৪৭ বছর বয়সী পুলিশ কনস্টেবল শাহীন (ছদ্মনাম)। চাকরি করতেন নোয়াখালীর একটি থানায়। এখন তিনি মাদকাসক্ত। চিকিৎসা নিচ্ছেন রাজধানীর একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে। অন্যদিকে সাব ইন্সপেক্টর হাফিজ (ছদ্মনাম)ও একই নিরাময় কেন্দ্রে চিকিত্সারত। বয়স তার ৩৬ বছর। চাকরি করতেন একই জেলার একটি থানায়।
তাদের কর্মস্থল থেকেই রাজধানীর ওই নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। ওই নিরাময় কেন্দ্রে কথা হয় তাদের সঙ্গে। শাহীন বললেন, নোয়াখালীর ওই থানায় থাকাকালীন প্রায়ই মাদকবিরোধী অভিযানে ডিউটি করতেন। সেখান থেকেই ইয়াবা পাচারকারী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। ইয়াবা সেবনকারীদের কাছে জানতে পারেন, ইয়াবা সেবন করলে যৌন উত্তেজনা বাড়ে। এ কথা শুনেই ইয়াবার প্রতি তার আগ্রহ বাড়ে। ইয়াবাসক্তদের কাছ থেকেই সেবন করার সব নিয়ম-কানুন রপ্ত করে ফেলেন। এভাবে ধীরে ধীরে ইয়াবার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন শাহীন।
ওই পুলিশ কনস্টেবল বলেন, প্রথম একটা দুইটা দিয়ে শুরু হলেও একপর্যায়ে আমি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ি। কারণ, ইয়াবা খেতে আমার তো কোনো টাকা লাগতো না। মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীরাই ইয়াবা দিত। ওরাই আসর মিলাতো। আমিও মধ্যরাতে যোগ দিতাম ওদের আসরে। ওরা খুব কদর করতো। ইয়াবাও খেতাম, টাকাও পেতাম।
অন্যদিকে এসআই হাফিজ বলেন, রাত জেগে আমাদের ডিউটি করতে হয়। ছুটি কম। শরীরে ক্লান্তি আসে। জানতে পারি, ইয়াবা খেলে শরীরে কোনো ক্লান্তি আসে না। ইয়াবা সেবনকারীদের কাছ থেকেই জানতে পারি। ওরাই ইয়াবা খেতে উত্সাহিত করে। বলে, স্যার খেয়ে দেখেন। উপকার পাবেন। বিশেষ করে, এটি নাকি যৌন উত্তেজনাও বাড়ায়। তখন মনে হলো, এটা তো আমার জন্যই দরকার। পুলিশে চাকরি করি। হাতের নাগালেই ইয়াবা পাই। খেতে তো আর টাকা খরচ হতো না। বাড়ি কক্সবাজার জেলায়। বুঝতেই পারছেন, ইয়াবার রাজ্যে ছিলাম। হাত বাড়ালেই সেখানে ইয়াবা মেলে। প্রায়ই আমরা অভিযান চালিয়ে ইয়াবা উদ্ধার করতাম। সেখান থেকেই রেখে দিতাম। ইয়াবা সেবনকারীদের সঙ্গেই খেতাম। ওরা আসর বসিয়ে আমাকে স্পেশালভাবে দাওয়াত দিত। এভাবে ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ি। যেহেতু খেতে টাকা লাগতো না সেহেতু খাওয়ার মাত্রাও বেড়ে যায়।
জানা যায়, শাহীন ও হাফিজ সবার মতোই পুলিশে চাকরি করতোন। ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ইয়াবা সেবন করে পুরোপুরি ইয়াবা আসক্ত হয়ে পড়েন। কর্মস্থলে সহকর্মীদের সঙ্গে গালমন্দ এমনকি গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করেন না। তখন তাদের নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। গত কয়েক মাস ধরে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে চিকিত্সা নিচ্ছেন শাহীন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চান। পুলিশের এই কনস্টেবল বলেন, এখন চাকরি হারানোর পথে। আমি তো মরছি। পুলিশের অন্য কেউ যেন এ পথে পা না বাড়ায়। পবিত্র পোশাক পরেও লোভ সামলাতে পারিনি। তবে খুব কাছ থেকে দেখেছি এই জগতটাকে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে গেছে ইয়াবা। আমাদের পুলিশের লোকও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়। তাদের ঘুষ নেওয়া বন্ধ করতে হবে।
এসআই হাফিজ আকুতি জানিয়ে বলেন, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাই। এখন আমি বউ, ছেলে-মেয়ে, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে অমানুষ হয়ে গেছি। পুলিশের শপথ নিয়েও রক্ষা করতে পারিনি। আমি চাই, পুলিশের কেউ যেন পবিত্র পোশাক পরে আমার মতো অপরাধে না জড়ায়। অন্যদিকে পুলিশ যেন মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের কাছ থেকে ঘুষ না নেয়। মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া আর নিজ সন্তানকে জবাই করা একই কাজ।
ইত্তেফাক/আনিসুর