ঋতুকন্যা হেমন্ত দোলা দেয় মনে

প্রকৃতির ম্লান, ধূসর ও অস্পষ্টতার অনুভূতি যখন হানা দেয় চেতনলোকে, তখনই বোধকরি বুঝতে পারা যায় হেমন্তের আগমন ঘটেছে। হেমন্ত আসে মৌন, শীতল ও অন্তর্মুখীনতা নিয়ে। বাঙালির উত্সব বলতেও হেমন্ত; যার নেপথ্যে সুুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলার হাজার বছরের কৃষিসংস্কৃতি। ষড়ঋতুর এদেশে প্রকৃতির বর্ণছটা আর নবান্নের আমেজে হেমন্ত যখন হাজির হয় বাংলার ঘরে ঘরে, প্রকৃতিতে, তখন হালকা কুয়াশা চুইয়ে নামে প্রান্তরে। উঠোনে ঝরে পড়া শিউলি কিংবা বুনো ঘাসের ডগায় শিশিরের সকরুণ মিনতি ফুটে ওঠে যেন! বুকে স্রোত জাগিয়ে ভাটি অভিমুখে তরতরিয়ে ছুটে চলে বাঁকফেরা নদী। উত্তরের হিম হিম বাতাসে শুষ্ক হয়ে আসে শরীর, তবু নদীর চরে কিশোরের দল ঘুড়ি-উত্সবে মাতে। নদীতে ভেসে চলে জেলেদের ডিঙি, কখনো বেদেবহর। বিলে, মৌসুমের মাছ ধরা উত্সবে গ্রামের শৌখিন মাছশিকারির ঢল, পলো হাতে। চোখ আটকে যায় শুকনো জলাশয়ে ঝিমানো কচুরিপানার বেগুনি-শাদা ফুলকলিতে। ফসলহীন খেতের আলপথে জংলি ফুল পাখা মেলে। পথে পথে সবুজ বুনোলতায় পতঙ্গের খুনসুটি। একটি-দুটি ফুলও ঝরে পড়ে ঘাসের নরম কার্পেটে। কাঁঠালিচাঁপার গন্ধ ডাকে দুপুরের সঙ্গী হতে। মনে হয়, কোনো নবীনা কনেবউয়ের মুখের উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে। লাজুক রঙের বাহার। পথের বাঁকে হালকা বাতাসে ওড়ে হেমন্তের ধুলো, ধানের পরশ মাখা। নির্জন ব্যালকনিতে খসে পড়ে হলুদ পাতা, কিছু ফুল। ঘুঘুডাকা নিঝুম বিকেল, কানে ফুলের ঝুমকো বসিয়ে গালফোলা চঞ্চল কিশোরী গাছে হেলান দিয়ে শোনে বিকেলপাখির কিচিরমিচির। হিম হিম, স্বল্পায়ু দিন ক্রমে মিইয়ে যায় সন্ধ্যায়, চিকন চাঁদের মৃদু আলোয়। সন্ধ্যার আকাশ থেকে দু-একটা তারাও হয়তো খসে পড়ে! প্রকৃতিতে ব্যাপক প্রভাবসঞ্চারী, উত্সবের আনন্দ নিয়ে আসা শরতের শাদা ঝালর মুছে যেতে না যেতে কখন যে শান্ত-সুন্দর-স্নিগ্ধ হেমন্ত প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে এমন মনোলোভা দৃশ্যে, তা টেরই পাওয়া যায় না। আবহমান বাংলা ছাড়া কোথাও কি মেলে এমন অপরূপ দৃশ্য? হেমন্তপ্রকৃতির ছবি এর চেয়েও হয়তো অনেক বেশি শোভাবেষ্টিত, যা বর্ণনাতীত। হেমন্ত শুধু দৃশ্যের নয়; গন্ধের, শস্যের, আলস্য-পূর্ণতা-বিষাদের করুণতামাখা লাবণ্যময়ী ঋতু হেমন্ত। তবে উপলব্ধির যথার্থ অনুবাদ অসম্ভব হলেও হেমন্তের এই রূপ প্রত্যক্ষ করে মনে পড়ে যায় বাংলার প্রকৃতি নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের অমর উচ্ছ্বাসকাব্য—‘এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী’র কথা। আবার হেমন্তের এমন মনোহারী রূপে জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথা না বললেই নয়, ‘আবার আসিব ফিরে, ধানসিঁড়িটির তীরে, এই বাংলায়... কার্তিকের নবান্নের দেশে... কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এই কাঁঠাল ছায়ায়...।’ 

প্রকৃতিতে প্রত্যেকটি ঋতু তার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়। কোনো ঋতুর প্রকৃতি রুদ্র, কোনো ঋতু শান্ত-সুস্থির। হেমন্ত সুস্থির ঋতু হলেও মানবহূদয়ে যেমন প্রভাববিস্তারী, তেমনি বাংলা সাহিত্যে হেমন্তের প্রভাবের ছবিও অত্যুজ্জ্বল। কবিতা, কথাসাহিত্য, সংগীত, নাটক, সিনেমা, চিত্রকলায় রয়েছে হেমন্তের ব্যাপক উপস্থিতি। হেমন্ত প্রকৃতির রূপ প্রভাব বিস্তার করে আছে রবীন্দ্রসাহিত্যে। তিনি ভাববাদী কবি হলেও তাঁর কবিতা-গান-নাটক-প্রবন্ধে প্রকৃতির অপূর্ব লীলালাস্য সসম্ভ্রমে উপস্থিত। তিনি বিভিন্ন ঋতুর ভেতর নানা রঙ ও বর্ণের খেলা যেমন লক্ষ করেছেন, তেমনি তা উপজীব্য করে নির্মাণ করেছেন সাহিত্য ভাণ্ডার। রবীন্দ্রনাথের ‘হিমের রাতে’ গানে বলেছেন,

‘হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে,

হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে।

ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো ‘দীপালিকায় জ্বালাও আলো,

জ্বালাও আলো, আপন আলো, সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।’

হেমন্তের আগমনে প্রকৃতির পরিবর্তনের আভাস উল্লেখ করা হয়েছে গানের বাণীতে। ঘরে ঘরে আহ্বান এসেছে, আলো জ্বালানোর। আবার ‘নৈবেদ্য স্তব্ধতা’য় বলেছেন, ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে/জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে/শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার/রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার/স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’ কবির মতে, হেমন্তে সোনালি ফসলে প্রকৃতির আভায় নতুন ছবি ফুটে উঠেছে। সেখানে আছে এক অনাবিল প্রশান্তি। জনমানবহীন চরাচরে নেই কোনো শব্দ, গতি। রয়েছে স্তব্ধতাও।

নির্জনতার কবিখ্যাত জীবনানন্দ দাশ হেমন্তকে কবিতার আয়নায় প্রতিবিম্বিত করেছেন এক অনন্য রূপকল্প, স্বপ্ন ও বাস্তব জগতের বিচিত্র বর্ণের মনোলোভা রূপে। জীবনানন্দ দাশ বাংলার প্রকৃতিকে যেমন নির্জনভাবে, একান্তভাবে উপলব্ধি করেছেন, বোধকরি রবীন্দ্রনাথপরবর্তী আর কোনো কবি প্রকৃতিকে এতটা আপন করে স্থান দিতে পারেননি তাঁদের কবিতায়। শস্যভরা হেমন্ত ঋতুকে সবচেয়ে বেশি মহিমান্বিত করেছেন জীবনানন্দ দাশ। তিনি প্রেমে-কামে, দেহে-দেহহীনতায়, সৃষ্টিতে, তৃপ্তিতে, বিরহে, বিরতিতে হেমন্তকে উপস্থাপন করেছেন। তবে জীবনানন্দ দাশের হেমন্তপ্রেমী সত্তার পূর্ণ বিকিরণ লক্ষ করা যায় তাঁর ‘গোধূলিসন্ধির নৃত্য’ কবিতায়-

‘দরদালানের ভিড়—পৃথিবীর শেষে/যেইখানে পড়ে আছে—শব্দহীন—ভাঙ্গা/সেইখানে উঁচু উঁচু হরীতকী গাছের পিছনে/হেমন্তের বিকেলের সূর্য গোল—রাঙা/চুপে চুপে ডুবে যায়—জ্যোত্স্নায়।/পিপুলের গাছে বসে পেঁচা শুধু একা/চেয়ে দেখে; সোনার বলের মতো সূর্য আর/রুপার ডিমের মতো চাঁদের বিখ্যাত মুখ দেখা।/হরীতকী শাখাদের নিচে যেন হীরের স্ফুলিঙ্গ/আর স্ফটিকের মতো শাদা জলের উল্লাস;/নৃমুণ্ডের আবছায়া—নিস্তব্ধতা/বাদামী পাতার ঘ্রাণ—মধুকুপী ঘাস।’

জীবনানন্দ দাশ কবিতায় যে উপমা, চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন তা হেমন্তের অনুষঙ্গ। প্রকৃতিজাত এসব শব্দের ব্যবহার তাঁর কবিতায় সুপ্রচুর। তাঁর কবিতায় হেমন্ত, প্রকৃতি আর আত্মমগ্নতা একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।

হেমন্ত প্রকৃতিতে যে বিপুল পরিবর্তন আনে তা একইসঙ্গে মানবমনেও প্রভাব ফেলে। তবে এই পরিবর্তন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে ঘটে না। প্রকৃতি যাকে করে তুলেছে নিখিলের শিল্পী, সে সৃষ্টিশীল মানুষটি যদি বিশেষ করে কবি হন, তাহলে তাঁর মনোজগতে ঘটে যায় বিপুল পরিবর্তন। প্রকৃত কবি উপস্থিত কালের সঙ্গে মিলিয়ে ধরার চেষ্টা করেন পরিবর্তনের সূচকগুলো। এদিক থেকে বলা চলে হেমন্ত সাধারণ মানুষের কাছে নিছক ফসল কাটার ঋতু হলেও, কবির কাছে সৃষ্টি-বিরাম-প্রাণের উচ্ছলতার নাম। হেমন্তে বাংলার প্রান্তরে এক হলুদ রঙের বিস্তীর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। মাঠে সোনালি ধানের সমাহার, ধান কাটা, ধানের আঁটি গরু আর মোষের গাড়িতে বাড়ি বয়ে নিয়ে আসা, পল্লি প্রকৃতির এই নৈসর্গিক দৃশ্যাবলি হেমন্তের এক অনাবিল অবগাহন বলা যায়! বোধকরি এ কারণেই কবি-সাহিত্যিকরা তাঁদের কবিতা-গানে হেমন্তের কৃষি-ঐতিহ্যের চিরন্তন এই দৃশ্য আঁকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

কৃষিপ্রধান এদেশের জীবনযাত্রার রূপ প্রকৃতি এবং ঋতুভেদে নিয়ন্ত্রিত। ঋতুচক্রের হিসেবে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্ত। হেমন্ত সত্যিকার অর্থে বাংলার কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে দেয়। আর কবিদের দেয় অফুরন্ত কল্পনাশক্তির অনুষঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ থেকে শুরু করে আজকের তরুণতম কবির কবিতায়ও হেমন্তের উপস্থিতি দৃশ্যমান। শামসুর রাহমান নাগরিক চাঁদের জোছনায় হেমন্ত খুঁজে পেয়েছেন, আল মাহমুদ তাঁর লোকজ শ্লোকের মাঝে হেমন্তকে ধারণ করেছেন। অন্যদিকে বিনয় মজুমদার বিষাদাক্রান্ত পৃথিবীর এক ঋতুর ফুলকে অন্য ঋতুতে ফুটিয়েছেন কাব্যিক ব্যঞ্জনায়। এছাড়া রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, আবুল হাসানের কবিতায় হেমন্ত এসেছে বিচিত্র ভঙ্গিতে, রূপকে, চিত্রকল্পে। ফলে হেমন্তের দৃশ্যগন্ধে পূর্ণ আলো-অন্ধকারের এই কল্পলোক বাংলা কবিতায় এক নতুন সংযোজন বললেও অত্যুক্তি হয় না।