প্রাথমিকের শিশুদের রান্না করা খাবার দেওয়ার প্রস্তাব

বছরে প্রয়োজন হবে আট হাজার কোটি টাকা

নিজামুল হক

গ্রাম বা মফস্বলে সরকারি প্রাথমিকের শিশুরা সাধারণত আসে দরিদ্র শ্রেণি থেকে। ভালোভাবে খেয়ে বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। অনেকের বিদ্যালয়ে খাবারের জন্য তেমন কিছু নিয়ে আসার সুযোগও নেই। তাই দুপুরের দিকে শিশুরা ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে। পেটে ক্ষুধা থাকায় পাঠে মনোনিবেশ করতে পারে না শিশুরা। পাশাপাশি পুষ্টির অভাবে মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। এসব চিন্তাভাবনা থেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের দুপুরে রান্না করা খাবারের প্রস্তাব দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় স্কুল মিল নীতি প্রণয়ন কমিটি।

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সদস্যদের নিয়ে গঠিত কমিটি এই নীতির খসড়া প্রণয়ন করেছে। এই খসড়া নীতি পর্যবেক্ষণ শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে সরকার।

তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব শিশুকে দুপুরে রান্না করা খাবার দিতে ১৩ টাকা হিসেবে বছরে প্রয়োজন হবে আট হাজার কোটি টাকা। স্কুল মিল নীতি সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ের অধিকাংশ বিদ্যালয় দুই শিফটে চলে। বিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত শিখন সফলতা অর্জনের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সংযোগ সময় বৃদ্ধির জন্য এক শিফট চালু করা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে শিশুদের দীর্ঘ সময়ে বিদ্যালয়ে অবস্থান নিশ্চিত করা এবং ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

নীতির খসড়ায় বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে ৫ দিন রান্না করা খাবার দেওয়া হবে। একদিন দেওয়া হবে পুষ্টিমান সমৃদ্ধ বিস্কুট। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় শক্তি চাহিদার ৩০ শতাংশ স্কুল মিল থেকে আসা নিশ্চিত করা হবে। অর্ধ দিবস স্কুলের ক্ষেত্রে এ হার ৫০ শতাংশ হবে। প্রতিদিনের খাদ্যে বৈচিত্র্য থাকবে। চাল, ডাল, শিম, মটরশুঁটি, তেল, স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত মৌসুমি তাজা সবজি, ডিম, মাংস, মাছ, দুধ ও দুগ্ধ জাতীয় খাবার, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, বিচি ও ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ফল দেওয়া হবে। এ দশটি খাদ্যের মধ্যে ন্যূনতম চারটি খাদ্য তালিকায় যুক্ত থাকবে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এখন যে শিশুরা স্কুলে ভর্তি হচ্ছে তারা ১২ বছর পর দ্বাদশ শ্রেণি সমাপ্ত করবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ বাস্তবায়নের জন্য এখন থেকেই স্কুলে রান্না করা খাবারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তথ্য অনুযায়ী, স্কুল মিল কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য থাকবে একাধিক কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে একটি সেল গঠন করা হবে। গঠন করা হবে খাদ্য ও পুষ্টি  গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র। সরকারের ১৪টি মন্ত্রণালয় এ কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে।

সরকার ও বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি যৌথভাবে ২০১১ সাল থেকে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম ১০৪ উপজেলায় বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচির আওতায় ৩১ লাখের বেশি শিশুকে বিস্কুট সরবরাহ করছে। বর্তমানে এসব স্কুলে ৭৫ গ্রাম বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। গতকাল এ বিষয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায়  পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, এই প্রকল্পের জন্য আট হাজার কোটি টাকা লাগবে। তবে এ প্রকল্পে টাকা-পয়সার কোনো সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যে কাজটা করছে, এটা আরো শক্তভাবে করবে। আমার নিজের মন্ত্রণালয় থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছি। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশংসনীয় উদ্যোগ। স্কুল মিল সাধারণ খাবার নয়। এটাকে বিচার করতে হবে পুষ্টিমানের বিবেচনায়। স্কুল মিল মানে শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিমান খাবার নিশ্চিত করা। যা তাকে শিক্ষায় মনোনিবেশ করতে সাহায্য করবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন বলেন, পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকটি স্কুলে এই কার্যক্রম চালু করা হবে।  তাহলে স্কুলে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া বন্ধ হবে, স্কুলে আসার প্রবণতা বাড়বে।