হকারদের কল্যাণে সিদ্ধান্ত বহু বাস্তবায়ন হয়নি একটিরও

 
পথচারীদের পথচলা নির্বিঘ্ন ও ঢাকার রাজপথ হকারমুক্ত করতে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ ঝুলে আছে গত কয়েক বছর ধরে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এ জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে দায়ী করছেন হকার নেতৃবৃন্দ। তারা বলছেন, আমলারা তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করতেই এ সমস্যাকে পরিকল্পিত উপায়ে জিইয়ে রাখছেন।
 
ঢাকার পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করার জন্য ফুটপাতের হকারদের জীবিকার কথা বিবেচনাসহ এক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল— হকারদের ছবিযুক্ত তালিকা তৈরি, হলিডে মার্কেট তৈরি এবং তালিকাভুক্ত হকারদের সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে বহুতল বিশিষ্ট মার্কেট নির্মাণ করে তাদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন। এ ছাড়া ৫০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত ঋণ বিতরণ, বেকার হকারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোসহ নানা প্রস্তাবনার একটি নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়। এ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এক সভায় ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
 
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ইত্তেফাককে বলেন, নগরীর হকার সমস্যা একটি জটিল বিষয়। এ সমস্যা সমাধানে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনা রয়েছে। সেই মোতাবেক সমস্যা সমাধানে হকারদের পুনর্বাসন, তাদের মাঝে সুদমুক্ত ঋণ বিতরণসহ হকারদের নানা কর্মসূচির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
 
তবে এ নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে প্রস্তাবনার ফাইলে ধুলো জমেছে। অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে লক্ষাধিক হকারের ভবিষ্যত্।  অসহায় ও দরিদ্র হকারদের নিয়ে একটি মহল গভীর ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি হাতছাড়া না করতেই নানা ষড়যন্ত্র চলছে বলে জানা গেছে। হকারদের পুনর্বাসনে কার্যত বাস্তবমুখী কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে না।
 
এদিকে ঢাকায় লক্ষাধিক হকার কর্মরত থাকলেও উভয় সিটি করপোরেশনে হকারদের সঠিক কোনো সংখ্যা কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, তাদের কাছে ৫ হাজার ২৫৬ জনের একটি  তালিকা রয়েছে। আর উত্তরে হকারদের কোনো তালিকাই নেই। তবে দক্ষিণের প্রণীত হকার তালিকা নিয়ে হকার সমিতি ও উভয় সিটি করপোরেশনের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
 
এ দিকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার জন্য ঋণ ও অনুদান চেয়ে গুলিস্তান-মতিঝিল, শাহবাগ ও নিউমার্কেট এলাকার প্রায় ৪০০  হকার বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের মাধ্যমে আবেদন করে। কিন্তু  দীর্ঘ দিনেও এ ব্যাপারেও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। বিদেশে পাঠানোর বিষয়টিও আছে ঝুলে।
 
বাংলাদেশ হকার্স লীগ ও হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এমএ কাশেম বলেন, হকারদের সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে নগরভবনে মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের সভাপতিত্বে হকার্স প্রতিনিধিদের সাথে পর পর কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভাগুলোতে ফুটপাতের হকারদের তালিকা করা, গাড়ি চলাচলের রাস্তার হকারদের উচ্ছেদ করা, তালিকাভুক্তদের আইডি কার্ড দেওয়া, লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করা, হলিডে মার্কেট চালু করা, তালিকাভুক্ত যুব হকারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে বিদেশে চাকরির ব্যবস্থা করা, টহলভ্যান গাড়ি দেওয়া এবং বয়োবৃদ্ধ হকারদের বহুতল বিশিষ্ট মার্কেটে দোকান দিয়ে স্থায়ী পুনর্বাসন করাসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় একটি সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন হয়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাও ঝুলে রয়েছে।
 
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল ইত্তেফাককে বলেন, প্রায় ছয় হাজার হকারের জন্য ঋণ সুবিধা, মোবাইল ভ্যান গাড়ি প্রদান ও প্রশিক্ষণের ব্যয় বাবদ ৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা খরচের অনুমোদন চেয়ে গত ২৭ নভেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি চাহিদাপত্র প্রেরণ করা হয়েছে। যা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থ বরাদ্দ হলেই হকারদের পূনর্বাসনের কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর