ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে (১৮) পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কারাগার থেকে অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলার নির্দেশেই তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বোরকা পরে এই হামলায় অংশ নেয় এক নারীসহ চারজন। হামলাকারীদের নেতা শাহাদত হোসেন শামীম নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিজেদের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানিয়েছে নুসরাত হত্যা মামলার অন্যতম আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদত হোসেন শামীম। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।
জেল থেকে হত্যার নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ
পিবিআই প্রধান বলেন, অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলার মুক্তির জন্য ৪ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কাছে নূর উদ্দিন ও শাহাদতরা স্মারকলিপি জমা দেন। ওই দিনই তারা জেলখানায় গিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজের সঙ্গে দেখা করে। সেখানে সিরাজ নূরকে বলে, ‘তোমরা আমার জন্য কী করছো। আমি জেলে মরছি আর তোমরা তামাশা দ্যাখছো। যার কারণে আমি জেলে আছি, তার একটা ব্যবস্থা করো। হয় তাকে মামলা তুলে নিতে বলো না হলে তার একটা ব্যবস্থা করো। প্রয়োজনে তাকে মেরে ফেলো।’
দুই ‘কারণে’ নুসরাতকে হত্যা
ডিআইজি বলেন, এই নির্দেশের পরদিন ৫ এপ্রিল ওই মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে নূর উদ্দিন, শাহাদত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদের ও আরো একজনসহ মোট পাঁচ জন বৈঠক করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা হবে। তারা এই সিদ্ধান্ত নেয় দুইটি কারণে। প্রথম কারণ, নুসরাত মামলা করে অধ্যক্ষসহ আলেম সমাজকে হেয় করেছে। দ্বিতীয় কারণ, শাহাদত দফায় দফায় নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিলেও সে প্রত্যাখ্যান করেছে। এতে শাহাদত ক্ষিপ্ত ছিল।
যেভাবে পরিকল্পনা ও হামলা
ডিআইজি জানান, বৈঠকের পর তারা বিষয়টি পাঁচ জনের কাছে শেয়ার করে। এর মধ্যে ছিল মাদ্রাসার তিন ছাত্র ও দুই ছাত্রী। এই পাঁচ জনের মধ্যে এক ছাত্রীর দায়িত্ব পড়ে তিনটি বোরকা ও কেরোসিন আনার। ওই মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষার আগে সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত সকালের শিফটের ক্লাস হয়। ওই ছাত্রী ৬ এপ্রিল সকাল আটটার দিকে তিনটি বোরকা ও পলিথিন ব্যাগে ভরা কেরোসিন এনে শাহাদত হোসেন শামীমের কাছে হস্তান্তর করে। ওই সময় শামীমের সঙ্গে আরো দুই জন ছিলেন। তারা হলেন জোবায়ের আহম্মেদ ও জাবেদ হোসেন। সকালের শিফটের ক্লাস সকাল ৯টার দিকে শেষ হয়ে গেলে তখন একটু ফাঁকা হয় মাদ্রাসা। ওই সময় তারা তিন জন ও ওই ছাত্রীসহ সাইক্লোন শেল্টারের তিন তলার ছাদে অবস্থান নেয়। তিন তলার ছাদে ওই তিন জন বোরকা পড়ে নেয়। আর ছাত্রী বোরকা পরিহিত ছিল। তারা ছাদের দুইটি টয়লেটে লুকিয়ে থাকে।
পরীক্ষা শুরুর কিছু সময় আগে পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে একজন ছাত্রী যার নাম চম্পা অথবা শম্পা (গ্রেফতার রয়েছে) পরীক্ষার কক্ষে যায় নুসরাতের কাছে। সেখানে নুসরাতকে বলে যে, কারা যেন নিশাতকে (নুসরাতের বান্ধবী) ছাদে মারতেছে। এ কথা শুনে নুসরাত ছাদে যায়। এসময় সেখানে অবস্থান নেওয়া বোরকা পরিহিত চার জন নুসরাতের ওড়না দিয়ে তার হাত বেঁধে ফেলে। প্রথমে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নুসরাতকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। সেটি না মানলে শাহাদত গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর নুসরাত ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিত্কার করলেও ওই এলাকাটি অত্যন্ত নির্জন হওয়ায় কেউ চিত্কার শুনতে পাননি।
ঘটনার পর নুসরাত নিজে ছাদ থেকে নামল কীভাবে জানতে চাইলে পিবিআই প্রধান বলেন, ‘সাইক্লোন শেল্টারের ছাদ ৪ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। ওপর থেকে কেউ চিত্কার করলেও নিচে কেউ শুনতে পারবে না। আবার ছাদের দেয়ালের উচ্চতার কারণে কেউ টপকিয়ে নিচে নামতে পারবে না। ছাদ থেকে নামতে চাইলে তাকে একমাত্র সিঁড়ি দিয়েই নামতে হবে।
তারা আগুন ধরিয়ে দিয়ে ছাদ থেকে নেমে মাদ্রাসায় অবস্থান করে। গায়ে আগুন লাগানো অবস্থায় নুসরাত সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসলে অনেক মানুষ জড়ো হয়। এরপরই ওই চারজন সবার সঙ্গে মিশে যায়।’
ঘটনার দিন পরীক্ষা ছিল, হামলাকারীরা কীভাবে ভিতরে প্রবেশ করলো জানতে চাইলে পিবিআই প্রধান বলেন, ‘সাইক্লোন শেল্টারে সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ক্লাস হয়। এজন্য পরীক্ষার্থী ছাড়াও বাইরের অনেকেই প্রবেশ করতে পারে। তাছাড়া যেখানে একটি পরিকল্পিত কাজ করছিল শাহাদত-নূর উদ্দিনরা, তাই কে ঢুকবে বা ঢুকতে পারবে না, সেই নিয়ন্ত্রণ তো তাদের হাতেই ছিল। গেটের বাইরে নূর উদ্দিনসহ আরো ৫ জন অবস্থান নিয়েছিল, যাতে ঘাতকরা নিরাপদে মাদ্রাসা ত্যাগ করতে পারে।’
হত্যায় ১৩ জনের সম্পৃক্ততা, গ্রেফতার ৭
নূর উদ্দিন হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে উল্লেখ করে বনজ কুমার মজুমদার বলেন, এখন পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডে ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন—অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদ্দৌলা (৫৫), নূর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), আওয়ামী লীগ নেতা পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৪৫), জোবায়ের আহম্মেদ (২০), জাবেদ হোসেন (১৯) ও মাদ্রাসার প্রভাষক আফছার উদ্দিন (৩৫)। আর এজাহারে থাকা হাফেজ আব্দুল কাদেরকে এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এজাহারের বাইরে থাকা বাকি পাঁচজনকে গ্রেফতার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া এর বাইরেও আরো কেউ জড়িত থাকলে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে। যে যত বড় ক্ষমতাশালী হোক না কেনো কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান পিবিআই প্রধান।
গ্রেফতার হওয়া নূর উদ্দিন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে আরো জানিয়েছে, অনেক ঘটনাই সামাল দেওয়া গেছে। তাদের ধারণা ছিল, এবারের ঘটনাও সামলানো যাবে। বিশেষ করে এর আগে ২০১৭ সালের জুন মাসে নুসরাতের চোখে চুন মাখিয়ে দিয়েছিল নূর উদ্দিন। ওই ঘটনায় নুসরাত চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিল। ওই ঘটনাটি নূর উদ্দিন ধামাচাপা দেয়। আবার গত ২৭ মার্চের ঘটনাও একরকম ধামাচাপা পড়েছে। তাই রাফির গায়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে মারতে পারলেও কিছু হবে না এমনটা ভেবেই তারা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় পরীক্ষা দিতে গেলে বোরকা পরা চারজন নুসরাতের হাত-পা বেঁধে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ২৭ মার্চ মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার হাতে যৌন হয়রানির শিকার হন নুসরাত। এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। আসামিপক্ষ নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে মামলা তুলে নিতে। নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এর জের ধরেই তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। উন্নত চিকিত্সার জন্য ওইদিনই তাকে আনা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও চিকিত্সকরা বাঁচাতে পারেননি তাকে। বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় মৃত্যুর কাছে হেরে যান তিনি।
আগেই ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই
৬ এপ্রিল ওই ঘটনার পর পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। ৯ এপ্রিল মামলাটি পিবিআইতে আসার আগে থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খালেদা বেগম ও রিমা সুলতানা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে সার্বক্ষণিক নুসরাতের তদারকিতে ছিলেন। যখনই সুযোগ হয়েছে তখনই একটু করে কথা বলার চেষ্টা করেছেন তারা। নুসরাত তার ভাইয়ের কাছে যে বক্তব্য দিয়েছে তা যাচাই করতে নুসরাতের সঙ্গে কথা হয়েছে। কথা বলার সময় মাঝে মাঝে ‘ওস্তাদ’ শব্দটা বলার চেষ্টা করেছে মেয়েটি। পুলিশ সেই ‘ওস্তাদ’ শব্দটি যাচাই বাছাই করছে। এরই মধ্যে পুলিশ জানতে পেরেছে যে মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে ছাত্র-ছাত্রীরা ‘ওস্তাদ’ বলে সংবোধন করে।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনার পেছনে আর কারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। তাদের গ্রেফতার করার স্বার্থেই আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের নিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। এ ঘটনার সঙ্গে এমন কিছু লোক জড়িত রয়েছে যে নাম শুনলে অবাক হয়ে যাবে যে কেউ। মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতা, শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ অনেকেই জড়িত রয়েছেন এ ঘটনায়।