বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ

ঠাকুরগাঁওয়ে সদর থানার পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। থানায় পদোন্নতি পাওয়া ওসি (তদন্ত) কফিল উদ্দিন দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে কর্মরত এসআই ও এএসআইরা নিরীহ মানুষকে ধরে এনে অর্থ বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছে।

এ সব কর্মকাণ্ডের মধ্যে থানার এসআই বেলাল, পিযূব, ডিবি পুলেশর এসআই নূরে আলম, মোয়াজ্জেমসহ বেশ কয়েকজন এএসআই এবং রফিক, ডিএসবি রফিকুজ্জামান, মতিউরসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য শহরের মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে মাসোহারা নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ পুলিশের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে।

শুধু তাই নয়, প্রতিদিন শহর ও গ্রামাঞ্চল থেকে সামান্য কারণ ও ঠুনকো অভিযোগে সাধারণ মানুষকে ধরে এনে ব্যাপক অর্থ বাণিজ্য করা হচ্ছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন।

অনেক এসআই আছেন যারা অবৈধ মালামাল ও আসামি ধরে রাস্তায় চুক্তি ও সমঝোতা করে সেখান থেকে তাদের ছেড়ে দিচ্ছে। এসব ডিবি পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে গোপন স্থানে ১/২ দিন রেখে দিয়ে চুক্তি করে পরে মোটা অংকের ঘুষে তুষ্ট হয়ে তাদের ছেড়ে দেয় বলে সূত্র জানায়।

একাধিক ব্যক্তি জানান, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আসামি ধরে পুলিশ থানা হাজতে রেখে দেয়। গভীর রাতে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে অনেককে ছেড়ে দেয়। আর যারা ইয়াবা, ফেন্সিডিল বা অন্য কোন মাদকসহ আটক হয় তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে মাদকদ্রব আইনে চালান না দিয়ে ৩৪ অথবা ৫৪ ধারায় আদালতে চালান দেন। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছেন থানার ওসি তদন্ত কফিল উদ্দিন ও ডিবি পুলিশের এসআই আলম ও মোয়াজ্জেম।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী ব্যক্তি জানান, পুলিশ ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা দাবি করছে। চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিতে পারলে নানাভাবে প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার মাধ্যমে হয়রানি করছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই সকল ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান এর প্রতিকার চেয়ে পুলিশ হেড কোয়ার্টার বরাবরে লিখিত অভিযোগের প্রস্তুতি গ্রহন করেছেন বলে অনেকেই জানিয়েছেন।

ওসি তদন্ত কফিল উদ্দিন দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে সাধারণ মানুষ অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিটি মামলা তদন্তকালে বাদী ও বিবাদীর কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিদিন বিভিন্ন অভিযোগে আসামি ধরে ব্যাপক অর্থ বাণিজ্য করছেন তিনি নিজেই।
 
জানা গেছে, সংবাদকর্মীরাও কফিল উদ্দিনের ভয়ে কিছু বলতে চান না। সংবাদকর্মীরা মাদকদ্রব্য নিয়ে নিউজ করলে পরবর্তীতে মাদক সেবনকারী ও ব্যবসায়ী হিসেবে বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। এ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে সংবাদকর্মীরা।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, গত কয়েকদনি যাবৎ ঠাকুরগাঁওয়ে বিভিন্ন মামলার অজ্ঞাত আসামি নিয়ে পুলিশ রমরমা গ্রেফতার বাণিজ্য শুরু করেছে। এছাড়া রাজনৈতিক মামলাগুলোকে ঘিরে পুলিশের এ বাণিজ্য ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষ করে শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিরীহ মানুষগুলো এ বাণিজ্যের শিকার হচ্ছেন।

শুধু তাই নয়, অজ্ঞাত আসামি হিসেবে টার্গেট করা হচ্ছে এলাকার বিত্তশলী পরিবারের সদস্য ও ব্যবসায়ীদের। এসব পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়, এমন বিত্তশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করে পুলিশের সোর্সরা এ বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে সোর্সরা পুলিশের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপ করিয়ে দিচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ স্বয়ং ভুক্তভোগীদের।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় বিএনপি-জামায়াতের ১৪৪ জনের নাম উল্লেখ করে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার পর থেকেই ওইসব এলাকায় অব্যাহত অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।

অন্যদিকে, গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত থাকায় ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ১৯টি ইউনিয়নের বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, হাট-বাজার ও রাতে বাড়ি থেকে নিরপরাধ ব্যক্তিদের গ্রেফতার করছে পুলিশ। এরপর যাচাই-বাছাইয়ের নাম করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

পুলিশের এমন গ্রেফতার বাণিজ্যে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষ। ৩০টি মামলায় সাড়ে ৪ হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তি হওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি পুলিশের সোর্স নামধারী চক্র ও থানাকেন্দ্রিক দালালরা চষে বেড়াচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আসামি করার হুমকি দিয়ে তারা টাকা আদায় করছে। আবার টাকা না পেলে নাম ঢুকিয়ে দিচ্ছে আসামির তালিকায়।

এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমুর রহমান বলেন, প্রতিদিন এ ধরনের শত শত অভিযোগ আসছে ইউনিয়নগুলো থেকে। পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে নির্দোষ ব্যক্তিদের।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন স্থানে শাসক দলের তৃণমূল নেতারা পুলিশের কাছে আসামিদের তালিকা দিচ্ছে। এছাড়া আসামি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাদের ওপর নির্ভর করছে পুলিশ।

ঠাকুরগাঁও সদর থানার ওসি (তদন্ত) কফিল উদ্দিন জানান, উপর মহলের নির্দেশে পুলিশ নাশকতা এড়াতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এখানে কোনো প্রকার লেনদেনের ঘটনা আমার জানামতে নেই। সাধারণ মানুষকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।

এ সব বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার ফরহাত আহমেদ বলেন, নির্দোষ কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি বা কখনও হবে না। তবে তিনি পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য প্রমাণিত হলে ওই পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।