়। তবে ফুল একেবারেই সাদা নয়, কিছুটা বেগুনি আঁচযুক্ত। বোঁটা ৩-৫ সেন্টিমিটার লম্বা। পাপড়ির সংখ্যা ৪, মুক্ত। ফল দেখতে অনেকটা কদবেলের মতো। গ্রামের স্থানীয় নাম পানি বরুনা। বসন্তে থোকা থোকা ঝুলন্ত ফুল ফোটে, বোঁটা ৪-৫ সেন্টিমিটার লম্বা, পাপড়ি ৮-৯টি, সাদা ও রসাল। আকরকাঁটা বন-পাহাড়ের গাছ। সেখানে লাগাতে হয় না, আপনাআপনিই হয়। এরাও সবপাতা ঝরিয়ে একেবারে উদোম হয়ে থাকে। বসন্তের শুরুতে পাতাহীন গাছ ছোট ছোট সাদা ও হালকা সুগন্ধি ফুলে ছেয়ে থাকে। ফুলের বৃতি ও বোঁটা রোমশ। ফল ডিমাকার, ১ সেন্টিমিটার লম্বা, বীজ একটি।
নাগেশ্বর গাছের গড়ন বেশ সুন্দর। গোড়ার দিকটা চওড়া, ক্রমেই ওপরের দিকে সরু হতে থাকে। পাতার বুনটও খুব নিবিড়। পাতা ঝরিয়ে কখনো ন্যাড়া হয় না। বসন্তে এক বৃন্তে দুটি ফুল ফোটে, ইঞ্চি দুয়েক চওড়া, ছড়ানো ৫টি সাদা পাপড়ি, মাঝখানে একথোকা সোনালি কেশর, অপূর্ব সুগন্ধি।
বসন্তে আমাদের বন-পাহাড়ে ঘুরে বেড়ালে নিঃসন্দেহে আরো অনেক ফুলের সন্ধান মিলবে। সেখানে হয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে নতুন কোনো পুষ্পসম্ভার। যা আমাদের পরম কাঙ্ক্ষিত।