শামসুজ্জামান খান
সূচনাপর্বের তত্ত্ব-তালাশ
সেই কোন ধূসর অতীতে বাঙালির নববর্ষ উত্সব শুরু হয়েছিল গ্রামীণ বাংলাদেশের নিস্তরঙ্গ পরিবেশে, ক্ষুদ্র আয়োজনে, পারিবারিক বা গোষ্ঠীগতভাবে। এই আয়োজন ছিল আঞ্চলিক। এর কিছু উদাহরণ পেশ করি। বাঙালি কৃষকের পারিবারিক উত্সবের নাম ছিল, ‘আমানি’। ড. মুহম্মদ এনামুল হক ‘আমানি’ শব্দটির উদ্ভব নিরূপণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমানি’ শব্দটি আমপানীয় অথবা অম্লপানী এই দুই প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার শব্দ থেকে উত্পত্তি লাভ করে থাকবে।
প্রাচীনকালের আমানি অনুষ্ঠানের বিবরণ এরকম: চৈত্রসংক্রান্তির দিনগত রাতে বাড়ির গৃহিণী এক হাঁড়িতে স্বল্প পরিমাণ অপক্ব বা অসিদ্ধ চাল ছেড়ে দিয়ে সারারাত ভিজতে দেন এবং ওই হাঁড়ির পানিতে একটি কচি আমের ডাল বসিয়ে রাখেন। পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষের প্রথম দিনের সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে গৃহিণী ওই ভিজা চাল সকলকে খেতে দেন। আর ওই সময়ে হাঁড়ির পানিতে রেখে দেওয়া আমডালের পাতা সেই পানিতে ভিজিয়ে বাড়ির সকলের গায়ে ছিটিয়ে দেন। লোকবিশ্বাস, এতে গৃহে সারাবছর শান্তি বিরাজ করবে। কৃষি ফসলেরও কোনো ক্ষতি হবে না। যতদূর জানা যায়, ‘আমানিই’ নববর্ষের আদিম অনুষ্ঠান।
বাস্তব জীবনযাত্রার প্রয়োজন ও বিনোদন
নববর্ষের প্রথম দিন দরিদ্র, মেহনতি ও ঐতিহ্যপ্রেমিক বাঙালির জীবনে একটি উত্সব-আনন্দের ছোঁয়া যেমন দিয়ে যায়, তেমনি তাদের মধ্যে সারাবছরের প্রয়োজনের উপকরণ সংগ্রহ করে রাখারও একটি তাগিদ সৃষ্টি করে। আর এই দুই প্রয়োজনই মিটিয়ে এসেছে গ্রামবাংলার নানারকম বৈশাখী মেলা। মেলা ছিল চৈত্রসংক্রান্তি বা ১লা বৈশাখের সর্বজনীন উত্সব। সেকালের প্রায় নিশ্চল, রাস্তাঘাট ও যোগাযোগহীন গ্রামীণ বাংলাদেশের মানুষের সাংবাত্সরিক প্রয়োজন মেটানো এবং শখের জিনিস কেনাকাটার একমাত্র জায়গা ছিল মেলা। আবার বন্ধুবান্ধব, চেনাজানা লোকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ ও মিলনের স্থানও ওই মেলা। আর মনের আনন্দ ও বিপুল মানুষের চিত্তরঞ্জনের জায়গাও এই মেলা। কৃষ্ণলীলা, রামযাত্রা, বেহুলার ভাসান যাত্রা, জারি-সারি-মুর্শিদি, পুতুল নাচ, সার্কাস, নাগরদোলা ইত্যাদির আয়োজনে প্রাণবন্ত বাংলার মেলা। আমানি যেমন লুপ্ত লোকাচার, মেলা তেমন নয়। এর সঙ্গে বাস্তব জীবনযাত্রার প্রয়োজন ও বিনোদনের সম্পর্ক আছে বলেই মেলার ফাংশন চুকেবুকে যায়নি। নতুন আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং যোগাযোগব্যবস্থা উন্নততর হওয়ার কারণে বর্তমানে মেলা-সংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ বিস্তার ও নববিন্যাস ঘটেছে।
গ্রামীণ মেলা সুপ্রাচীন নববর্ষের অনুষঙ্গী আয়োজন। নববর্ষ উত্সবের সঙ্গে এর সম্পর্ক এখনো বিযুক্ত হয়নি। বরং নববর্ষ অনুষ্ঠানকে বৈচিত্র্যময় ও বর্ণাঢ্য করে তুলেছে গ্রামগঞ্জের এবং নাগরিক বৈশাখী মেলা। সাবেক কালের বৈশাখী মেলার সঙ্গে কৃষি-অর্থনীতির যোগ ছিল; এখনকার মেলা মূল অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। মেলার জন্য তৈরি করা হয় তাঁতের শাড়ি, পাঞ্জাবি, নকশিকাঁথা, শতরঞ্জি, পুতুল, মাটির কাজসহ নানা সৌখিন উপকরণ। এখন এসব উপকরণ নন-ট্র্যাডিশনাল আইটেম হিসেবে বিদেশে রপ্তানি হয়ে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করছে।
বছরের হিসাব-নিকাশ চুকানোর আনুষ্ঠানিকতা
বাংলা নববর্ষ উত্সবের আরেক আনুষ্ঠানিকতা হালখাতা উত্সব। এককালে গ্রামবাংলা এবং শহর অঞ্চলেও এ অনুষ্ঠান ব্যাপকভাবে উদ্যাপন করা হতো। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল নববর্ষের এক সর্বজনীন ও তাত্পর্যপূর্ণ আয়োজন। শুধু অর্থনৈতিক অনুষ্ঠান বলেই এর গুরুত্ব বেশি ছিল তা নয়; এর সামাজিক গুরুত্বও ছিল অনেক। যিনি নববর্ষের হালখাতার দিনে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পরিশোধ করে হিসাব হালনাগাদ করতে পারতেন তিনি শুধু দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে মিষ্টিমুখ করেই ফিরতেন না; আত্মমর্যাদা ও গর্ব নিয়েও ফিরতেন। আর যিনি এই বকেয়া শোধ করতে অপারগ হতেন তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতো এবং তাঁকে লোকসমক্ষে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকতে হতো।
‘হালখাতা’ এখন সেই উত্সবমুখর ব্যাপকতা হারিয়েছে। এর কারণ কৃষি-অর্থনীতি থেকে আমাদের পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী অর্থনীতিতে প্রবেশ। সাবেককালে গ্রামবাংলার ব্যাপক কৃষিজীবী সমাজের হাতে নগদ টাকার অভাব ছিল। ফসলের মৌসুমে, বিশেষ করে পাট বিক্রি করেই কৃষকরা নগদ পয়সার মুখ দেখতেন। অন্য সময়ে বাড়ির ধান, তরিতরকারি, হাঁস-মুরগি বা রবিশস্য বিক্রি করে দৈনন্দিন সংসারযাত্রা নির্বাহ করতেন। পাট বিক্রির টাকাতে পরিবারের সদস্যদের কাপড়চোপড় কিনে দিতেন; কিনতেন ইলিশ মাছ বা শিশুদের বায়নার কোনো জিনিস। এই অর্থনীতিতে বাকিতে মুদির দোকান বা অন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান থেকে দ্রব্যাদি কেনা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আর হালখাতার অনুষ্ঠানও ছিল তাই অপরিহার্য।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশ এখন আর লন্ডন, কলকাতা, করাচি, রাওয়ালপিন্ডির হিন্টারল্যান্ড নয়। আমাদের অর্থনীতি বিশ্বঅর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। তৈরি হয়েছে বিশাল ভোক্তাশ্রেণি। তাদের হাতে আছে প্রচুর নগদ পয়সা। এমতাবস্থায় গ্রামবাংলায়ও বাকিতে বিক্রির নেই সেই ব্যাপকতা। তাই হালখাতাও জৌলুস হারিয়েছে।
বাংলা সন ও তার সংস্কৃতি : সমকালীন গ্রামীণ প্রেক্ষাপট
আজ থেকে ৫০ বছর আগেও গ্রামীণ বাংলাদেশে বাংলা সন ও পঞ্জিকার ব্যবহারিক, ঐতিহ্যগত ও সাংস্কৃতিক তাত্পর্য ছিল সর্বব্যাপী। কারণ বাংলা সনের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক ছিল নিগূঢ়। অর্থাত্ উপরিতল বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেই নয়, একেবারে ভিত্তিমূল তথা উত্পাদনব্যবস্থার সঙ্গেই ছিল বাংলা সনের ওতপ্রোত সম্পর্ক। সেজন্যই গ্রামবাংলায় বাংলা সন ও পঞ্জিকার সঙ্গে এত গভীর ও ব্যাপক প্রভাব ছিল। তা ছাড়া জমিদারদের পুণ্যাহ অনুষ্ঠান যেমন বাংলা সনের প্রথম দিন হতো, তেমনি জমিদারির কাজকর্ম, কাগজপত্র রক্ষা, খাজনার রসিদপত্র সবই করা হতো বাংলা সন-তারিখ অনুযায়ী। বোধহয় মুঘল আমলের শেষ দিক থেকে ইংরেজ আমল হয়ে পাকিস্তান আমলের প্রথম দিক পর্যন্ত বাংলা সন-তারিখের এ ব্যাপক ব্যবহার অব্যাহত ছিল। অতএব, বাঙালি কৃষকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় ছিল এই সন।
এখন কিন্তু এ অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। গ্রামবাংলায় বাংলা সনের সেই একক ও নিরঙ্কুশ আধিপত্য আর নেই। এখন গ্রামীণ মানুষের আর্থিক অবস্থার কিছু উন্নতি ঘটছে। কৃষকের সন্তানরা অধিক হারে স্কুল-কলেজে যাচ্ছে, মেয়েরাও তার মধ্যে আছে ব্যাপক হারে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর গুণগত মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। অনেকের বাড়িতে আসছে রেডিও, টেলিভিশন, সেলফোন, আধুনিক আসবাব ও তৈজসপত্র। ফলে বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রার ধরন। শুধু লোকায়ত, স্থানিক ও বাংলা সংস্কৃতিময় জীবন নয়, তাদের সন্তান-সন্ততির জীবনযাত্রার সুবাদে আন্তর্জাতিক সন হিসেবে রোমান ক্যালেন্ডারের অনুপ্রবেশ ঘটেছে গ্রামগঞ্জে। ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগেও এটা সম্ভব ছিল না। এখন সে বাংলা আর নেই।
গ্রামবাংলায় স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার ফলে বিশ্ব-সংস্কৃতির নানা উপাদান ঢুকছে গ্রামে। বিদেশি শব্দ, পাশ্চাত্য জীবনযাত্রার উপকরণ, জিন্সের প্যান্ট সবকিছুই গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে বাংলা, বাঙালিত্ব ও বাংলা সন এক প্রবল অভিঘাতের মুখে পড়েছে। নানা নেতিবাচক প্রবণতা, এমনকি বেলেল্লাপনাও ঢুকে পড়েছে গ্রামবাংলায়। স্বল্পশিক্ষিত ও সাংস্কৃতিকভাবে অনিকেত মানুষ বিদেশি ভালো জিনিস নয়, খারাপটাই বেশি গ্রহণ করে। এ অবস্থায় বাংলা সন ও তার সংস্কৃতি পেরে উঠছে না। ‘লারেলাপ্পা’ মার্কা সংস্কৃতি বাজারমাত করেছে। এখন গ্রামবাংলায় ঘরে ঘরে বাংলা পঞ্জিকা নেই। কদাচিত্ কখনো কৃষি ব্যাংক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্যালেন্ডারে বাংলা তারিখ দেখি। গ্রামবাংলায় নতুন শিক্ষিত শ্রেণি বাংলা নয়, রোমান ক্যালেন্ডার বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু করেছে। গ্রামবাংলার নববর্ষ উদযাপনের ধারায়ও পরিবর্তন ঘটে গেছে। এখন আর আগের মতো ব্যাপক আকারে গরুর দৌড়, মোরগের লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই, লাঠি বা হা-ডু-ডু খেলা দেখা যায় না— হলেও কদাচিত্ হয়। গ্রাম বাংলা শহরমুখী হচ্ছে— তাতে প্রভাব পড়ছে বিবর্তনমূলক সংস্কৃতির।
সংস্কৃতির বিবর্তন ও বাঙালি জাতিসত্তার উদ্বোধন
শিল্পবিপ্লবের পর ইউরোপে যখন পুঁজিবাদী অর্থনীতি, জাতি-রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র এবং নতুন নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠল, তখন তাদের মধ্যে প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যানুসন্ধান-প্রবণতাও তীব্র হয়ে ওঠে। আমাদের পূর্ববাংলায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর ইউরোপের মতোই নতুন করে শিকড় অনুসন্ধান প্রবণতা শুরু হয়। পূর্ববাংলার নবজাগ্রত নগরবাসী বাঙালি মুসলমান সমাজ বাঙালি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যকে সামনে আনে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসকদের বাঙালির স্বার্থ ও অধিকারকে নির্মমভাবে দমন করার বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামে যুক্ত হয় সংস্কৃতির বিস্ফোরক উপাদান। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে অন্য সাংস্কৃতিক উপাদানের মতো বাংলা নববর্ষের উত্সব-অনুষ্ঠানের লোকাচারও হয়ে ওঠে এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলায় যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয় ও মুসলিম লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর এ কে ফজলুল হক পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন। ১৯৫৪ সালে ৯২-ক ধারা জারি করে পাক-দুর্বৃত্ত শাসকরা বাংলা নববর্ষের ছুটি বাতিল করে। এতসব করেও বাঙালির অপ্রতিরোধ্য বিজয় ঠেকাতে না পেরে সামরিক শাসক আইয়ুব ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামী আন্দোলনকে সাময়িকভাবে রুখে দেন। কিন্তু পাকিস্তানি মাথামোটা শাসকরা সংস্কৃতির, বিশেষ করে রাজনীতি ও সংস্কৃতির মিলিত শক্তির গভীরতা বুঝতে অক্ষম হয়। তাই তারা বিগত শতকের ৬৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে বাংলার ঘুমন্ত বাঘকে জাগিয়ে তোলে। এর ফলে বাঙালির জাতিসত্তা গঠনের সংগ্রামে বাংলা নববর্ষের উত্সব হয়ে ওঠে নতুন এক শক্তিশালী উপাদান। কারণ নৃতাত্ত্বিক জাতি গঠনে যে ধরনের উপাদান প্রয়োজন বাংলা নববর্ষের উত্সব অনুষ্ঠানে তা ভালোমতোই আছে। তাই ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে বাংলা নববর্ষ উত্সব বা পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে বাঙালির এক অনন্য ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় উত্সব।
এমন একটি দিনের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল দারুণভাবে। গ্রামবাংলার এককালের ক্ষুদ্র, সামান্য, লোকাচারভিত্তিক আঞ্চলিক ও বিচ্ছিন্ন অনুষ্ঠান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা হয় বাঙালির নববর্ষকে এক বিরাট ও ব্যাপক জাতীয় উত্সব হিসেবে। এ উত্সবের মধ্যে বাঙালিত্বের চেতনা যেমন তীব্রতা লাভ করে, তেমনি হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রতীক এক অনন্য অনুষ্ঠান। সেজন্যই পাকিস্তানি শাসক-শোষকরা হামলে পড়ে বাঙালির নবচেতনার প্রতীক এই উত্সবের ওপর। মূর্খ মোল্লা-মৌলভিরাও এর বিরোধিতা করে। তবে পূর্ববাংলার জাগ্রত বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবল তোড়ে ভাসিয়ে দেয় কাঠমোল্লা আর পাকশাসকদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে। বৈশাখী উত্সব বা বাংলা নববর্ষের উত্সবের এ নাগরিক উত্থানের প্রধান কৃতিত্ব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানটে’র (১৯৬১)। এ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রমনার বটমূলে বাঙালি পহেলা বৈশাখের উত্সবে এক নবমাত্রা যোগ করে। ১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এ উত্সব নিয়েই অতিক্রম করতে থাকে এক বছর থেকে অন্য বছরে বিশালতায়, সর্বশ্রেণির লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত, উদ্দীপনাপূর্ণ এবং অঙ্গীকারদীপ্ত উপস্থিতিতে।
স্বাধীনতার পর বাঙালি তার গ্রামীণ জীবনযাত্রার অনুষঙ্গী বৈশাখী উত্সবের ক্ষীয়মাণতাকে নবপ্রাণদান করে রাজধানী শহরে ভিন্ন আঙ্গিকে, আধুনিক বিন্যাসে উপস্থাপন করে মঙ্গলশোভা। ১৯৮৯ থেকে এ উত্সবে চারুকলার ছাত্রদের মুখোশ, নানা কার্টুন চিত্র ও বর্ণাঢ্য মিছিল এক নতুন মাত্রা ও প্রতিবাদী ব্যঞ্জনা যুক্ত করে। দুঃশাসন, স্বৈরাচার এবং ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এ বিশাল উত্সব নানা মানবিক বার্তা প্রদান করে। সেজন্যই বুঝি জঙ্গিরা এ উত্সবে বোমা মেরে তাদের পশু-মানসিকতার পরিচয় চিহ্নিত করে।
গ্রামীণ বাংলা নববর্ষ উত্সব ক্ষুদ্র, সাধারণ ও সামান্যতা নিয়ে নগরে আসে। এখন তা নগরে নতুন আঙ্গিকে বিশালভাবে বিন্যস্ত হয়ে নানা অর্থপূর্ণ মেসেজ দিচ্ছে এবং প্রতিবছরই রাজধানীতে নতুন তাত্পর্যে ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে এবং এখন ধীরে ধীরে শহর, গঞ্জ হয়ে নতুনরূপে আবার গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে। সংস্কৃতির চক্রমন ও প্রান্তবদল আকর্ষণীয়। যে উেস এক সময়ে এর শুরু সেখানেই আবার ভিন্ন অবয়বে, আধুনিক শৈলীতে নতুন করে গড়ে উঠবে বাংলা নববর্ষের উত্সব।
বাংলা নববর্ষ উত্সব আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে আনুক মানবকল্যাণধর্মী চেতনা, শুভবুদ্ধি ও জানার চেতনা। জয়তু বাংলা নববর্ষ।
n লেখক :ফোকলোর বিশেষজ্ঞ